নীড়পাতা » অগোছালো » কার্টনভর্তি যুবতীর লাশটি কি তবে বাগোয়ানের মিনু!

‘আব্বু আমাকে মেরে ফেলবে, আমি বাঁচবো না,…

কার্টনভর্তি যুবতীর লাশটি কি তবে বাগোয়ানের মিনু!

জাহেদুল আলম , রাউজান

নোয়াপাড়ায় কার্টনভর্তি অবস্থায় উদ্ধার হওয়া যুবতীর লাশটি রাউজানের বাগোয়ান ইউনিয়নের এক সবজি বিক্রেতার মেয়ে বলে দাবি করা হচ্ছে। ওই ইউনিয়নের আবদুল কাদেরজ্জামান বাড়ির বাসিন্দা ও লাম্বুরহাটের সবজি ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন গতকাল সোমবার স্থানীয় সাংবাদিকদের এটি অবগত করেন। বিষয়টি এর আগে তিনি পুলিশকেও জানিয়েছেন। জসিম উদ্দিন পত্রিকার খবর এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি দেখে বৃহস্পতিবার উদ্ধার হওয়া নারীর লাশটি তার মেয়ের বলে চিহ্নিত করেছেন। তার মেয়ের নাম মিনু আকতার (২২)। মিনুর ডান পায়ের পাতা ও আঙুল বাঁকানো। সে প্রতিবন্ধী ভাতাও পায় বলেও জানান তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন ‘আমার ৫ মেয়ে ১ ছেলে সন্তানের মধ্যে মিনু আকতার ২য়। বড় মেয়েকে চট্টগ্রাম শহরে বিয়ে দিয়েছি। এখন দুই মেয়ে শহরে, একমাত্র ছেলে সীতাকু-ে লেখাপড়া করে। আমি সকাল ৭টায় ঘর থেকে বের হয়ে লাম্বুরহাটে আমার সবজি, পান সিগারেটের দোকানে আসি। রাতে বাড়ি ফিরি। ঘরে থাকে শুধু মিনু ও সবার ছোট মেয়ে আর তাদের মা। গত ১০ ফেব্রুয়ারি লাম্বুরহাটে সাপ্তাহিক বাজার ‘বার’ ছিল। ওইদিন দুপুরে খবর পাই মিনুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এরপর আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িসহ বিভিন্নস্থানে তাকে খোঁজাখুঁজি করি। না পেয়ে পরদিন ১১ ফেব্রুয়ারি রাউজান থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করি।’ ২০ ফেব্রুয়ারি রাত ১০টা ৫১ মিনিটে মিনু হঠাৎ করে তার মায়ের কাছে মোবাইলে কল করে। মিনু বলে ‘আম্মু আসসালামুআলাইকুম, কেমন আছো। এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে মিনুর মা বুলবুল আক্তার অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এরপর আমি মোবাইল কেড়ে নিয়ে তাকে বলি ‘ওপুত তুই হ-ে, তুই হন্ জাগাত্, তুই হারলই গেইয়্যুছ দে, অ্যাইযা, তুই কেন আছস, হন্ডে গেইয়ুছ আই যা (তুই কোথায়, কোন জায়গায়, কার সাথে গিয়েছিস, চলে আয়, তুই কেমন আছিস, কোথায় গিয়েছিস চলে আয়)। এসময় সে (মিনু) বলে ‘আব্বু আমি আসতে পারবো না। আমাকে মেরে ফেলবে, আমি বাঁচবো না, আমাকে মাফ করে দিও, মাকে বলিও মাফ করে দিতে। আমার ভাই, বোনদের, মাকে দেখিও। এসময় আমি তাকে বলি ‘তুই কোথায় আছিস বল, আমি আসছি, কোথায় আছিস আমাকে বল। তখন সে বলে আমি কিছু জানি না, চিনি না। এক দেড় মিনিট কথা বলার পর ওই মোবাইলটি বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রায় বিশ মিনিট পর আমি আবার ওই নম্বরে ফোন করলে সেই প্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি আমাকে বলে ‘এটি ঢাকা বিক্রমপুরের একটি মোবাইলের দোকান। একটি মেয়ে, একটি ছেলে এখানে এসেছিল। তারা চলে গেছে। বিষয়টি আমি পরদিন রাউজান থানার অফিসার (যিনি ‘নিখোঁজ’ ডায়েরিভুক্ত করেছেন) তরুণ বড়–য়ার কাছে জানাই, মোবাইল নম্বরটি তাকে দিই। এরপর গত শনিবার সন্ধ্যায় লাম্বুরহাটে মানুষ দৈনিক পূর্বকোণের সংবাদ দেখে, ফেসবুকে ছবি দেখে যখন বলাবলি করছিল, তখন আমার মনে সন্দেহ হয়। এরপর থানার অফিসার তরুণ বড়–য়ার কাছে কল করি। রবিবার চকবাজার থানায় যাই। সেখানে লাশের ছবি দেখে এবং তার পা দেখে উদ্ধার হওয়া লাশটি আমার মেয়ের বলে চিহ্নিত করি।’
বিষয়টি আমি রাউজান থানা পুলিশকে অবগত করেছি।’ জসিম উদ্দিন নিখোঁজ সম্পর্কে বলেন ‘মিনু মোবাইল ব্যবহার করতো না। তবে তার মায়ের নম্বরে এক ছেলে কল করতো। মিনুর সঙ্গে কথা বলতে চাইতো। মিনু অজান্তে তার সঙ্গে কথা বলতো কিনা জানি না। তবুও তাকে চারমাস আগে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছিলাম। মিনু যেদিন নিখোঁজ হয়, তার পরদিন ১১ ফেব্রুয়ারি চারটি অপরিচিত নম্বর থেকে মিনুকে বার বার খুঁজতে থাকে।’ বাবার জসিম উদ্দিনের ধারণা, তার মেয়েকে কোন একটি চক্র অমানুষিক নির্যাতন করে চিনে ফেলায় হত্যা করেছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার কথিত মহিলার লাশ উদ্ধারকারী পূর্ব গুজরা পুলিশ ফাঁড়ি (তদন্ত) কেন্দ্রের এসআই ফরহাদ বলেন ‘উদ্ধারকৃত যুবতীর লাশের পা বাঁকানো ছিল।’ একই ফাঁড়ির ইনচার্জ মাসুদ, এস.আই মহসিন রেজা ও থানার এস.আই তরুণ বড়–য়া বলেন ‘লাশের দাবিদার জসিম উদ্দিনকে থানায় ডাকা হয়েছে। ওই যুবতী তার মেয়ে কিনা তা ভালোভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এরপর তাকে কিভাবে, কারা হত্যা করেছে সে ধাপগুলোর দিকে এগোতে পারব।
এদিকে গতকাল সোমবার দুপুরে সরেজমিনে বাগোয়ানস্থ সেই জসিম উদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, টিনের জীর্ণ একটি ছোট বসতঘরে থাকেন জসিম, তার স্ত্রী ছেলে মেয়েরা। বোনের নিখোঁজের সংবাদ পেয়ে ছুটে আসে একমাত্র ছোট ভাই সীতাকু-ের কুমিরা আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র জয়নাল উদ্দিন (১২)। সে জানায় ‘আমার বোন লেখাপড়া করেনি, ভালো করে নিজের নামও লিখতে জানে না। মোবাইলও চাপতে জানে না। সে কারো সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক, মোবাইলে কথাবার্তা বলতে দেখিনি। ১০ ফেব্রুয়ারি দুপুরে অসুস্থ মাকে ওষুধ খাইয়ে আপা বাইরে চলে যায়। এরপর তার আর খোঁজ মেলেনি।’ প্রতিবেশী আমজাদ হোসেন বৃহস্পতিবার উদ্ধার হওয়া যুবতীর লাশের ছবি দেখে বলেন ‘এটাই মিনু।’ প্রতিবেশী ছালেহা খাতুন বলেন ‘মিনু বোনের বাড়িতে বেড়াতে গেছে শুনেছিলাম, কাল (রবিবার) শুনছি তার মারা যাওয়ার কথা।’ তবে বাড়ির লোকজন জানান, মিনু বাইরে তেমন যেতো না, ঘরে কাজকর্ম করে অসুস্থ মায়ের সাহায্য করতো।’
প্রসঙ্গত, মধ্যেপ্রাচ্য থেকে আসা কোন প্রবাসীর মালামালভর্তি কার্টনের মতো একটি কার্টন বৃহস্পতিবার সকালে রাউজানের নোয়াপাড়া পথের হাটের অদূরে রাউজান টু নোয়াপাড়া শফিকুল ইসলাম ইসলাম সড়কের বদুমুন্সিপাড়ার এজাহার মিয়া সেতুর পশ্চিম পার্শ্বস্থ সেতুর পিলারের পাশে পড়েছিল। সেটি দেখে এ সড়কের গাড়ি চালকরা পুলিশকে খবর দেয়। এরপর পূর্ব গুজরা পুলিশ ফাঁড়ি তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে চট, বেডশিট, স্কচটেপ, সাদা-কালো পলিথিন, নাইলন রশি দিয়ে মোড়ানো শক্ত কাগজের প্যাকেটটি খুলে দেখেন তার ভেতরে বিবস্ত্র ও নৃশংসভাবে খুনের শিকার এক যুবতীর মরদেহ। তার বয়স প্রায়র ২০ বছর। ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন রাউজান-রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, রাউজান থানার ওসি কেপায়েত উল্লাহ, পূর্ব গুজরা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের উপ পরিদর্শক ফরহাদ হোসেন ও পশ্চিম গুজরা ইউপি চেয়ারম্যান লায়ন সাহাব উদ্দিন আরিফ। রাউজান-রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর তখন সাংবাদিকদের জানান, উদ্ধারকৃত যুবতীর গলায় চার-পাঁচ স্তুরের রশির ফাঁস ছিল। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছিল লোহার ছ্যাকার দাগ। তাকে হাত ও পা মুড়িয়ে গোলাকৃতি করে চটের বস্তায় ভরে প্যাকেটটিতে রাখা হয়। যুবতীটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করে বুধবার রাতের কোন একসময় ওই জায়গায় ফেলে গেছে।’

Share