আবসার হাবীব

মাতৃভাষা দিবস …….. আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের প্রস্তাবনার ভেতর বলা হয় সবধরণের সংকীর্ণতা পরিহার করে ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা। মাতৃভাষার প্রচলন ও বিকাশের সকল প্রচেষ্টা তাই কেবল ভাষাগত বৈচিত্র্য ও বহুভাষী শিক্ষাকে উৎসাহিত করবে না, বিশ্বব্যাপী ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সামগ্রিক সচেতনতা বিকাশেও ভূমিকা পালন করবে এবং সংলাপ, সমঝোতা ও সহনশীলতার ভিত্তিতে সংহতিকে উৎসাহিত করবে।
এই গৌরবের দিনে বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর সদস্যদের ভাষার প্রতিও আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে এবং বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর মাতৃভাষা অধিকারকে প্রসারিত করার সাথে সাথে ভাবতে হবে সেসব ক্ষুদ্র ভাষা সত্তার কথাও। যেসব ভাষার লেখ্যরূপ বিকশিত হয়নি, তাদের শিক্ষাকাঠামো গড়তে সহায়তা করতে হবে। তাই, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস শুধু দেশের ভেতরে নয়, বিভিন্ন দেশে যারা ভাষার জন্য এখনো লড়ছে তাদের জন্যও কাজ করতে হবে, দিতে হবে নৈতিক সমর্থন। তাহলে দেশে দেশে এই মাতৃভাষা পালনের সার্থকতা আমরা খুঁজে পাবো। মনে রাখতে হবে এ ‘মাতৃভাষা দিবস’ পৃথিবীর প্রায় ৪ হাজার ভাষার জাতি জনগোষ্ঠীর। বিশ্বের ইতিহাসে ভাষার জন্য লড়াইয়ের এই অনন্য ঘটনা আজ সারা বিশ্ব ভাষার জন্য যেসব জাতি লড়াই করছে তাদের প্রেরণা হয়ে দাঁড়াবে।
শহীদ স্বপন পার্ক ……. একাত্তরের শহীদ স্বপনকে এখন আর আমাদের মনে নেই। শহীদ স্বপনের নামের পাদদেশে স্থাপন করা হয়েছিলো একটি ছোট শহীদ মিনার। সেই মিনার ছিলো আমাদের চেতনার সেই শহীদ মিনারটিকে ঘিরেই চট্টগ্রামের জনগণের দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান শহীদ মিনারটি নির্মাণ করা হয়। এই শহীদ মিনারের সামনে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী মুসলিম হল। পাবলিক লাইব্রেরী। একটি ছোট্ট স্টুডিও থিয়েটার। সবই ভেঙে তৈরি হচ্ছে বিশাল সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এর সাথে যুক্ত হয়েছে শহীদ মিনার সংলগ্ন এলাকায় একটি থিয়েটার ইন্সিটিটিউট। সেইটিরও উন্নয়ন কাজ চলছে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ….. আজ একুশে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আমরা স্মরণ করছি সালাম, জব্বার, রফিক, বরকতসহ আরো অনেক ভাষা শহীদদের। বিশ্ব ইতিহাসে ভাষার জন্য লড়াইয়ের এই অনন্য ঘটনা আজ সারা বিশ্বে ভাষার জন্য যেসব জাতি লড়াই করছে তাদের প্রেরণা হয়ে দাঁড়াবে, মহান মে দিবসের মতো।
বিশ্বের ১৮৮টি দেশ নিয়ে গঠিত জাতিসংঘ সংস্থা ‘ইউনেস্কো’ আনুষ্ঠানিকভাবে প্যারিসে ঘোষণা করেছে গত ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ তারিখে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে। এখন থেকে সারা বিশ্বে প্রতিবছর এই দিবস পালিত হবে ১৯৫২ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য শহীদদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করার লক্ষ্যে। এই প্রস্তাব উত্থাপনে ২৭টি দেশ বাংলাদেশের সাথে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করে। দেশগুলো হলো সৌদি আরব, মিসর, রাশিয়া, ওমান, পাপুয়া নিউ গিনি, শ্রীলঙ্কা, ভারত, বাহামা, স্লোভাকিয়া, প্যারাগুয়ে, ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, বেলারুশ, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, কোতে দি আইভরি, ভারত, হন্ডুরাস, গাম্বিয়া, মাইক্রোনেশীয় ফেডারেশন, ভানুয়াতু, ইন্দোনেশিয়া, কমোরো দ্বীপপুঞ্জ, ইরান, লিথুয়ানিয়া, ইতালি, সিরিয়া ও মালয়েশিয়া।
এই সম্পর্কে একজন লেখক মন্তব্য করেছেন, ‘শিক্ষা-কর্মকান্ডে সমান্তরাল ধারা তৈরী করে মাতৃভাষার প্রতি অনাদর-উপেক্ষার একটি এলিটবাদী ঘরানাও আমরা তৈরী করেছি। দ্বিতীয় ভাষায় পারঙ্গম হতে গিয়ে মাতৃভাষায় দুর্বল হওয়ার যে নেতিবাচক শিক্ষাপ্রণালী সেটা মোচনের কথাও ভাবতে হবে। আজকের গৌরবের দিনে আমরা আমাদের দেশের ভিন্ন ক্ষুদ্র জাতীয়তার সদস্যদের মাতৃভাষার অধিকারের প্রশ্নটিও সামনে এনে রাখবো। পার্বত্য শান্তি চুক্তি এক্ষেত্রে যে বিকাশের সম্ভাবনা তৈরী করেছে তার যত্নশীল বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
মাতৃভাষা ও দারিদ্র. ….. ঊনিশ’ বায়ান্নো সালে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে, বাংলা ভাষাকে একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের চেতনার গভীরে যে শিকড় বিস্তার করেছে, তার পরিচর্যার জন্যে চাই শিক্ষা ও দারিদ্র মোচনের দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা ও আন্দোলন। শুধু শহরে নয়, গ্রামে গ্রামেও। যেখানে মানুষ ফসল তোলার গান করে ভোরের আলোয়। কিন্তু সে মাতৃভাষায় লিখতে পড়তে জানে না। এই শিক্ষা বঞ্চিত জীবনে তারা ঠকে। তোলা ফসল আর ঘরে যায় না। ফলে দু:খ আর কাটে না। ভোরের আলো রাতের অন্ধকার হয়ে নামে তাদের জীবনে। বড় দু:সহ সে জীবন।
তাই, দেশের সচেতন মানুষ চাই শিশু শিক্ষার পাশাপাশি, বয়স্ক শিক্ষা, কারিশিক্ষাকে সরকার ও বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থাসমূহ চ্যালেঞ্জ হিসাবে গ্রহণ করুক। আমাদের যাকিছু অর্জন তা শিক্ষা ছাড়া মুক্তির কোনো পথ নেই গ্রামের আর শহরের দরিদ্র মানুষের।
আমরা প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করি। প্রভাত ফেরী করি। ‘আমার ভাইয়ের রক্ত রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ গান গাই। কিন্তু আমাদের চাই সেই শিক্ষা যেশিক্ষা দরিদ্র শ্রেণীর মানুষের জন্য – তারাও যেন অর্জন করতে পারে লিখতে পড়তে পারার সক্ষমতা। পাঠ অভ্যাসের জন্য চাই নিত্য নতুন বইপত্র, মজার মজার গল্প-উপন্যাস। ইতিহাস, দেশ ও সমাজ সচেতনতা বিষয়কগ্রন্থ।
পুনশ্চ : একুশে ফেব্রুয়ারি. ….. আমরা একুশের শহীদদের ভুলতে পারিনা। এই একুশই আঙলার মানুষকে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিযেছে। সাহস জুগিয়েছে। বায়ান্নোর শহীদদের রক্ত আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশ ও জাতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষর সমান অধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির মূলমন্ত্রও তাই। একুশের চেতনাকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে না পারার কারণেই মুক্তিযুদ্ধের সকল অর্জন ব্যর্থ হয়ে গেছে।
আমাদের নিরাশ হওয়ার মতো কিছু নেই। ভয় পাওয়ার মতো কিছু নেই। আছে একুশের চেতনা এবং মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র ইতিহাস। এই চেতনা ও ইতিহাসের হাত ধরে আমরা এগিয়ে যেতে চাই।

Share