মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

ত্রিপল বিছিয়ে কেউ বসে আছে ধ্বংসস্তূপে। কেউ আতরাচ্ছে ছাই, ধ্বংসস্তূপ। কেউবা পুড়ে যাওয়া ঘর পুনর্দখলে ব্যস্ত। এরইমধ্যে আবার ছুটে যাচ্ছে ত্রাণের আশায়। সবই হচ্ছে সেই আলোচিত যুবলীগ নেতা আকতার হোসেনের নিয়ন্ত্রণে।
কর্ণফুলী নদীর ড্রেজিং মাটি ভরাট করে সরকারি খাস জমি দখল করে রাজাখালী খালের তীরে ভেড়া মার্কেট এলাকায় এই বস্তি গড়ে ওঠে। সরকারি খাস জমি দখল করে বস্তিঘর নির্মাণ ও বস্তি দখল-সবকিছুর নিয়ন্ত্রক ছিল আকতার হোসেন প্রকাশ কসাই আকতার। আকতার সরকারি খাস জমি দখল করে এবং বস্তিঘর ভাড়া দিয়ে লাখ লাখ টাকার মালিক হয়েছেন। পুড়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়া বস্তিও এখন আকতারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তার নেতৃত্বে চলছে পুনর্দখলের কাজ।
চাক্তাই এলাকায় সরকারি খাস জমি দখল করে গড়ে ওঠা এই ভেড়া মার্কেট বস্তিতে আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যায় তিন পরিবারের আটজন। বস্তির বাসিন্দা সবাই নি¤œ আয়ের লোকজন।
কর্ণফুলী নদীর তীরে সরকারি খাস জমি দখল করে একাধিক বিশাল বস্তি গড়ে ওঠে। শাহ আমানত সেতুর পূর্ব পাশে বাস্তুহারা বস্তির নিয়ন্ত্রক ছিলেন জসিম উদ্দিনের দখলে। বাস্তুহারা জসিম বস্তিঘর দখল করে কোটিপতি হয়েছেন। আরও ভেড়া মার্কেট বস্তি হচ্ছে আকতারের নিয়ন্ত্রণে। বস্তির দুই রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জসিম ও আকতারের মধ্যে বিরোধ ছিল। গত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জসিম কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করেন। আকতার তার বিরোধিতা করেন। দ্বন্দ্বের জের ধরে জসিম আকতারকে ছুরিকাঘাত করে গুরুতর আঘাত করে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভেড়া মার্কেট নির্মাণের পর ১৯৯৮ সালের দিকে কসাই কাজ করতেন আকতার হোসেন। সেই থেকে কসাই আকতার হিসেবে পরিচিত। তখন তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ২০০৬ সালের আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে বোল পাল্টে রাতারাতি আওয়ামী লীগ বনে যান। পরবর্তীতে ওয়ার্ড যুবলীগের সহ-সভাপতি হন। সেই থেকে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন আকতার হোসেন। নদীর তীরে গড়ে ওঠা সরকারি খাস জমি দখল করে বস্তিঘর নির্মাণ থেকে শুরু করে পুরো বস্তি নিয়ন্ত্রণ তার দখলে চলে যায়।
বস্তিঘর নির্মাণের পর আকতারের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে চাক্তাই ভেড়া মার্কেট শ্রমজীবী কল্যাণ সমবায় সমিতি। আকতার ওই সমিতির সভাপতি।
পুরো বস্তি কসাই আকতারের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আলাদা আলাদা মালিক রয়েছেন। তাদের অনেকেই আকতারের কাছ থেকে জমি কিনে মালিক হয়েছেন। তাদের নামে আলাদা কলোনিও রয়েছে।
বাসিন্দাদের অনেকের অভিযোগ, জেলা প্রশাসক কর্ণফুলী নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান শুরু করলে অনেকেই বাসা ছেড়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু কলোনির মালিকেরা তাদের বাধা দেন। বাসা ছাড়তে চাইলে দুই মাসের ভাড়া দাবি করে। এতে বাধ্য হয়ে অনেকেই মৃত্যুকূপে থাকতে বাধ্য হয়েছেন।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, সরকারি খাস জমি দখল করে এই বস্তিঘর নির্মাণ করা হয়েছে।
দেখা যায়, পুড়ে যাওয়া বস্তিঘর পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কলোনির মালিকের পক্ষে লোকজন জায়গা দখল করে সীমানা ঠিক করছেন। বাঁশ ও টিন দিয়ে দখল প্রক্রিয়ার কাজ চলছে।
অভিযোগ ছিল, ভেড়া মার্কেট বস্তিতে দীর্ঘদিন ধরে মদ-জুয়ার আসর ও অসামাজিক কার্যকলাপ চলে আসছে। আকতারের নেতৃত্বে ১০-১৫ জনের একটি গ্রুপ পুরো বস্তি নিয়ন্ত্রণ করত। বাকলিয়া, কোতোয়ালী ও চাক্তাই পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা জুয়ার আসর থেকে মাসোহারা ও দৈনিক ভিত্তিতে ভাগ পেত। ভেড়া মার্কেট বস্তি থেকে জুয়ার আসর ও অসামাজিক কার্যকলাপ বন্ধে আন্দোলন করা হলেও অদৃশ্য কারণে বন্ধ হয়নি সেই জুয়ার আসর।
এলাকাবাসী জানান, কর্ণফুলী নদীর ড্রেজিং মাটি ভরাট করে এই বস্তি বানানো হয়। বস্তিঘর নির্মাণ থেকে জায়গা বিক্রি সবই হয়েছে কসাই আকতারের নিয়ন্ত্রণে। কসাই আকতার সরকারি খাস জমি দখল করে লাখপতি বনেছেন। শুধু আকতার নয়, বস্তিতে তার দুই ভাই ও নিকট স্বজনদের পুনর্বাসন করেছেন। জুয়ার আসর, অসামাজিক কার্যকলাপ-দেহ ব্যবসা ও মাদক ব্যবসা ভাগ করে একেকজনকে দায়িত্ব দিয়েছেন। তবে সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হচ্ছে আকতার হোসেন। এতে চাঁদা ওঠানোর কাজে রয়েছেন আকতারের ম্যানেজার নুরুল হক, ভাই বাহাদুর, কবির, মুন্না, হেলাল, সাইফুল, নবী। তাদের নেতৃত্বে ১০-১২ জন জুয়া-মাদক আসর ও অসামাজিক কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।
আকতারের বাড়ি কর্ণফুলী নদীর ওপারে শিকলবাহা কোদ্যাল্লাপাড়ায়। শিকলবাহা মাস্টারহাটে কসাই কাজ করতেন। নগরীর ভেড়া মার্কেট এলাকায় এসে কসাই কাজ শুরু করেন এবং থাকার জন্য ভেড়া মার্কেটের পেছনে একটি ঝুঁপড়ি ঘর নির্মাণ করেন। সেই ঝুঁপড়ি থেকে বিশাল বস্তি দখলে নেয় আকতার। সরকারি খাস জমি দখল করে আকতার গ্রামের বাড়িতে দুইতলা বিশিষ্ট পাকা দালান নির্মাণ করেছেন।
বাকলিয়া থানা ও চাক্তাই পুলিশ ফাঁড়ির কর্মকর্তাদের নামে ভাগে ভাগে টাকা উত্তোলন করা হয়। সবচেয়ে বড় ভাগ নেয় আকতার, তার ভাই ও স্বজনদের নামে। দিনে ২০-২৫ হাজার টাকার চাঁদা ওঠানো হয়।
স্থানীয়রা জানায়, জুয়ার আসর ছাড়াও দেহ ব্যবসা, ইয়াবা ব্যবসা চলে আসছে। দেহ ব্যবসায় মেয়ের সাথে ছবি তোলে টাকা আদায়েরও অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও দোকান কর্মচারীদের আটকিয়ে পুলিশের ভয় দেখিয়ে তা আদায় করা হয়। দেহ ব্যবসা ও জুয়ার আসরে প্রতারণার ফাঁদ আটকানো হয়।
আকতারের নেতৃত্বে এই বস্তিতে নানা অপকর্ম ছাড়াও ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে একাধিক সূত্র জানায়।

Share
  • 1
    Share