নাজিম মুহাম্মদ

পুলিশের ভয়ে দুই বছর দেশ ছাড়া ছিলেন ইয়াবা গডফাদার আবদুর রশিদ ওরফে রশিদ খুলু (৬০)। দেশে ইয়াবার প্রথম চালানটি নগরীর খাতুনগঞ্জে ধরা পড়েছিলো ২০১২ সালের ১৮ মে। যেটির মালিক ছিলেন রশিদ খুলু। ২ লাখ ৭০ হাজার ইয়াবার ওই চালানটি আনা হয়েছিলো আচারের বস্তায় করে। ২০১৬ সালে খুলু মালেশিয়া পাড়ি দিয়ে সেখানে বাড়ি ও হোটেলের মালিক হন। সেই রশিদ খুলু পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে পক্ষান্তরে পুনর্বাসনেরই সুযোগ নিলেন। গত ৪ ডিসেম্বর রাতে নগরীর গরিবুল্লাহ শাহ মাজার এলাকা থেকে একটি এসি বাসে অতি গোপনে কক্সবাজার গিয়ে পুলিশের হেফাজতে চলে যান। রশিদ খুলু আত্মসমর্পণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে আসা এবং সম্পদ রক্ষার সুযোগ পাবেন বলে তার ঘনিষ্টজনেরা মনে করছেন। কারণ হিসেবে তারা বলেন, পুলিশের বারবার অভিযান এবং তার একাধিক সহযোগী বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর নিজের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে বাড়ি গাড়ি ফেলে তিনি মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যান। এরপর সেখানেই ব্যবসা শুরু করেন। তবে দেশে থাকা বিপুল বিত্তবৈভব রক্ষা করতেই তিনি শেষ পর্যন্ত ফিরে আসেন। চট্টগ্রাম অঞ্চলের পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, ইয়াবা কারবারি যারা আত্মসমর্পণ করেছেন, তারা একটি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে আছেন। আর স্বাভাবিক জীবনে আসার পর তাদের কর্মকা- আমরা পর্যবেক্ষণ করব।
জানা যায়, ইয়াবা ব্যবসায়ীদের দৃশ্যমান এবং অদৃশ্যমান সম্পদ রয়েছে। আয়কর বিভাগের কর্মকর্তাদের ধারণা, তাদের সম্পদ বৈধ করতে চাইলেও কেবল দৃশ্যমান সম্পদ বৈধ করা যাবে। এর মাধ্যমে তারা বিপুল পরিমাণ অদৃশ্যমান সম্পদ বিশেষ করে নগদ অর্থ ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। এভাবে তারা সমাজে নিজেদের প্রতিপত্তি নিয়ে ফিরে আসতে পারবেন। তবে টেকনাফ থানার পরিদর্শক (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, পুলিশের কাছে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা আত্মসমর্পণ করেছেন। সরকারের আরও অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আয়কর বিভাগসহ ওই প্রতিষ্ঠানগুলো এ ব্যাপারে কাজ করবে। ফলে এখনও অনেকগুলো বিষয় রয়ে গেছে।
রশিদ খুলুর আদি নিবাস মিয়ানমারের মংডু। ভাগ্যের অন্বেষণে একসময় তিনি টেকনাফ উপজেলার শাহাপরীর দ্বীপে আসেন। সেখানে দিনমজুর হিসেবে কাজ শুরু করেন। আরও পরে তিনি নগরীর খাতুনগঞ্জে এসে দিনমজুরের কাজ করেন। ২০০০ সালে এদেশে প্রথমবারের মতো ইয়াবা নিয়ে কথা শুরু হয়। প্রথম চালান ধরা পড়ে ২০০৬ সালে। তখন সর্বোচ্চ ১২০০ পিস ইয়াবা ধরা পড়ে। কিন্তু ২০১২ সালের ১৮ মে খাতুনগঞ্জে টেকনাফ থেকে আসা আচারভর্তি ট্রাকের ভেতর থেকে ২ লাখ ৭০ হাজার ইয়াবা বড়ি আটক করেন র‌্যাব-১ ও র‌্যাব-৭ এর সদস্যরা। ওইসময় প্রথমবারের মতো গ্রেপ্তার হন রশিদ খুলু ও চার সহযোগী। তারা হলেন রশিদের শ্যালক আতাউল করিম, দুই কর্মচারী সাব্বির ও ইসমাইল। তখন র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে সাব্বির বলেছিলেন, ওই বছরের ২০ মার্চ আড়াই লাখ ইয়াবার আরও একটি চালান বরই ও তেতুল আচারের ভেতরে করে এনেছিলেন রশিদ খুলু। সেই চালানে আড়াই লাখ ইয়াবা ছিলো। যা পাঁচ-ছয়জন পাইকারি বিক্রেতার কাছে দেয়া হয়েছিলো। খুলুর সিন্ডিকেটে যারা ছিলেন তারা হলেন শীতল, মোজাহের মিয়া, ওয়াহিদ,মনির, জলির ওরফে লবন জলিল ও হাবিব। এরমধ্যে মোজাহের ও মনির ইয়াবা পাচারের মামলায় কারাবন্দী আছেন। শীতল মারা গেছেন। জলির মধ্যপ্রাচ্যে পালিয়ে গেছেন। হাবিব আর ওয়াহিদ দেশেই আছেন। তাদের প্রত্যেকের নগরীর সুগন্ধাই নিজস্ব ভবন রয়েছে। রশিদ খুলু আত্মসমর্পণের মাধ্যমে পুনর্বাসনের সুযোগ নিলেও তার ছেলে ও মেয়ের জামাইয়ের বিরুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে।
ইয়াবা নিয়ে ২০১২ সালে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তেমন তদারকি ছিল না। তাছাড়া ইয়াবা নিয়ে তেমন সচেতনতা তৈরি না হওয়ায় খুব দ্রুত জামিনে বের হয়ে আসেন রশিদ খুলু ও তার সহযোগীরা। এরপর তিনি আগের মতোই ইয়াবা কারবার চালিয়ে যান। এরই মধ্যে নগরীর হালিশহরের কর্ণফুলী আবাসিক এলাকায় একটি এবং শ্যামলী আবাসিক এলাকায় একটি বহুতল বাড়ি নির্মাণ করেন তিনি। বাবার পাশাপাশি ছেলে ফয়সাল রশিদও ইয়াবা কারবারে যুক্ত হন। রশিদ খুলু ও পরিবারের সদস্যরা বিএমডব্লিওসহ দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি ব্যবহার করেন।
২০১৫ সালের ১৬ আগস্ট জাহিদুল ইসলাম ওরফে আলো র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। বিভিন্ন ব্যাংকে আলোর ১২ হিসাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা ১১১কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পেয়েছিলেন সেসময়। আলোর ক্রসফায়ারের পরপরই মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যান রশিদ খুলু। পরবর্তীতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানতে পারেন, আলোর চেয়েও বড় ইয়াবা কারবারি হলেন রশিদ খুলু।

Share
  • 194
    Shares