ড. নিজামউদ্দিন জামি

প্রথমেই প্রশ্ন জাগে এক পাঠক বা গ্রাহক কটা বই কিনবেন? সব লেখকই চান, তাঁর বইটা কিনুক। পাঠকতো তাঁর সাথে যায় না-এমন বই কিনতে নারাজ। তারপরও অনুরোধের ঢেঁকি গিলতে হয় প্রায়সময়। ‘পুশসেল’ বলে একটা বিড়ম্বনা আছে! সে কারণে মেলা থেকে প্রয়োজনীয় বই আর কেনা হয় না। বইয়েরওতো একটা ওজন আছে! হুমায়ুন আহমেদ নতুনদের বই সংগ্রহ করে পড়তেন না, কেউ দিলে পড়তেন। কারণ জীবন সংক্ষিপ্ত, অনেক বইপড়া বাকি। তাই তিনি সেই বইগুলি পড়তে চেয়েছেন, যে বই পৃথিবীকে সত্যি আলোকিত করেছে, করবে। এমন ধারণা প্রায় লেখক-পাঠকই পোষণ করেন। এজন্য প্রকাশকও ঝুঁকি নিতে চান না, ঝুঁকি নেন না পাঠকও। তাহলে কি নতুন লেখক লিখবে না?
ওরা না লিখলে পৃথিবীর গতি থেমে যাবে। ওরাই তো আগামির পথ তৈরি করবে। বই লিখে আজ যারা বিখ্যাত হয়েছেন, তাঁরা সকলেই একসময় আনাড়ি ছিলেন। প্রথম বই বের করার ঝুঁকি তাই সবাইকে নিতে হয়েছে। এখনও হচ্ছে, আগামীতেও হবে। এ অভিজ্ঞতা কত বৈচিত্র্যময় তা অন্যত্র আলাদা আয়োজনের দাবি রাখে।
পড়ুন। ভাবুন। এরপর লিখুন। বেশি পড়ুন, তারপর ভাবনার ছক বা গতিপথ তৈরি করুন। তারপর লিখুন। কিন্তু কী পড়বেন? সেটা আপনাকেই নির্বাচন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, পড়া যদি শুদ্ধ না হয়, লেখাও অশুদ্ধ হবে। আর যা লিখবেন, সব যে বই আকারে বের করতে হবে, সে চিন্তা মাথায় নেবেন না। আগে বিষয় নির্বাচন করুন। আপনার লেখা কোন জায়গায় ঝুলে গেছে, তা দেখুন। বাক্যগঠন ঠিক আছে কি-না বারবার পড়ুন। যে শব্দ পড়তে বা শুনতে বা ভাবপ্রকাশে আটকাচ্ছে, তার বিকল্প শব্দ থাকলে বার করুন এবং যথাস্থানে প্রয়োগ করুন। শব্দচয়ন উৎকৃষ্ট বা ভাবপ্রকাশের উপযোগী না হলে আপনার ছুটি নাই। কারণ লেখালেখি একটি ফুলটাইম জব, পার্টটামার লেখালেখিতে সুবিধা করতে পারে না। পৃথিবীতে লেখালেখির মতো কষ্টসাধ্য কাজ আর কী আছে, তা আমার জানা নেই। আপনার লেখাটির পাঠক কারা, উত্তর খুঁজুন। আপনার লেখা প্রকাশ না পেলে পৃথিবীর কোনো ক্ষতি হবে কি-না ভাবতে পারেন। প্রকাশ পেলে কী লাভ হবে, কোন ম্যাসেজটা আপনি পাঠককে দিতে চান, তা সবার আগে আপনাকেই নিশ্চিত হতে হবে। কোন প্রকাশনী থেকে বের করবেন, তাদের টাকা দিতে হবে কি, হবে না সেটাও এ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে জেনে যাবেন। নতুন লেখক প্রায়শ নিজের টাকা দিয়ে বই ছাপেন। তার দরকার আছে কি-না? যদি দরকার থাকে অবশ্যই আপনি বইটি ছাপবেন, যেভাবেই হোক। আর যদি দরকার না থাকে, তাহলে বইয়ের বোঝা বাড়িয়ে অন্যকে বিভ্রান্ত না করাই ভদ্রতা। লেখা নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট চালাতে হয়। অনেকের বই বের করার রোগও আছে। কী লিখেছে, কেন লিখেছে-সে বিষয়ে ওয়াকিবহাল না হয়েও তারা লেখক হতে চান। অনেকে আজেবাজে পান্ডুলিপি আর টাকা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন। পরে এসে শুধু মলাটবদ্ধ বইটি নিয়ে যান। সে রোগ থেকে নিষ্কৃতি পেতে হবে নতুন লেখকদের। প্রকাশক একসময় ভালো পান্ডুলিপি তৈরির তাগাদা দিতেন লেখককে, এখন সে রীতি অচল। এখন এরাব ্ ঞধশব-র যুগ। যাকে বলতে পারি নগদনারায়ণ! সম্পাদনা পরিষদের সুপারিশে মানোত্তীর্ণ বইটি কেবল বের হওয়া উচিৎ। এখন সে ফুরসৎ নাই অধিকাংশ প্রকাশকের। বাংলা একাডেমি, এশিয়াটিক সোসাইটিসহ আরো বেশকিছু প্রকাশনা সংস্থা আছে, যারা তাদের চরিত্র ধরে রাখতে পেরেছে।
মনে রাখতে হবে, আপনার বইটি যদি কালের বিচারে টিকে যায়, তাহলে আপনার সাধন-লেখন স্বার্থক। আমি মোটেও বলছি না যে, লেখকের বই কালজয়ী হবে কি হবে না, সেটা আগে থেকে জানতে হবে বা জানা যাবে। কোন বই কখন জনপ্রিয় হয়, সেটা লেখকও জানেন না। আপনি যদি নিশ্চিত হন যে, আপনার এ বই পাঠকের কাজে আসবে, বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা উপজীব্য করে যদি আপনি আপনার চিন্তার সুচারু প্রকাশ ঘটাতে পারেন, সেটা ইতিহাসের সত্যই হোক, কিংবা কবিতা-কল্পনাই হোক, তাহলেই আপনি লেখক। আপনার চলার পথে ফুলচন্দন পড়ুক, আপনি এগিয়ে যান। আমাদের শুভেচ্ছা থাকলো। এলোমেলো গ্রন্থনা, না পড়ে বই লেখা, বিষয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকা, অশুদ্ধ বানান ইত্যাদি দোষণীয় তাই বর্জনীয়ও। লেখার প্রতি আপনার শ্রদ্ধাবোধ না থাকলে অন্যের শ্রদ্ধাবোধও আপনি পাবেন না। তাই আগে নিজে তৈরি করুন, নিজেকে বিশ্বাস করুন, তারপর যাত্রা। প্রকাশনায় এবঃঁঢ়, ঝবঃঁঢ়-ও একটি আর্ট। আপনার রুচি-চিন্তার ছাপ থাকবে তাতে। ভালো বাইন্ডিংও অংশ। এরপরও কথা থাকে, সব কাজ শেষ করে পাঠকের হাতে বই তুলে দিতে না পারলে ষোলআনাই বৃথা যাবে এ রণযাত্র। স্বাগতম নতুন লেখক, আপনার বই সমৃদ্ধ হোক।

Share