নিজস্ব প্রতিবেদক

নতুন চাক্তাই ভেড়া মার্কেটের বস্তিতে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে দুই পরিবারের ছয় জনসহ অঙ্গার হয়েছে নারী-শিশুসহ ৮ জন। আগুনে পুড়ে গেছে এক কক্ষ বিশিষ্ট প্রায় দুইশ ঘর ও বেশ কয়েকটি দোকান। শনিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে এই অগ্নিকা- ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিটের ১০টি গাড়ি ভোর ৪টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণ আনলেও সম্পূর্ণ নির্বাপণ হয় রবিবার সকাল ৮টার দিকে। নিহতদের মধ্যে এক পরিবারের চার সদস্য হলেন- কলোনির মুদি দোকানি সরুজ আলীর স্ত্রী রহিমা বেগম (৪২), মেয়ে নাজমা বেগম (১৬) ও নার্গিস আক্তার (১৫) এবং ছেলে জাকির হোসেন বাবু (৮)। নিহতের গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট থানায়। আরেক পরিবারের দুই সদস্য হলেন- মো. রিপনের স্ত্রী আয়েশা বেগম (৩৭) ও তার মেয়ে রিতু (১১)। আয়েশার ভাগিনা সোহাগ (১৯)। তাদের বাড়ি ভোলা জেলার সদরে। এ ছাড়া হাসিনা বেগম (৩৫) নামের আরও এক মহিলা আগুনে পুড়ে মারা যান। হাসিনার স্বামীর নাম শামসুল আলম। তার বাড়ি কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলায়।
অগ্নিকা-ে ক্ষতিগ্রস্ত রেহেনা বেগম বলেন, মধ্যরাতে সবাই অঘোর ঘুমে ছিল। নিহত রহিমা বেগম আমাকেসহ অনেক পরিবারকে ঘর থেকে ডেকে বের করেছে। আর না হয়, আমরা আর বাঁচতাম না। আমাদের বাঁচিয়ে রহিমা নিজেই বাঁচতে পারেনি। রহিমা বেগম কেন আবার ঘরে ঢুকেছে জানতে চাইলে রেহেনা বেগম বলেন, রহিমা মুদি দোকান করতেন। দোকানের পিছনে ঘর। দোকান থেকে টাকা এবং মালামাল বের করতে যায়। তার পেছনে ছেলে-মেয়েরা দোকানে প্রবেশ করলে কেউ বের হতে পারেনি। আল্লাহর রহমতে রহিমা বেগমের মেয়ে নারগিস আক্তার (১০) বেঁচে যায়।
আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক জসিম উদ্দিন বলেন, নিহত সবার পরিচয় পাওয়া গেছে। আগুনের সূত্রপাত কীভাবে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন বলেন, আগুনের সূত্রপাতের ঘটনা বের করতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মাসুদ উল কবিরকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন লামার বাজার ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আলী আকবর, বাকলিয়া থানার ওসি প্রণব চৌধুরী, ৩৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজী নুরুল হক। এ ছাড়া আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি মৃত ব্যক্তিদের প্রতিটি পরিবারকে নগদ ২০ হাজার টাকা করে দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, ভেড়া মার্কেটের দক্ষিণ পাশে কর্ণফুলী নদী ভরাট হয়ে জেগে উঠা জমিতে কয়েক বছর আগে বস্তি গড়ে তোলেন। এদের মধ্যে রয়েছে- মো. ফরিদ, ছগির, জীবন, জনি, সত্তার, বেলাল, আব্দুল্লাহ, জসিম, মুরশেদ, সিরাজ, হাজী নুরুজ্জামান, লেদু সওদাগর ও আল আমিনের মা শাহানা বেগম। এই ১৩ জনের প্রায় চার শতাধিক ঘর রয়েছে। যেখানে অধিকাংশ ঘর এক বা দুই কক্ষের।
জানা যায়, চাক্তাই খালের পাড়ের এই বস্তিতে প্রায় দুই হাজার মানুষ বসবাস করতো। বস্তিবাসীদের মধ্যে ছিল গার্মেন্টস কর্মী, শ্রমিক, জেলে, দিনমজুর ও রিকশাচালক। তাদের অনেকে রাতে বাইরে কাজ করতেন। তখন স্ত্রী ও সন্তানদের ঘরের ভেতরে রেখে ঘরের বাইরে থেকে তালা মেরে যেতেন। নিরাপত্তাসহ নানা সামাজিক সমস্যার কারণে এটা করা হতো বলে কলোনির লোকজন জানান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, রাত তিনটার দিকে আগুন লাগে। এর ২০ মিনিটের মধ্যেই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে আসেন। কিন্তু ঘরের বাইরে থেকে তালাবদ্ধ থাকায় কয়েকটি পরিবারের লোকজন বের হতে পারেনি। ফলে আগুনে পুড়ে তারা ঘরের ভেতরেই মারা যায়। আগুন লাগার পরবর্তী একঘণ্টার মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তা নিয়ন্ত্রণে আনে। আগ্রাবাদ, লামার বাজার, চন্দনপুরা ও নন্দনকানন ইউনিট থেকে ১২টি গাড়ি এসে আগুন নেভায়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বলেন, বস্তিটি একেবারে চাক্তাই খালের পাড়ে হওয়ায় পানির উৎস পেতে সমস্যা হয়নি। ফলে দ্রুত সময়ের মধ্যে আগুন নেভানো সম্ভব হয়। অন্যথায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারতো।
বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রণব চৌধুরী বলেন, ভেড়া মার্কেট বস্তিতে চার শতাধিক ঘর ছিল। বেশির ঘরই এক থেকে দুই কক্ষের। তিনি বলেন, রাতের বেলা যেসব শ্রমিক বা রিকশাচালক বাইরে কাজ করতো, তারা নিরাপত্তার স্বার্থে ঘরের বাইরে থেকে তালা মেরে যেত। এই অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণেই এতো লোক মারা গেছে।
সরেজমিন ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ঘরগুলোর উপরে টিন আর বেড়া ছিল বাঁশের। এখানকার বেশিরভাগ ঘরে রাতে মশা তাড়ানোর জন্য এক ধরনের জুট ও পাটের তৈরি চট পুড়িয়ে ধোঁয়া তৈরি করা হতো। এসব দাহ্য পদার্থের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে বলে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের ধারণা।
রবিবার দুপুরে অগ্নিকা-ে ক্ষতিগ্রস্তদের দেখতে যান সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। এসময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপপ্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম। মেয়র চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এবং চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আপদকালীন পুনর্বাসনসহ নানামুখী সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন। আরো উপস্থিত ছিলেন, কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লব, বক্সিরহাট ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল্লাহ বাহাদুর প্রমুখ।

Share
  • 5
    Shares