নীড়পাতা » প্রথম পাতা » অর্থ সংকটে বন্ধ অভিযান

কর্ণফুলীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ

অর্থ সংকটে বন্ধ অভিযান

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

কর্ণফুলী নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাছে এক কোটি ২০ লাখ টাকার বরাদ্দ চেয়েছিল জেলা প্রশাসক। ১৬ মাস পেরিয়ে গেলেও সেই বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। অর্থাভাবে ১১ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম। জরিপ ও সীমানা চিহ্নিতকরণের কাজ চলছে বলে দাবি জেলা প্রশাসনের। তবে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, বন্দরের ইজারা দেওয়া জায়গায় একাধিক ভবন নিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন জেলা প্রশাসক। এসব কারণে উচ্ছেদ অভিযানে ভাটা পড়েছে।
হাইকোর্টের নির্দেশনা মেনে কর্ণফুলী নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করে জেলা প্রশাসন। গত ৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়ে ৮ ফেব্রুয়ারি টানা ৫ দিন অভিযান চালানো হয়। এতে ১০ একরেরও বেশি জায়গায় গড়ে ওঠা ২৩০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। ৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হওয়ার পর ১১ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে উচ্ছেদ অভিযান। এতে জনমনে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও শঙ্কা বিরাজ করছে। কারণ উচ্ছেদ অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে নদীখেকোরা তা বন্ধ করার জন্য নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল বলে অভিযোগ ছিল।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, তিন ভাগে ভাগ করে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা নেয়া হয়। প্রথম পর্যায়ে বন্দরের লাইট জেটি ঘাট থেকে মাঝিরঘাট এলাকায় নদীতে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগের উচ্ছেদ অভিযান আপাতত বন্ধ রয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন এ বিষয়ে পূর্বকোণকে বলেন, ‘উচ্ছেদ অভিযানের বরাদ্দের টাকা আমি এখনো ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে পাইনি। মন্ত্রণালয় বলেছে, অর্থ মন্ত্রণালয় টাকা ছাড় দিলে আমি টাকা পাব।’ এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এখন যতটুকু উচ্ছেদ করেছি, তাতে বাউন্ডারি, তার কাঁটার ঘেরা ও পিলার দিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে। এই কাজ করতে গিয়ে অনেক টাকা খরচ হয়ে গেল। তার উপর আরেকটি কাজে হাত দিলে অন্যদিকে আবার বেদখল হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। উচ্ছেদ হওয়া স্থানে আমি বাউন্ডারি ও তারকাঁটার ঘেরা দিতে না পারলে উচ্ছেদ কার্যক্রম কার্যকর হবে না।’
তবে একাধিক সূত্র জানায়, বন্দরের লিজ দেওয়া কয়েকটি স্থাপনা নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় রয়েছে জেলা প্রশাসন। নদীর তীরে গড়ে ওঠা একাধিক বড় স্থাপনার বিষয়ে বন্দর ও জেলা প্রশাসনের মধ্যে ¯œায়ু লড়াই শুরু হয়েছে। বন্দর নদীর তীরের জায়গা লিজ দেওয়ার পর তা অনেকটা বৈধ বলে দাবি করেন লিজ গ্রহীতারা। পতেঙ্গা ও বন্দর এলাকায় একটি কন্টেইনার ডিপো ও চাক্তাই-রাজাখালী খালের তীরে মৎস্য অবতরণকেন্দ্র নিয়ে বিব্রতবোধ অবস্থায় রয়েছে জেলা প্রশাসন। বন্দর থেকে লিজ নিয়ে বিশাল এলাকা দখল করে নিয়ে গড়ে উঠেছে এসব স্থাপনা। মৎস্য অবতরণকেন্দ্র নিয়ে আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা রীতিমতো তদ্বির করে যাচ্ছেন। এই নিয়ে বেকায়দায় রয়েছেন জেলা প্রশাসক। এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করা না গেলে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে কর্ণফুলী অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম।
উচ্ছেদ অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া পতেঙ্গা সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর রহমান গতকাল পূর্বকোণকে বলেন, ‘উদ্ধার হওয়া জায়গায় তারকাঁটার ঘেরা ও দেয়াল নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়াও অন্য দুই ধাপের জরিপ ও সীমানা চিহ্নিতকরণের কাজ চলছে। উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা ও পরবর্তী সংরক্ষণ কাজে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়েছে। পরবর্তী ধাপের কাজ শুরু করতে হলে অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। অর্থ বরাদ্দ পেলেই উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করা হবে।’
২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট কর্ণফুলী নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। ৯০ দিনের মধ্যে দুই হাজার ১৮৭টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করার কথা ছিল। আদালতের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করায় মেয়র, ডিসি, পুলিশ কমিশনার, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, সিডিএ চেয়ারম্যান-সচিব, সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান- মোট আটজনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেন হাইকোর্ট। গত বছরের ৩ জুলাই এই রায় দেন আদালত।
এরপর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নোটিশ জারি করেন করেন জেলা প্রশাসন। গত বছরের ২৮ জুলাই উচ্ছেদ অভিযানের নোটিশ জারি করা হয়। ৯০ দিনের মধ্যে নিজ দায়িত্বে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অপসারণ বা ভেঙে ফেলার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। এতে দেখা যায়, নগরীর পতেঙ্গা, ইপিজেড, বন্দর, কোতোয়ালী, বাকলিয়া ও চান্দগাঁও থানার আওতায় বাকলিয়া মৌজায়, ৩৬৮টি এবং পূর্ব পতেঙ্গা মৌজায় ১৭৪৪টি অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। আদালতের রায় অনুসারে এসব অবৈধ স্থাপনা অপসারণ বা ভেঙে দেওয়া না হলে প্রশাসন তা ভেঙে দেওয়ার উদ্যোগ নেবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মালিকদের কাছ থেকে অপসারণের খরচ আদায় করা হবে।
উচ্ছেদ অভিযানের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ করেছেন জেলা প্রশাসন। উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলে নানা মহলের প্রতিবন্ধকতা ও চাপ ছিল বলে জানায় জেলা প্রশাসন সূত্র। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর একান্ত আগ্রহ ও ইচ্ছায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হওয়ায় জেলা প্রশাসন সব বাধা উপেক্ষা করে কার্যক্রম চালিয়ে যায় জেলা প্রশাসন। এখন প্রথম ধাপের উচ্ছেদ অভিযান শেষ হওয়ার পর থমকে রয়েছে পরবর্তী ধাপের উচ্ছেদ কার্যক্রম। এতে চট্টগ্রামবাসীর মধ্যে নানা শঙ্কা ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রামবাসীর আশঙ্কা, অতীতেও একাধিকবার কর্ণফুলী নদীর উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু তা স্থায়িত্ব লাভ করেনি। ঢাকঢোল পিটিয়ে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হওয়ার পর ১১ দিন ধরে বন্ধ থাকায় জনমনে এসব প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে।
অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার জন্য ২০১৭ সালের অক্টোবর ভূমি মন্ত্রণালয়ে এক কোটি ২০ লাখ টাকার বরাদ্দপত্র দিয়েছিল চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক। এখনো মন্ত্রণালয়ের অনুমতি পাওয়া যায়নি। অর্থ বরাদ্দ না পাওয়া মাঝপথে থমকে রয়েছে উচ্ছেদ অভিযান।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন পূর্বকোণকে বলেন, কর্ণফুলী নদীকে বাঁচাতে চাইলে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কেউ যেন লুকোচুরি করতে না পারে আন্তরিকভাবে দেশ, সরকার ও কর্ণফুলী বাঁচানোর জন্য কাজ করতে হবে। না হলে কর্ণফুলীর কিছুই হবে না। মহামান্য আদালতের রায় বাস্তবায়ন করতে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
প্রসঙ্গত, ২০১০ সালে কর্ণফুলী নদীর গতিপথ স্বাভাবিক রাখতে নদীর সীমানা নির্ধারণ, দখল, ভরাট ও নদীতে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখার জন্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করা হয়। মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস এ- পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ জনস্বার্থে এ রিট দাখিল করেন। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালের ১৮ জুলাই কর্ণফুলীর নদীর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও ভূমি জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালে জেলা প্রশাসন কর্ণফুলী নদীর সীমানা নির্ধারণ ও অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করেন। এতে নদীর দুই তীরে দুই হাজার ১৮৭টি অবৈধ স্থাপনা রয়েছে।

Share
  • 9
    Shares