অধ্যাপক মুহাম্মদ ইব্রাহীম কুতুবী

দেশ কিংবা সমাজে এমন কিছু সাধক পুরুষের আবির্ভাব হয়, যারা নিজেকে জাতি কিংবা মহান আল্লাহর কাছে সমর্পণ করে দিয়েছেন। যাদের পদার্পণ জগত ও জীবনকে আলোকিত করে তুলেছেন। জাতি ও সমাজের মধ্যে ধর্ম-দর্শন, সমাজ কর্ম, মানবসেবা ও আধ্যাত্মিকতায় নবজাগরণ সৃষ্টি করে গেছেন। তাদের মধ্যে স্মৃতির পাতায় অলিয়ে স¤্রাট, মুজাদ্দেদে আখেরুজ্জামান, গাউছে মোক্তার হযরতুল আল্লামা শাহ সুফি আবদুল মালেক মহিউদ্দিন আল কুতুবী (রাঃ) নানাজান কেবলা অন্যতম। কক্সবাজার জেলার একটি দ্বীপ কুতুবদিয়া। যে দ্বীপের মাটি ও মানচিত্রের সাথে স্বর্ণাক্ষরে লিখা আছে এ মহান আধ্যাত্মিক সাধক এ মহান মনীষী পুরুষের নাম।আজ(১৯-০২-২০১৯ইং) উপমহাদেশের এ আধ্যাত্মিক সাধক পুরুষ,কুতুব শরীফ দরবারের পীর, গাউসে মোখতার হযরতুল আল্লামা শাহ আবদুল মালেক মহিউদ্দিন আল-কুতুবী (রাঃ)১৯তম বার্ষিক ওরস ও ফাতেহা শরীফ।
জন্ম ও পরিচিতি ঃ আধ্যাত্মিক সাধক পুরুষ আল্লামা হযরত আবদুল মালেক মহিউদ্দিন আল-কুতুবী (রা) ২১ জুলাই ১৯১১ ইং মোতাবেক ৬ শ্রাবন ১৩১৭ বাংলা ২৪ রজব ১৩২৯ হিজরী জুমাবার তৎকালিন মহকুমা কক্সবাজারস্থ কুতুবদিয়া দ¦ীপে লেমশী খালী ইউনিয়নে বড় হাফেজ বাড়ী নামক এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা হযরত হাফেজ শামসুদ্দীন (রাঃ)বড় হাফেজ নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি নিজ বাডিতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন হেফজখানা। জানা যায়, সূদুর বার্মা তথা মায়ানমা থেকেও এখানে ছাত্ররা আল- কোরানের দরস নিতে আসত। মহীয়ষী মমতাময়ী মাতা বেগম বদিউজ্জামান (রাঃ) ছিলেন একজন তাপসী মহিলা। পবিত্র কোরানের অধিকাংশ আয়াত তার মুখস্থ ছিল। ব্যাখায় তিনি পারর্দশী ছিলেন। এলাকার মহিলাদের কাছে তিনি ধর্মীয় বিষয়াদি কোরান সুন্নাহর আলোকে আলোচনা করতেন। এই মহিমান্বিত দম্পতির মেধাবী সন্তান হযরত আল্লামা শাহ আবদুল মালেক মহিউদ্দিন আল-কুতুবী (রাঃ)।
গবেষণা ও অনুসন্ধানে জানা যায়, আধ্যাত্মিক সাধক শাহ সুফি হযরত আবদুল আলেক মহিউদ্দিন আল কুতুবী (রাঃ) বংশ পরম্পরায় আরবের সৈয়দ বংশের উত্তরসূরী। যারা মানবতার অগ্রদূত, খাতেমুন নবীয়িন হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর সুন্নাত পরিপূর্ণ অনুস্মরণকারী ও অনুকরণকারী হিসাবে খ্যাত, যারা ইসলাম ধর্মকে প্রচার করতে এসেছিলেন বাংলা হয়ে আরকান রাজ্য পর্যন্ত এসেছিলেন। কথিত আছে, তৎকালীন সুদূর আকিয়াব (আরকান) থেকে চাটিগাঁ (চট্টগ্রাম) পর্যন্ত বড় হাফেজ পরিবারের ৩য় প্রজন্মের প্রজ্জলিত সাধক পুরুষ শাহ সুফি আবদুল মালেক মহিউদ্দিন আল কুতুবী (রাঃ) নানাজান কেবলা।
শিক্ষাজীবন ঃ শাহ সুফি আলহাজ্ব আবদুল মালেক মহিউদ্দিন আল কুতুবী (রাঃ) (নানাজান) শিক্ষা জীবন নিয়ে নানামত পাওয়া যায়। তবে বিশ্বস্ত সূত্র মতে তার বাল্য ওস্তাদ ছিলেন কুতুবদিয়া ছমদিয়া সিনিয়ার মাদ্রাসার তৎকালীন প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ও মওলানা আবদুস সাত্তার। তিনিই ছাত্র আবদুল মালেক মহিউদ্দিন আল কুতুবী (রাঃ)-র জ্ঞানের প্রখরতা, কারামত সম্পর্কে তিনিই একমাত্র প্রথম তার সম্পর্কে ওয়াকেবহাল হয়ে মন্তব্য করেছিলেন। তিনি একজন সাধারণ ছাত্র নয় একদিন হয়ত মহাপুরুষ হবেন, জাতি ও সমাজকে নবজাগরণের দিশা দেবে। অবশেষে সেই শিক্ষকের দোয়া কবুলও হয়েছে। আমরা সেই ওস্তাদের জান্নাতুল ফেরদৌসবাসী হউক এ কামনা করছি। তিনি শিক্ষাজীবন শুরু করেছেন ১৯২৬ খ্রীষ্টাব্দে কক্সবাজারজেলাস্থ কুতুবদিয়া ছমদিয়া মাদ্রাসা থেকে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শুরু। ১৯৩০খ্রীষ্টাব্দে ভর্তি হন চট্টগ্রাম দারুল উলুম আলীমা মাদ্রাসায় । অত্র মাদ্রাসায় অধ্যায়ন কালে সুলতানুল আউলিয়া হজরত হাফেজ সৈয়দ মুনির উদ্দিন নুরুল্লাহ (রাঃ)এর নিকট বাইয়াত লাভ করেন এবং পরবর্তীতে খেলাফত প্রাপ্ত হন এবং পরে ভারতের সবচাইতে প্রাচীন মাদ্রাসা দেওবন্দ আলীয়া মাদ্রাসা থেকে কামিলে কৃতিত্বের সাথে শিক্ষা জীবনের ইতি টানেন।
জীবন ও কর্ম ঃ অলিকুল শিরোমনি শাহ সুফি আবদুল মালেক মহিউদ্দিন আল কতুবী (রাঃ) (নানাজান কেবলা) শিক্ষাজীবনের ইতি টেনে সর্বপ্রথম দেশে এসে কুতুবদিয়া লেমশেখালীতে হামেদীয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং তথায় শিক্ষকতা করেন। চট্টগ্রামে জালালাবাদ এলাকায় হযরত আল্লামা কাজী নুরুল ইসলাম হাশেমী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার শুভ উদ্বোধন করেছিলেন। যার স্মৃতিস্তম্ভ এখনো মাদ্রাসা চত্বরে বিরাজমান। তাছাড়া তিনি অসংখ্য দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। তার প্রখর জ্ঞানে আধ্যাত্মিক সাধনায় মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অসীম প্রেমে আশেক এ মনীষী পুরুষ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনের বৃত্ত হতে আধ্যাত্মিক জগতে চলে গেলেন। তিনি সব সময় ধ্যানে মগ্ন থাকতেন, কারো কারো মতে তিনি আল্লাহর আধ্যাত্মক সাধনার জন্য বিভন্ন আউলিয়া বুর্জগের দরবারে বিচরণও করেছেন। মজলুম হয়ে তিনি কখনো ভারতের আজমগড়ে, কখনো দিল্লীর রাজস্থানে ধু-ধু প্রান্তর বেয়ে আজমিরে অধ্যাত্মিক সাধনার জন্য তিনি পাড়ি দেন।
আলেমদের দারুল হিকমা, সিরাতুন্নবী (সঃ) ঃ হযরত শাহ সুফি আবদুল মালেক মহিউদ্দিন আল কুতুবী (রাঃ) (নানাজান) বলতেন দ্বীন ও মিল্লাতেন মূল সমস্যা আমার কাজ। যারা মূল সমস্যা উপলব্ধি করতে পারবে তারাই আমার কাজ বুঝবে। তিনি সমস্ত আলেম সমাজকে একত্রিক করার জন্য এ অঞ্চলে সর্বপ্রথম ১৯৭৬ সালে সিরাতুন্নবী (সঃ) মাহফিলের আয়োজন করে কুতুব শরীফ দরবারকে আলেমদের দারুল হিকমায় পরিণত করেছিলেন। এ সিরাতুন্নবী তথা সালানা জলসায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আলেমরা সমবেত হতেন নানা জানের উচিলায়। বর্তমানে এ দরবারের পরিচালকের দায়িত্বে আছেন তার সুযোগ্য দি¦তীয় সন্তান শাহজাদা শাহসুফি শেখ ফরিদ আল কুতুবী (রাঃ)। তিনিও পিতাজানের আদর্শ বাস্তবায়নে কুতুব শরীফ দরবারের সাজ্জাদাদিন হয়ে সেবা দানে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

লেখক ঃ আইনজীবী ও সাংবাদিক

Share