নীড়পাতা » প্রথম পাতা » আজি এ বসন্তে এত ফুল ফোটে

আজি এ বসন্তে এত ফুল ফোটে

ডেইজী মউদুদ

গত কয়েকদিন ধরে ফেসবুক টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাতাগুলো ভরে উঠছিল নানা অভিজ্ঞান আর পৃথক পৃথক ব্যঞ্জনায়। কেউ বা পোশাক আসাক নিয়ে, কেউবা সাজগোছ নিয়ে, কেউ হয়তো গহনার পশরা ও খুলে বসেছেন , আবার কেউ খাবার দাবার নিয়ে মহাব্যস্ত । বিকিকিনি ও চলছে দিব্যি। ইতিমধ্যে অনেকেই একেবারে বাসন্তী সাজে সজ্জিত হয়ে নিজস্ব ওয়ালে ছবি ও পোস্ট করেন। কারণ,প্রকৃতিতে এখন বইছে দখিনা হাওয়া. দূর নির্জন থেকে কোকিলের তান ভেসে আসছে, এক কথায় প্রকৃতি আজ দখিনা দুয়ার খুলে দিয়েছে। সে দুয়ারে বইছে ফাগুনের হাওয়া।কবির কথায় ‘ ফুল ফুটুক আর না ফুটুক , আজ বসন্ত।
ঋতুপরিক্রমায় আজ বসন্তকাল শুরু। তবে বসন্তের মৃদুমন্দ সমীরণ প্রকৃতিতে চলছে গত কয়েকদিন থেকেই । নির্মল ঝিরঝির হাওয়া, কচি পাতার সবুজ সমরোহ , শিমুল পলাশ আর অশোকের লালিমাকে সাথী করে মূলত: ফাগুণের হাত ধরেই ঋতুরাজ বসন্তের আগমন। ঋতুরাজকে স্বাগত জানাতে প্রকৃতির আজ এতো বর্ণিল সাজ। সকল কুসংস্কারকে পেছনে ফেলে, বিভেদ ভুলে, নতুন কিছুর প্রত্যয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা নিয়ে প্রকৃতিতে বসন্ত আসে। কচি পাতায় আলোর নাচনের মতোই বাঙালির মনেও লাগবে দোলা। হৃদয় হবে উচাটন। পাতার আড়ালে আবডালে লুকিয়ে থাকা কোকিলের মধুর কুহু কুহু ডাক শুনে কবি মন অজান্তেই গেয়ে উঠবেঃ
‘ ও মঞ্জরী ও মঞ্জরী আমের মঞ্জরী,আজ হৃদয় তোমার উদাস হয়ে পড়ছে কি ঝরি’ অথবা ‘ ওরে ভাই , ফাগুণ লেগেছে বনে বনে/
ডালে ডালে , ফুলে ফুলে পাতায় পাতায় রে’
বসন্ত মানেই পূর্ণতা। বসন্ত মানেই নতুন প্রাণের কলরব। বসন্ত মানেই একে অপরের হাত ধরে হাঁটা। মিলনের এ ঋতু বাসন্তী রঙে সাজায় মনকে, মানুষকে করে আনমনা।
শীতের জীর্ণতা সরিয়ে ফুলে ফুলে সেজে উঠবে প্রকৃতি ও । গাছে গাছে নতুন পাতা, স্নিগ্ধ সবুজ কচি পাতার ধীর গতিতে বাতাসের সঙ্গে বয়ে চলা জানান দেয় নতুন কিছুর। শীতে খোলসে ঢুকে থাকা বন-বনানী অলৌকিক স্পর্শে জেগে উঠে। পলাশ, শিমুল গাছে লাগে আগুন রঙের খেলা। প্রকৃতিতে চলে মধুর বসন্তের সাজ সাজ রব।
কবির বাণীতে ও একই সুর ঃ
‘আজ দখিনা বাতাসে ,নাম না জানা কোন বনফুল ফুটল বনের ঘাসে’
বসন্তের এই আনন্দযজ্ঞ থেকে বাদ যায় না গ্রাম্যজীবনও। বাংলার গ্রামীণ জনপদেও আজ ঝিরিঝিরি বাতাসে ধরা দেবে বসন্ত। আমের মুকুলের সৌরভে আর পিঠাপুলির মৌতাতে গ্রামে বসন্তের আমেজ একটু বেশিই ধরা পড়ে। বসন্তকে তারা আরও নিবিড়ভাবে বরণ করে।তারা ও আনমনে গেয়ে উঠে ‘ ওরে গৃহবাসী খোল, দ্বার খোল, লাগলো যে দোল । স্থলে জলে বনতলে লাগলো যে দোল, দ্বার খোল দ্বার খোল ’। বাংলা পঞ্জিকা বর্ষের শেষ ঋতু বসন্তের প্রথম দিনকে বাঙালি পালন করে ‘পহেলা ফাল্গুন-বসন্ত উৎসব’ হিসেবে। বাঙালির নিজস্ব সার্বজনীন প্রাণের এ উৎসব এখন গোটা বাঙালির কাছে ব্যাপক সমাদৃত । বাংলায় বসন্ত উৎসব প্রাণের উৎসবে পরিণত হলেও এর শুরুর একটা ঐতিহ্যময় ইতিহাস আছে, যা অনেকের অজানা।
মোগল স¤্রাট আকবর প্রথম বাংলা নববর্ষ গণনা শুরু করেন ১৫৮৫ সালে। নতুন বছরকে কেন্দ্র করে ১৪টি উৎসবের প্রবর্তন করেন তিনি। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বসন্ত উৎসব। তখন অবশ্য ঋতুর নাম এবং উৎসবের ধরণটা এখনকার মতো ছিল না। তাই পহেলা ফাল্গুন বা বসন্ত উৎসব কেবল উৎসবে মেতে ওঠার সময় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার গৌরবময় ঐতিহ্য, বাঙালিসত্ত্বা। সে ঐতিহ্যের ইতিহাসকে ধরে রাখতে পারলেই বসন্ত উৎসবের সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রজন্ম ছড়িয়ে দিতে পারবে বাঙালি চেতনাকে।
ফাল্গ–নের আরেক পরিচয় ভাষা শহীদদের মাস অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি , ৮ই ফাল্গ–ন মাতৃভাষা ‘বাংলা’ প্রতিষ্ঠার জন্য রফিক, সালাম, জব্বার বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন। বারবার ফিরে আসে ফাল্গুন, বারবার ফিরে আসে বসন্ত আমাদের জীবনে শোষণ, বঞ্চনা আর আধিপত্য মোকাবিলার দুর্বিনীত সাহস ও অপরিমেয় শক্তি নিয়ে। তাই যেকোনো বিচারে এ এক অনন্য মাস, ঋতু নৈসর্গিক ক্যানভাসে রক্তাক্ত বর্ণমালা যেন এঁকে দেয় অনির্বচনীয় সুন্দর এক আল্পনা। বসন্তের আগমনী গানে পুরো বাংলাদেশ যেন আটপৌরের আগল ভেঙে বসন্তের আহ্বানে জেগে ওঠে। তরুণীদের পরনে শোভা পায় বাসন্তী রঙের শাড়ি, খোঁপায় বাসন্তী ফুল। গালে বসন্তের মনকাড়া আল্পনা। তরুণদের বসনেও থাকে বাসন্তী ছোঁয়া। বাদ যায় না শিশু কিংবা বয়স্করাও। সবার মন তাই গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠে ‘ বসন্ত ফুল গাঁথলো , আমার জয়ের মালা , বইলো প্রাণে দখিন হাওয়া, আগুল জ¦ালা . .., ’
আজ দিনভর চলবে তাদের বসন্তের উচ্ছ্বাস প্রকাশ। ফোন, ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলবে বসন্তের শুভেচ্ছা বিনিময়। আজ নানা আয়োজনে বসন্তকে বরণ করবে বাঙালি।গুণ গুণ করে গান করতে তরুণ তরুণীর দল ছুটবে সিআরবির শিরীষ তলায় অথবা ডিসি হিলে। তারা বসন্তের গান শুনবে, কবিতা পাঠ করবে।পাহাড়ের খাঁজ ভেঙ্গে হয়তো কোন এক শিমুল গাছে একটি কোকিল কুহু কুহু রবে ডানা ঝাপটাবে , তার ডানার ছোঁয়ায় এক থোকা শিমুলগুচ্ছ তরুণীর হাতের মুঠায় পড়বে । মনের অজান্তেই তারা গেয়ে উঠবে ‘ আহা , আজি এ বসন্তে/ এত ফুল ফুটে / এত বাঁশী বাজে/ এত পাখী গায় …… ’

Share