কোনো বিয়ের আসরে যখন বাজানদার দল ‘এমন মজা হয় না, গায়ে সোনার গয়না’ কিংবা ‘লীলা বালি লীলা বালি’ বাজিয়ে তালে তালে পা ফেলে তখন মন খুশীতে দারুণ নেচে উঠে। শিশুরা হাত তালি দেয়। হৈ চৈ করে আনন্দ পায়। বড়রাও উপভোগ করে। সব মিলিয়ে মজার এক আনন্দময় উৎসব আবহ সৃষ্টি হয়। বাজিয়েদের মুখে থাকে অমলিন হাসি। কিন্তু দলের সদস্যদের সাথে আলাপ না করলে কখনো বুঝা যায় না, রঙিন ঝলমলে পোষাকের আড়ালে গভীর ক্ষতের মতো এক যন্ত্রণাময় জীবন কাহিনী।
এদের বাজিয়ে সুখ। বাজাতে ভালো লাগে, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ এবং ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’। এখন হালকা চটুল গানের কদর বেশি। বিশেষ করে বাংলা ও হিন্দী সিনেমার গান। গ্রামে-গঞ্জে আঞ্চলিক গানের। কখনো কখনো পরিবেশ বুঝে ভৈরবী, মালকোষ, দরবারী, আশাবরী রাগও বাজিয়ে থাকে।
এক সন্ধ্যায় ….. নানান বৈচিত্র্যময় বাজনার মতো নানামুখী সুখ-দুঃখের মাঝে নিমজ্জিত এইসব বাজিয়েদের সাথে কথা বলেছিলাম এক সন্ধ্যায়। শহরের এক গলিতে। জীর্ণ এক ঝুপড়িতে। দরজায় হারিক্যান ঝুলছে। ম্লান আলো। এক বয়সী বটবৃক্ষের মতো বসে আছে আলী হোসেন। বয়স ষাটের উপর। তার নিজের দাল আছে। মানে ব্যা- পার্টি।
চল্লিশ বছর আগে সে চট্টগ্রাম শহরে আসে। চৌদ্দ-পনের বছর বয়সে। নিজ বাড়ি ঢাকা থেকে পালিয়ে। আর ফেরা হয়নি। একটি মাত্র ঘর। মাঝে বেড়া দিয়ে দু‘ভাগে ভাগ করা। এই ঘর কবে কখন প্রথম ভাড়া নেয় সন-তারিখ আলী হোসেনের মনে নেই। তখন ভাড়া ছিল পাঁচ টাকা। এখন এক হাজার টাকা। পেছনের ঘরে তাঁর স্ত্রী, তিন, মেয়ে, দুই ছেলে নিয়ে আছে। সামনের ঘরের চারিদিকে পাইপ ব্যা-, ক্লারিওনেট, কর্নেট, ট্রাম্পেট, বিগ ড্রাম, সাইড ড্রাম, বিউগল, স্টিক ইত্যাদি রাখা।
এইসব বাজানদার দল চট্টগ্রামের ঐতিহ্যের সাথে মিশে গেছে। এইসব দল চট্টগ্রামের বদরপাতি, বা-েল রোড, লালখানবাজার এলাকায় দোকান সাজিয়ে বসেছে। বায়নার চুক্তির জন্যে নানান নামের সাইন বোর্ড এসব এলাকায় গেলেই আপনার চোখে পড়বে।
ঝিনুক নীরবে সহে ……
ঘরের মাটিতে বিছানো পাটিতে বসে বাজানদার দলের নানা কথা বলতে থাকে হোসেন। কথা বলার সময় প্রথমে দু‘একজন ছিলো। পরে এই দলের এবং অন্যান্য দলের অনেকেই এসে জুটে যায়। এইসব মানুষের সাথে কথা বলতে এবং এক অনাবিষ্কৃত জগতে প্রবেশ করে অবাক হয়ে যাই। এই এইসব দলের অনেকেই রিক্সাচালক, দিনমজুর, মুদির দোকানদার, রাজমিস্ত্রীর যোগানদার। বাজানদাররা বাজিয়ে যে টাকা পায়, তা দিয়ে সংসার চালানো দূরে থাক, নিজে চলাও কষ্টকর হয়ে পড়ে, বিশেষ করে যখন মৌসুম থাকে না।
একটি বাজানদার দলে ২৫-২৬ জন সদস্য থাকে। কখনো ২১ জন কখনো কখনো ১৫ জন বাজিয়ে থাকে। বাজানদার দলের জন্য ভর মৌসুম মাঘ-ফাল্গুন এই দুমাস। এই মৌসুমে একটি মাঝারি মানের দলও এক অনুষ্ঠানে দশ থেকে বিশ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকে। দলের সাইজ অনুযায়ী এইসময় ১৫-২০টার মতো ডাক আসে। চুক্তি হয়। টাকার ভাগ হয় এখনো প্রাচীন প্রচলিত নিয়মে। মালিক পোষাকের ভাড়া বাবদ শতকরা ৫০ টাকা পায়।
প্রথম শ্রেণীর বাজিয়ে শতকরা ৩০ টাকা, বকশিস হিসেবে ২০-৫০ টাকা। দ্বিতীয় শ্রেণীর বাজিয়ে শতকরা ২০ টাকা। সাধারণ মানের বাজিয়ে শতকরা ৫ টাকা থেকে ১০ টাকা পেয়ে থাকে। এর সাথে প্রতিজন পায় এক প্যাকেট সস্তা সিগারেট, চা-নাস্তা, ভাতও। তাদের সাথে থাকে চা-নাস্তা যোগানদার দু‘জন। একজন বিগ ড্রাম বহনকারী।
কল ঘরে চিলের কান্না …. আলাপে, একজন সাইড ড্রাম বাদক জানিয়েছিলো, যখন হাতে কোনো কাজ থাকে না, বায়নার চুক্তি হয় না, তখন জীবন অর্থহীন মনে হয়। কাজের খোঁজে বের হতে হয়। ধার-কর্জ করি। একজন আরেকজনের সুখ-দুঃখের ভাগীদার হই। এভাবেই আমাদের জীবন চলে? আধ ময়লা লুঙি, ছেড়া গেঞ্জি পড়ে বসে থাকা একজন দেখলাম। দেখে কখনো মনে হবে না একজন বাদক। অথচ, যখন সে রঙিন পোষাক পড়ে দলের সাথে বাজাতে বাজাতে দীপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে যায় অলি-গলি, রাজপথ দিয়ে, তখন আমরা তার দিকে অবাক বিস্ময়ে থাকিয়ে থাকি। ‘কল ঘরে চিলের কান্না’ শুনতে পায় না। ভাবি, কী সুখ তাদের জীবনে।
এখন ব্যা- পার্টি…. এখন ব্যা- পার্টির সেই রমরমা অবস্থা আর নেই। সেই জায়গা দখল করেছে ব্যা- শো। ডিজে। ইত্যাদি। এক সময় এই বাজানদার দলের বাজনটাই ছিলো মূলত বিয়ের আনন্দ। বাজনার তালে তালে শিশু-বৃদ্ধরা আনন্দ পেতো। এখন ডাক পড়ে হিন্দুদের বিয়েতে এবং চট্টগ্রামের আদি পরিবারের বিয়েতে। অনেক সময় মেয়ের কান ফোঁড়ানো ও খৎনা অনুষ্ঠানে কখনো কখনো ডাক পড়ে। ডাক পড়ে সরকারি ও বেসরকারি কোনো দিবস উদযাপনে, কিংবা নির্বাচন পরবর্তী প্রার্থীর বিজয় মিছিলে বা নতুন কোনো পণ্যের প্রচার অভিযানে।
অনেকে পৈত্রিক এই ব্যবসাকে আগলে রেখেছে এখনও ঐতিহ্য হিসেবে। হাতেখড়ি হয় পরিাবর থেকেই। একজন জানালো সে বাঁশিবাদক। সে জানে, বাঁশি বাজালে হার্টে চাপ পড়ে, ক্ষতি হয়। তবুও বেঁচে থাকার জন্য এখনো বাঁশি বাজায়। খ্যাপে যেতে হয়। এও জানে, তাদের আয় একজন দিনমজুরের চেয়ে কম।
অবশ্য, কখনো কখনো বাজাতে গিয়ে মজাদার ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়, কখনো কখনো বিরূপ প্রতিক্রিয়ারও। সব মিলিয়ে বাজাতে এখনো খারাপ লাগে না। ভালোয় লাগে। কিন্তু ধীরে ধীরে একদিন হয়তো এই বাদ্যবাজনা হারিয়ে যাবে। শুধু এদের ব্যবহৃত যন্ত্রগুলো একদিন যাদুঘরে জায়গা করে নেবে।
পুনশ্চ : ব্যা- মাস্টার ….
তুষার রায়ের ‘ব্যা- মাস্টার’ কবিতার কয়েকটি পংক্তি মনে পড়ে যায়, ওদের সাথে আলাপ করতে করতে। এইটুকু অহংকার এখনো তাদের রয়েছে। না হয় কখন উঠে যেতো এই চর্চা, এই দেশ থেকে।
‘ড্রামের কাঠির স্ট্রোকে।
যেন গালাই এবং ঢালাই করি
শক্ত ধাতু নরম করার কাস্টার,
কেননা ভারী ধুন্ধুমার ট্রাম্পেট বাদক
ব্যা- মাস্টার।
আবার বাজাই যখন ম্যাক্সো চলো
ক্যাবারিনার এলোমেলো
ডিভাইস এ দ্বন্দ্ব এলো
আমার বাঁশির সুরে সুতোয়
দেহের ফুলে মালা
ট্রা রালা লি রালা লা
ঠিক চাবি হাতে দেখি
খুলে যায় তালা।’

Share