এম এম আহমদ মনির, লোহাগাড়া

কোন কোন ক্ষেত্রে নামের সাথে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এরপরও নাম সর্বস্ব পরিচিতি মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। কালের আবর্তন-বিবর্তন প্রভৃতির কারণে ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশের পরিবর্তন ঘটে। এতে হারিয়ে যায় জৌলুসমাখা অতীত স্মৃতি এবং বাস্তবতা। কিন্তু যুগ যুগ ধরে লোকমুখে টিকে থাকে নামসর্বস্ব পরিচিতি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নামের মিল থাকলেও বাস্তবতায় সম্পূর্ণ অমিল। এ ধরনের অনেক দৃষ্টান্তের মধ্যে পূর্ব কলাউজানের আদারচর নামক এলাকাটি। টংকাবতীর মায়াভরা ধূ-ধূ বালুচর। অতি প্রাচীনকালে বিশাল এ চরজুড়ে চাষ হতো আদার। আদা নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য। প্রতিটি পরিবারে রান্নার কাজে আদা ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে মাছ ও মাংস রান্না করতে আদা ব্যবহার করতে হয়। বর্তমানে উপকরণ হিসেবে অন্যান্য কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে। পূর্ব থেকে আদার চাহিদা ব্যাপক। চর এলাকায় এর চাষ হয় বেশি।
উল্লেখ্য, আদার চর এলাকাটি পূর্ব কলাউজানে প্রাচীন নিদর্শন গাবতলা সংলগ্ন টংকাবতী খালের তীর এলাকা বালু চর। অদূরে রয়েছে বনভূমি ও এর সহিত সংযুক্ত পার্বত্য জেলার গভীর অরণ্য। নানা প্রজাতির বৃক্ষ, বাঁশ, বেত ছাড়াও রয়েছে বন্যপ্রাণির অবাধ বিচরণ। প্রকৃতির অপরূপ শোভাম-িত এ এলাকার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে টংকাবতী খাল। খালের বুকে জেগে ওঠা চরে তৎকালীন সময়ে খালের পাড়ের বাসিন্দারা নানারকম সুবিধা থাকার কারণে আদা চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েন। সূত্রে জানা গেছে, এতে চাষীরা লাভবানও হতেন। যে কারণে এলাকার অনেকেই আদার চাহিদা থাকার কারণে চাষে আগ্রহী হন। সম্প্রতি এলাকাটি পরিদর্শন করতে গেলে ওই এলাকার বাসিন্দা ও বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান এম.এ ওয়াহেদের সাথে সাক্ষাৎ হয়। আদারচর সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, বহু প্রাচীনকালে চর এলাকাটি আদা চাষের উপযোগী হওয়ায় চর পাড়ের বাসিন্দারা আদা চাষে ঝুঁকে পড়েন। উৎপাদন, চাহিদা ও সরবরাহ সমানে চলতে থাকলে দূর-দূরান্তের ক্রেতারা পাইকারি মূল্যে ক্রয় করে নিয়ে যেতেন। সময় সময় চাষীরা বিভিন্ন হাট-বাজারেও বিক্রি করতেন। ফলে, ওই চরটি আদারচর নামে পরিচিতি লাভ করে।
খালের প্রবাহ পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তন ঘটে ভৌগোলিক অবস্থানের। চরাঞ্চলে সৃষ্টি হয় জনপদ এবং গড়ে উঠে লোকালয়। সামান্য ব্যবধানে গড়ে উঠে গাবতলা বাজার ও বৌদ্ধ কেয়াং। আবহাওয়া ও পরিবেশের সাথে তাল মিলিয়ে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির বিকাশ ঘটে। মন-মানসিকতা ও রুচিরও পরিবর্তন ঘটতে থাকে ক্রমশঃ। রুচির সাথে চাহিদারও পরিবর্তন হয়। চরের আবাদি জায়গা সংলগ্ন রয়েছে খালের পানি। পানি সেচের সহজ ব্যবস্থা থাকায় আদা চাষীরা বিভিন্ন শাক-সবজি উৎপাদনের দিকে নজর দেন। দেখায় দেখায় অন্যরাও আগ্রহী হন। পরবর্তীতে পুরো চরাঞ্চলে সৃষ্টি হয় সবুজের সমারোহ। শিম, বেগুন, কাঁচা মরিচ, টমেটো, আলু, বাঁধাকপি, ফুলকপি, মূলা, লাল শাক, ধনিয়া পাতা, বরবটিসহ নানা জাতের শাক-সবজি ও তরি-তরকারি উৎপাদন হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে। চাষীরাও আনন্দিত ও লাভবান। উৎপাদন, চাহিদা ও সরবরাহ ব্যাপক। তাই বর্তমানে নামসর্বস্ব আদারচরে আদা নেই, আছে শাক-সবজি ও তরি-তরকারি উৎপাদনের চারণভূমি।

Share