মোহিত উল আলম

তারপরও অনুষদভিত্তিক পরীক্ষার মাধ্যমে বাংলা এবং ইংরেজিসহ অনুষদের অধীনস্থ বিভাগুলোর ওপর সামান্য প্রশ্ন থাকতো, যার উত্তর লিখিতভাবে পরীক্ষার্থীকে দিতে হতো, এবং ফলে ভর্তি ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদেরকে কিছুটা হলেও যাচাইয়ের সুযোগ ছিল। তারপরও আমরা বিভাগের শিক্ষকেরা ক্রমাগত শিউরে উঠতে থাকি যে এমন এমন শিক্ষার্থী বিভাগে ভর্তি হবার জন্য যোগ্যতা লাভ করেছে যাদের না আছে ইংরেজি ভাষায় সাধারণ দক্ষতা, না আছে সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা। অন্যান্য বিভাগের শিক্ষক-সহকর্মীরাও তাদের নিজ নিজ বিষয়ের জন্য নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের মান সম্পর্কেও একই হতাশা ব্যক্ত করতে লাগলেন। কিন্তু তারপরও যখন ভর্তিপরীক্ষা নেওয়া ও গ্রহণ করার প্রক্রিয়ায় সংখ্যা ও সময়ের মধ্যে দ্বান্দ্বিক সংকটটি আরো ঘনীভূত হলো, তখন এক নাগাড়ে স্বায়ত্তশাসিত এবং সরকারি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনুষদ-ভিত্তিক পরীক্ষা পদ্ধতির বদলে ইউনিট সিস্টেমের প্রবর্তন হলো, এবং তখন থেকেই, আমার ধারণা, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির প্রক্রিয়াতে বড় ধরনের পতন হলো। উচ্চ-শিক্ষাব্যবস্থা কড়াই থেকে আগুনে পড়ল। পতনটি এমন যে এটাকে কোন পরিসংখ্যান দিয়ে সমর্থন করা যাবে না, কারণ ক্ষতিটা হয়ে গেছে আরো গভীরে—শিক্ষার চরিত্র গঠনে।
কেমন করে এ পতনটা হলো একটু ব্যাখ্যা করি। ইউনিট সিস্টেমে পুরো ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা হয় বহু-নির্বাচনী প্রশ্ন পদ্ধতিতে। বাংলা, ইংরেজি এবং সাধারণ জ্ঞান—এ তিন বিষয়ে সাধারণত নম্বর ভাগ করা হয়। সাধারণ জ্ঞান বিষয়টা হচ্ছে একটা আমব্রেল্লা কনসেপ্ট—এর অধীনে প্রকারান্তরে সমাজবিজ্ঞান ভিত্তিক বিষয়গুলোর ওপর জ্ঞান যাচাই করা হয়। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে অংকশাস্ত্রের ওপরও প্রশ্ন থাকে। তবে এ নিয়মগুলির বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে হেরফেরও হতে পারে। তবে ইংরেজিতে যেহেতু অধিকাংশ শিক্ষার্থী খারাপ করে সে জন্য ইংরেজিতে পাশ মার্ক অন্য দুই বিষয়ের চেয়ে কম থাকে। আবার যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে অনার্স, এম এ আছে সে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজির ওপর বিশেষ কিছু প্রশ্ন থাকে, এবং একটা পাশ মার্কও ধার্য করা থাকে যেটাতে পাশ করলে সে ইংরেজি অনার্সে ভর্তি হতে পারবে। পারবে, কিন্তু এখানেও একটা ফ্যাকড়া আছে। সেটা হলো শিক্ষার্থী শুধু ইংরেজি বিষয়ে পাশ করলে হবে না, তাকে টোট্যাল ১০০ নম্বরের মধ্যে টিকে থাকতে হবে।
অর্থাৎ, ব্যাপারটা এরকম: ধরুন, একজন শিক্ষার্থী ১০০ নম্বরের মধ্যে পেয়েছে ৫১, কিন্তু বিশেষ ইংরেজিতে সে ৩০এ পেয়েছে ২৫, এবং সাধারণ ইংরেজিতে পেয়েছে ২০এ ১৮, আর বাকি ৫০ নম্বর বাংলা ও সাধারণ জ্ঞানে পেয়েছে মাত্র ৮। কিন্তু যারা ইংরেজিতে তার মতো মার্ক পায় নি কিন্তু সব বিষয় মিলিয়ে ৭০/৭৫ পেয়েছে, তারা সিরিয়ালি টিকে যাবে কিন্তু সে টিকবে না। অথচ সে ইংরেজি অনার্স পড়ার জন্য ছিল উপযুক্ত শিক্ষার্থী। আবার একই কথা বাংলা বা সাধারণ জ্ঞানের বিষয়ে ভর্তি ইচ্ছুক শিক্ষার্থীর জন্যও প্রযোজ্য হতে পারে। কেউ হয়তো বাংলায় খুব ভালো করল, বা সাধারণ জ্ঞানে খুব ভালো করলো, কিন্তু অন্য দুই বিষয়ে ভালো করল না বলে সে ভর্তি পরীক্ষায় টিকতে পারলো না। অথচ সে হয়তো বাংলা বা সমাজবিজ্ঞানের জন্য উপযুক্ত শিক্ষার্থী ছিল। ফলে হতাশার সঙ্গে লক্ষ করা যায়, যে শিক্ষার্থীর ইংরেজি পড়ার কথা নয় সে ইংরেজিতে ঢুকে গেল, যার ভূগোল পড়ার কথা নয়, সে ভূগোলে এবং যার চারুকলা পড়ার কথা নয় সে চারুকলায় ঢুকে গেল। এবং এ ধরনের মিসফিট শিক্ষার্থীর জন্য পুরো অনার্স এবং মার্স্টাসএর লেখাপড়া, যদি সে শেষ পর্যন্ত মানিয়ে নিতে না পারে, তা হলে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনটা একরকম অপচয়িত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়। এবং এ ধরনের মিসফিট শিক্ষার্থীরা বিভাগীয় শিক্ষকদের জন্যও ডিমোটিভেশন্যাল ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে।
আরেকটি কারণে বহু-নির্বাচনী প্রশ্নভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মৌল-চরিত্রের বিপক্ষে। সেটি হচ্ছে, বহু-নির্বাচনী পরীক্ষাটা হয় মূলত শিক্ষার্থীর চিন্তা শক্তির পরীক্ষা করার জন্য নয়, হয় কিছু প্রশ্নের বিপরীতে সে খুব দ্রুত ঠিক উত্তরটি দিতে পারে কিনা। এবং না জেনে আন্দাজে সঠিক উত্তর দেবার অবকাশও এখানে থাকে। যদিও ভুল উত্তরের জন্য তার মার্ক কাটা যেতে পারে। সে যা হোক, এ ধরনের পরীক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীর প্রকৃত প্রবণতার কোন পরীক্ষা হয় না। এ বহু-নির্বাচনী পরীক্ষার ছকটা বিজ্ঞানভিত্তিক বিষয়গুলোর জন্য কিছুটা কার্যকর হলেও মানবিক এবং সমাজবিজ্ঞান কিংবা ব্যবসাবিজ্ঞানভিত্তিক বিষয়গুলোর জন্য কার্যকর নয়।
আমার বিবেচনায় ভুল শিক্ষার্থী ভুল বিভাগে ভর্তি হবার এ যে মহাযজ্ঞ চলছে এতে প্রকারান্তরে জাতীয় উচ্চশিক্ষার ক্ষতি হচ্ছে। এটা বন্ধ করে কোন না কোন ভাবে বিভাগের কাছে নিজেদের বিষয় অনুযায়ী যোগ্য প্রবণতা প্রদর্শনকারী শিক্ষার্থীকে ভর্তি করোনোর সুযোগ ও অধিকার বিভাগের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া উচিৎ। না হলে আমরা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিরাট ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনার শিকার হয়ে যাচ্ছি। এটা কি পদ্ধতিতে করা যেতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষ ইউজিসি এবং শিক্ষামন্ত্রণালয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ঠিক করে নিতে পারে।
তবে এ রিভার্স মোডে যেতে গেলে প্রধান প্রতিবন্ধকতা আসবে অর্থনৈতিক কারণে। ইউনিট সিস্টেমে আবেদন জমা পড়ার প্রক্রিয়ায় একটা বিরাট অর্থনৈতিক সাফল্য আসে, যার অর্থনৈতিক ফল ভোগ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সকলেই—উচ্চপ্রশাসন থেকে শুরু করে সকল কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সকল শিক্ষকেরা। সম্ভবত মোট আয়ের শতকরা হিসেবে একটি ধার্যকৃত অংশ সরকারের তহবিলে জমা দিতে হয়, কিংবা সরকার সেটা কেটে রাখেন বার্ষিক বাজেট অনুমোদনের বেলায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ভর্তি-পরীক্ষার মৌসুমটা হচ্ছে দেবী লক্ষ্মীর বর। দেবী সরস্বতীর এখানে কিছু করার নেই। এ জন্য ভর্তি-সংক্রান্ত সংকট হ্রাস করার জন্য ভর্তি পরীক্ষা গুচ্ছপদ্ধতিতে নেবার যে আহ্বান মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতির ভাষণে করে থাকেন, সেটি কখনো কার্যকর হয় না এই অর্থনৈতিক স্বার্থটার কারণে।
স্বায়ত্তশাসিত এবং সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেমন মোটা অর্থে শিক্ষার্থী পাওয়া সমস্যা নয়, সেখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মূল সমস্যা হচ্ছে শিক্ষার্থী পাওয়া, বা আরো ষ্পষ্ট করে বললে উপযুক্ত শিক্ষার্থী পাওয়া। দেশে সম্ভবত এখন ৪টি স্বায়ত্তশাসিত, ৪৫টি সরকারি ও প্রায় শ’খানেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে হয়তো গোটা বিশেক বিশ্ববিদ্যালয় স্বয়ংসর্ম্পূণভাবে চলছে, কিন্তু বাকিগুলো নানা কারণে ধুঁকছে। কারো জায়গা নেই, কারো বিল্ডিং নেই, কারো শিক্ষক নেই, কারো হয়তো উপাচার্য বা উচ্চ প্রশাসনের কেউ নেই, এবং কারো কারো হয়তো শিক্ষার্থী নেই। ফলে অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষার্থী ভর্তির প্রক্রিয়ায় প্রচ্ছন্ন্ভাবে নিশ্চিত কিছু আপোষের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এ আপোষটা মেনে নিলেও এটার পেছনে একটি কার্যকর দর্শন আছে কিন্তু—সেটি হচ্ছে ছাইকে স্বর্ণে পরিণত করা। এবং এটাতো সত্য যে যদি ইংরেজিতে এসএসসি এবং এইচএসসিতে ‘এ প্লাস’ পাওয়া শিক্ষার্থী ‘গরু ঘাস খায়’ ট্রান্সলেশনটা করতে না পারে, তাতে শিক্ষার্থীর মেধার নয়, শিক্ষাপদ্ধতির প্রকৃতি নিয়েই প্রশ্নটা উঠবে। সে জায়গায় রবীন্দ্রনাথের ভাষায় “যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখে তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন” (স্মৃতি থেকে লিখেছি, উদ্ধৃতি ভুলও হতে পারে।) পদ্ধতিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষা প্রদান করে থাকে বলে আমার ধারণা।
তবে একটি জঙ্গম সমাজ সবসময় বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল থাকে। যেমন গুড়ের অভাবের কারণে একসময় সমাজে চিনির প্রচলন শুরু হয়ে গেল, তেমনি স্বায়ত্তশাসিত এবং সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চ-শিক্ষার ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলন শুরু হয়। এর ফলে ছেলেমেয়েদেরকে বিদেশে পাঠানোর প্রবণতা অনেকাংশে কমে। এ জন্য দেখা গেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর খামতি নিয়ে বেশি ধরাধরি করলে নেতিবাচক প্রচারণার জন্য তাদের শিক্ষার্থী ভর্তি কমে গেলে আবার ছেলেমেয়েদেরকে বিদেশে পাঠানোর প্রবণতার শুরু হয়। সব শৃক্সক্ষলাযুক্ত তরিকারই ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দিক আছে।
বস্তুত বাংলাদেশের শিক্ষার্থী প্রজন্মের জনসংখ্যা চিন্তা করলে বাংলাদেশে আসলে ৫০০টি বিশ্ববিদ্যালয় থাকা দরকার। আজকেই (৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯) পত্রিকায় দেখলাম বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তরের উদ্বোধনের ছবি। বাংলাদেশের মতো জনবহুল কিন্তু সংকুচিত ভূমির দেশে উচ্চশিক্ষার আনুভূমিক বা সমতল সম্প্রসারণ ঠেকানো যাবে না। সেজন্য বেসরকারি খাতে উচ্চ শিক্ষাব্যবস্থাকে যেতেই হবে। এবং ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়বেই।
কাজেই একটা খাত বৃদ্ধি পাওয়া যদি অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে, সে খাতটি যাতে ভালোভাবে উপযুক্ততা লাভ করে তার দিকেও লক্ষ রাখতে হবে। এখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উচ্চতর ডিগ্রি লাভের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি কল্পে এবং সাধারণভাবে উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণের ইচ্ছাপোষণকারী শিক্ষার্থীর তৃষ্ণা মেটাতে একটি কথা প্রস্তাবনার আকারে দিতে চাই। সেটি হলো যোগ্যতার নিরিখে ক্রমান্বয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও মাস্টার্স পরবর্তী এম ফিল এবং পিএইচডি ডিগ্রি প্রদানের সক্ষমতার অনুমতি দেওয়া। বাস্তবতার নিরিখে বলছি, বর্ষীয়ান অনেক শিক্ষক স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন পদে নিয়োজিত আছেন পূর্ণকালীন সময়ে। তাঁদের দ্বারা এম ফিল, পিইচডি প্রোগ্রাম চালু করা যায়। বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ মানের পাঠাগার এবং অনলাইন সুযোগ পাকাপোক্তভাবে আছে। কাজেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে যোগ্যতা পূরণ সাপেক্ষে এম ফিল এবং পিইচডি ডিগ্রি প্রোগ্রাম খোলার অনুমোদন দেওয়া যায়। আমি নিশ্চিত এটাতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার চরিত্রও আমূল বদলে যাবে। কারণ এই অনুমতি বিরাট একটা মোটিভেশন্যাল ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে।
আরেকটা কথা, অর্থনীতিতে ‘ব্যাড মানি ড্রাইভস গুড মানি আউট অব সার্কুলেশন’ হলেও, সমাজ ক্রমশ সর্বত্র সুশৃঙ্খলিত হতে থাকলে এর উল্টোটাই ঘটবে। অর্থাৎ, ‘গুড মানি ড্রাইভস ব্যাড মানি আউট অব সার্কুলেশন’ হবে। সেদিনের অপেক্ষা বেশিদিন করতে হবে বলে মনে হয় না। সমাপ্ত

লেখক : প্রফেসর, ইংরেজি বিভাগ, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম

Share