নীড়পাতা » প্রথম পাতা » নতুন মাস্টারপ্ল্যান হচ্ছে

যুক্ত হচ্ছে সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান

নতুন মাস্টারপ্ল্যান হচ্ছে

সিডিএ’র উদ্যোগ ভূমিকম্পসহ দুর্যোগপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা…

ইফতেখারুল ইসলাম

নগরীর জন্য সিডিএ নতুন মাস্টারপ্ল্যান তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এই লক্ষ্যে একটি প্রকল্প সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের সভায় উঠে। নতুন মাস্টারপ্ল্যানে চিহ্নিত করা হবে ভূমিকম্প প্রবণ জোনসহ দুর্যোগপ্রবণ এলাকা। তৈরি করা হবে পুরো শহরের থ্রি ডি। আগের মাস্টারপ্ল্যানের চারটি অংশের সাথে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান।
জানতে চাইলে সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম পূর্বকোণকে বলেন, ১৯৯৫ সালের মাস্টারপ্ল্যানের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে ২০১৫ সালে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এবং প্রধান বাণিজ্যিক নগরী মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া থাকার কথা কল্পনাও করা যায় না। কারণ এই নগরীর কর্মকা- দিন দিন বাড়ছে। তাই পরিবর্তিত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এই শহরের সামগ্রিক উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে মাস্টারপ্ল্যান তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এখানে ডেল্টা প্ল্যান এবং ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে সরকার যেভাবে দেশকে এগিয়ে নিচ্ছে উন্নয়নের ধারাবাহিকতার সেই বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হবে। তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল মানুষের সহায়তা। নগরবাসী প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন আন্তরিকভাবে করে আসছে। সিডিএ’র প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ শাহীনুল ইসলাম খান পূর্বকোণকে বলেন, বর্তমানে যে মাস্টারপ্ল্যান তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তাতে গত মাস্টারপ্ল্যানের ভুলত্রুটিগুলি খোঁজা হবে। ওই মাস্টারপ্ল্যানটি কেন বাস্তবায়ন হয়নি তার কারণ বের করার চেষ্টা করা হবে। আগামী ২০ বছরে বন্দর নগরীর কোন কোন এলাকায় কোন খাতে উন্নয়ন হতে পারে তার সম্ভাব্যতা যাচাই করে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। পুরানো মাস্টারপ্ল্যানের রিভিউ করা হবে। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা শহরের বিষয়ে সরকারের পলিসি নির্ধারণ করা হবে। পর্যটন এবং পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে রাখা হবে। প্রকল্প পরিচালক ও সিডিএ’র নগর পরিকল্পনাবিদ আবু ঈছা আনসারী পূর্বকোণকে জানান, আগের মাস্টারপ্ল্যানে যেসব কমপোনেন্ট ছিল তার সাথে যুক্ত হচ্ছে সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান নামের একটি কমপোনেন্ট। এই মাস্টার প্ল্যানের পরে কিংবা চলাকালিন সময়ে ড্যাপের কাজ শুরু হবে। ড্যাপ দিয়ে মোট প্ল্যানিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এই কাজ নিখুঁতভাবে করার জন্য শহরের মধ্যে দু’টি ওয়ার্ড এবং শহরের বাইরে একটি গ্রোথ সেন্টার চিহ্নিত করা হবে। নতুন মাস্টারপ্ল্যানে জোনের সংখ্যা এখন বেড়ে যাচ্ছে। ৪১টি ওয়ার্ড প্রতিটি ওয়ার্ড একেকটি জোন হবে। শহরের বাইরের এলাকা আলাদাভাবে জোন করা হবে। আগের মাস্টারপ্ল্যানে মোট জোন ছিল ১২টি। এখন কাজ নিখুঁতভাবে করার জন্য জোনের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। জোন বড় হলে অনেক সময় ত্রুটি থাকার আশঙ্কা থেকে যায়। মাস্টারপ্ল্যানে আরএস, বিএস মৌজা ম্যাপগুলি জিআইএস টেকনোলজির মাধ্যমে আনা হবে। সাথে সাথে জিওরেফান্স করা হবে। জিওরেফারেন্স হলে একটা ‘বিএস’ দাগে ক্লিক করে সাথে এর বাস্তব অবস্থা কি তা দেখা যাবে। শুধুমাত্র ওই দাগে ক্লিক করলেই কাজ হয়ে যাবে। সফটওয়ারের মাধ্যমে এটা করা হবে। মোবাইলের মাধ্যমে সাধারণ মানুষও তার জমির দাগ ক্লিক করে ওই জমির বাস্তব অবস্থা দেখতে পারবেন। তবে মাস্টারপ্ল্যানের প্রথম কাজ হল সঠিকভাবে সার্ভে করা। আগের মাস্টারপ্ল্যানের সার্ভেতে কিছুটা ভুল ভ্রান্তি ছিল। দ্বিতীয় বিষয় হল মৌজাম্যাপে জিওরেফান্স ছিল না। এই দু’টি বিষয় যতটা সম্ভব নিখুঁত করা হবে। এই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সব আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। এরপর আসবে স্টাডি। স্টাডির বিষয় হল ঢাকার পরে এটিই দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। দ্বিতীয়ত এটি বন্দর নগরী। এটা শুধু বাংলাদেশের শহর নয়। ফারইস্টের সাথে যোগাযোগের অন্যতম হাব। এসব বিষয় মাথায় রেখে মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হবে। এর বাইরে চট্টগ্রামে দুর্যোগের বিষয়টি মাথায় রাখা হবে। বন্যা, জলোচ্ছাস, পাহাড়ধ্বস, ভূমিকম্প ইত্যাদি দুর্যোগ আছে। মানুষ একটা জমি কিনল। কিন্তু দেখা গেল যে, ওটা দুর্যোগপ্রবণ এলাকা। মানুষ হয়তো বন্যা, জলোচ্ছাস ইত্যাদি খালি চোখে দেখতে পারেন। কিন্তু কোন এলাকাটি ভূমিকম্পপ্রবণ তা সাধারণ মানুষ জানে না। ভূমিকম্প প্রবণ জোনটি চিহ্নিত করা হবে। ওই জোনে কোন ধরনের উন্নয়ন হবে তা নির্ধারণ করে দেয়া হবে। বন্দরভিত্তিক অর্থনীতির বিষয়টিও বিশ্লেষণ করা হবে। বন্দরকেন্দ্রিক কোন ধরনের উন্নয়ন হবে তা নিয়ে গবেষণা করার জন্য আলাদা বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেয়া হবে। বর্তমান সিডিএ চেয়ারম্যান অনেক দিন ধরে মাস্টারপ্ল্যানটি জনগণের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করছেন উল্লেখ করে এই নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, ইতিমধ্যে বিভিন্ন ওয়ার্ডে অসংখ্যা সভা করা হয়েছে। সিডিএ চেয়ারম্যান এবং সংশ্লিষ্টরা গিয়ে স্থানীয় লোকজন ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের মতামত নিয়েছেন। এটা অব্যাহত থাকবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে গিয়ে জনগণের মতামত নেয়া হবে। তিনি জানান, ৫% নমুনা নিয়ে ডোর টু ডোর সোসিওইকোনমিক সার্ভে করা হবে। ট্রান্সপোর্টেশনের ক্ষেত্রে ১০০টি জাংশন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিহ্নিত করা হবে। ওই জাংশনগুলি নিয়ে স্টাডি করা হবে। যা পরবর্তীতে কাজে লাগানো হবে। এই মাস্টারপ্ল্যানে অনেকগুলি প্রকল্পের প্রস্তাবনা থাকবে। কোন প্রকল্প কতদিনের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে তাও নির্ধারণ করে দেয়া হবে। একইসাথে প্রথম ফেইজের প্রকল্পগুলির ফিজিবিলিটি স্টাডিও করা হবে। যাতে মাস্টারপ্ল্যান তৈরির পরপর প্রকল্প তৈরি করে কাজ শুরু করতে পারে। ফিজিবিলিটি স্টাডি যুক্ত হওয়ার পর প্রকল্পের ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। মাস্টারপ্ল্যানের আয়তন বাড়ছে না। বাড়াতে গেলে অর্ডিন্যান্সের সমস্যা আছে। তখন সংসদে যেতে হবে। সময় লাগবে। বর্তমান মাস্টারপ্ল্যান তৈরির জন্য যে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে তার মেয়াদ দুই বছর। এখানে আরেকটি নতুন মাত্রা যোগ হবে। তা হল, চট্টগ্রাম শহরের থ্রি ডি মডেল করা হবে। চীনে বেইজিং শহরের থ্রি ডি মডেল করা আছে। যা একটি ছোট কক্ষে বসে পুরো শহর দেখা যায়। মাস্টারপ্ল্যানে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল এই প্রকল্পের মাধ্যমে স্ট্রং ডাটাবেইজ তৈরি করা হবে। যেকোন ধরনের ডাটা সিডিএ’তে পাওয়া যাবে। চট্টগ্রাম শহরে বর্তমানে কি কি আছে, কোথায় কোন স্থাপনা আছে, কোথায় পাহাড় আছে সব চলে আসবে। তৈরি করা হবে সয়েল প্রোফাইল। কোন এলাকার মাটি শক্ত, কোন এলাকার মাটি নরম, কোথায় বহুতল ভবন করা যাবে। কোথায় করা যাবে না। সব এখানে থাকবে। মাস্টারপ্ল্যান তৈরির পর চট্টগ্রাম শহর সংক্রান্ত ডাটার জন্য কাউকে আর এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করতে হবে না। মাস্টারপ্ল্যান সফলভাবে তৈরি করার জন্য একটি টেকনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট কমিটি করা হবে। এখানে চট্টগ্রামের সব সংস্থার প্রতিনিধি থাকবেন। টেকনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান হবেন সিডিএ চেয়ারম্যান। সদস্যরা হলেন, পৌরসভার মেয়ররা, মিনিস্ট্রি অব হাউজিং এ- পাবলিক ওয়ার্কসের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সেলের উপপ্রধান। পিডব্লিউডি চট্টগ্রাম জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক, উপ পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রাম জোনের প্রধান প্রকৌশলী, চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী, চুয়েটের আর্বান প্ল্যানিং বিভাগের প্রধান, বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী, চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি, আইইবি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের চেয়ারম্যান, আইএবি চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান, বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী, সিডিএ’র প্রধান প্রকৌশলী, সিডিএ’র প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ, এলজিইডি চট্টগ্রাম জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মনোনীত তিনজন কাউন্সিলর, প্রকল্প ব্যবস্থাপক এবং প্রকল্প পরিচালক।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি পিইসি সভায় কিছু বিষয় সংশোধনসাপেক্ষে অনুমোদন লাভ করে। এর প্রেক্ষিতে সার্বিক বিষয়ে সংশোধন করে ২০১৮ সালের ২১ মে সংশোধিত ডিপিপি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় বরাবর প্রেরণ করা হয়, যা উক্ত মন্ত্রণালয় কর্তৃক ২০১৮ সালের ১৭ জুলাই পরিকল্পনা কমিশনে প্রেরণ করা হয় এবং গত ৭ ফেব্রুয়ারি পরিকল্পনা কমিশনের সভায় প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় বেশকিছু যুক্ত করার পরামর্শ দিয়ে প্রকল্পটি সংশোধন করে পাঠানোর নির্দেশনা দেয়া হয়। প্রকল্পটি সম্পূর্ণভাবে সরকারের অর্থায়নে বাস্তবায়ন হবে।
উল্লেখ্য, নব্বইয়ের দশকে ‘প্রিপারেশন অব স্ট্রাকচার মাস্টার প্ল্যান এন্ড ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান ১৯৯৫’ নামে চট্টগ্রাম শহরের জন্য মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করা হয়। যা ১৯৯৮ সালের ৯ ডিসেম্বর গণশুনানির জন্য গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয় এবং পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালের ৯ ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক চূড়ান্ত গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয় ১৯৯৫ হতে ২০১৫ পর্যন্ত। প্রকল্প বাস্তবায়নকাল তিন ধাপে ভাগ করা হয়, স্বল্পমেয়াদী ১৯৯৫ হতে ২০০০, মাঝারিমেয়াদী ২০০০ হতে ২০০৫ এবং দীর্ঘমেয়াদী ২০০৫ হতে ২০১৫।

Share
  • 5
    Shares