কামরুল ইসলাম

দেশে দ্রুত বিকাশমান শিল্পগুলোর অন্যতম সিমেন্ট শিল্প। সম্ভাবনাময় শিল্পও। বছরে বছরে বাড়ছে সিমেন্টের চাহিদা। বহুজাতিক কোম্পানির পাশাপাশি এই শিল্পে বিনিয়োগে এগিয়ে এসেছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা। বাজারের ৮০ ভাগ বর্তমানে স্থানীয়দের দখলে।
বর্তমানে ৩২ টি কারখানা সিমেন্ট উৎপাদন করছে। চট্টগ্রাম, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে সিমেন্ট কারখানা। চট্টগ্রামে কারখানা ৯টি।
নব্বইয়ের দশকের আগে আমাদের সিমেন্টের চাহিদার ৯০ শতাংশ পূরণ হতো আমদানি করে। তখন স্থানীয় উৎপাদন বলতে ছিল সরকারি খাতে ছাতক সিমেন্ট কারখানা এবং চিটাগাং সিমেন্ট ক্লিংকার গ্রাইন্ডিং কারখানা। ৯০’র দশকের শেষদিকে নির্মাণ খাতে প্রবৃদ্ধি দেখে অনেক উদ্যোক্তা বিদেশ থেকে ক্লিংকার এনে দেশে সিমেন্ট কারখানা স্থাপন করেন। বছরে বছরে কমতে থাকে আমদানি নির্ভরতা। অপরদিকে, ছোট বড় মিলিয়ে কারখানা সংখ্যা দেড় শ’ ছাড়িয়ে যায়। বড় বড় কারখানাগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় মার খেয়ে ছোট ছোট সব কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পরও দেশের বাজারের অর্ধেকের বেশি ছিল বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর। স্থানীয় কারখানাগুলোও বিশ্বমানের সিমেন্ট তৈরি করায় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বাজার ক্রমশ কমে যায়। এখন তাদের বাজার ২০ শতাংশের মত। অর্থাৎ ৮০ শতাংশ বাজার দেশীয় কারখানাগুলোর। বড় বড় উদ্যোক্তারা কারখানা সম্প্রসারণ করেছেন, নতুন নতুন প্রযুক্তি সংযোজন করেছেন। রাজধানীর অদূরে মুন্সিগঞ্জ, চট্টগ্রাম এবং মোংলায় কোন কোন কারখানার দ্বিতীয় ইউনিট চালু করা হয়েছে। তবে, বর্তমান সময়ে সিমেন্টের চাহিদার তুলনায় এই শিল্পে বিনিয়োগ হয়েছে অধিকতর। বেপরোয়া বিনিয়োগ হয়েছে কোন কোন কারখানায়। এতে সিমেন্ট বিপণনে তীব্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন উৎপাদকরা। কোন কারখানা পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এতে উৎপাদন খরচ পড়ছে অধিক এবং প্রত্যাশিত মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে না। এই প্রেক্ষাপটে সিমেন্টের মান বজায় রাখতে দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে কারখানাগুলো। অবশ্য, ভারত নিজস্ব কাঁচামাল ব্যবহার সত্ত্বেও যে দরে সিমেন্ট সরবরাহ করছে, তার চেয়ে কম দামে বিক্রি করা হচ্ছে বাংলাদেশে। ডায়মন্ড সিমেন্ট লিমিটেডের পরিচালক লায়ন হাকিম আলী দৈনিক পূর্বকোণকে বললেন, আমাদের দেশে তৈরি সিমেন্ট বিশ্বের যে কোন কোম্পানির উৎপাদিত সিমেন্টের সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারে। ভারতের ‘ সেভেন সিস্টারস’ খ্যাত রাজ্যগুলোতে আমাদের সিমেন্ট অত্যন্ত জনপ্রিয়। আগরতলা দিয়ে সেখানে রপ্তানি হয়। ভারত ছাড়াও মিয়ানমার, নেপাল, মালদ্বীপ এবং শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের সিমেন্ট রপ্তানি করা হয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশে সিমেন্ট খাতে অধিক বিনিয়োগ হলেও তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোন কারণ নেই। কারণ, সিমেন্টের চাহিদা ক্রমবর্ধমান। প্রতিবছর এ খাতে প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ। সরকারের অনেক বৃহৎ প্রকল্প সামনে। তাতে সিমেন্টের চাহিদা আরও বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফেকচারারস এসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, কারখানাগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৪ কোটি টন। এর বিপরীতে ৩ কোটি ২০ লাখ টনের বেশি তৈরি সম্ভব হচ্ছে না বাজার না থাকায়। কোন কারখানায় পূর্ণ ক্ষমতায় চালু রাখা যাচ্ছে না। কোন কারখানা সর্বোচ্চ ৮০ ভাগ ক্ষমতায় চলছে। আবার কোন কারখানা ৬০ ভাগ উৎপাদন ক্ষমতাকে কাজে লাগাতে পারছে। চট্টগ্রাম ভিত্তিক একটি কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মতে মোট সক্ষমতার ৫৩ শতাংশকে কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে কার্যত।
ডায়মন্ড সিমেন্ট লিমিটেডের উপ মহাব্যবস্থাপক আবদুর রহিম জানান, সিমেন্টের চাহিদা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ভাল অবস্থায় চাহিদা বৃদ্ধি পায়, আবার খারাপ অবস্থায় হ্রাস পায়। ২০১০ সালে শেয়ারবাজারে ধস নামার সাথে সাথে আবাসন এবং নির্মাণ শিল্পেও ধস নামে। এতে দুরবস্থায় পড়ে সিমেন্ট শিল্প। এ অবস্থার মধ্যে কয়েক দফায় রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। অবশ্য, সরকারি খাতে বড় প্রকল্প ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, পদ্মা সেতু নির্মাণ, ফ্লাইওভার নির্মাণের মতো বড় বড় প্রকল্প গ্রহণের কারণে সিমেন্ট খাত ঘুরে দাঁড়িয়েছে পরবর্তীতে। মিরেরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল, কর্ণফুলী টানেলসহ আরও অনেক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এতে প্রতিবছর বাড়ছে সিমেন্টের চাহিদা। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা ২০৩৫ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে বলে এক সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে। আরও জানান, কারখানাগুলো এই মুহূর্তে সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে না পারলেও এই শিল্প অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষা অনুসারে সিমেন্টের মাথাপিছু ব্যবহার ৫০০ কেজি। বাংলাদেশে এখনও ১২০ কেজির বেশি নয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় বেশ নিচে। তাই বিরাট সম্ভাবনা সিমেন্ট শিল্পের। এক তথ্যে জানা যায়, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সিমেন্ট ব্যবহার হয় বেসরকারি খাতে। এর পরিমান প্রায় ৪০ শতাংশ। ৩৫ শতাংশ সিমেন্ট ব্যবহার হয় সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে। অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ ব্যবহৃত হয় আবাসন খাতে। নভেম্বর থেকে এপ্রিল সময়ে সিমেন্টের সর্বোচ্চ চাহিদা থাকে। বর্ষা মওসুমে একেবারে কমে যায়।

Share
  • 2
    Shares