নিজস্ব প্রতিবেদক

দুদকের গতি বেড়েছে, দুর্নীতি বিরোধী অভিযান জোরদার হয়েছে। মূলতঃ গত এক বছর যাবৎ সরকারি অফিস-আদালতে দুর্নীতি এবং পরিবেশ দূষণ, পাহাড় কাটা, নদ-নদী দখল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি, হাসপাতালে অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বহুমাত্রিক অপরাধ দমনে এক বিশেষ অভিযান চলছে। ‘এনফোর্সমেন্ট অভিযান’ নামে দুদকের এ বিশেষ অভিযান কাঁপুনি সৃষ্টি করেছে দুর্নীতিতে আক্রান্ত দেশের বিভিন্ন সেক্টরে। এ অভিযানের মূল উৎস দুদক অভিযোগ কেন্দ্র, যা হটলাইন “১০৬” নামে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। তবে এ অভিযানটির পুরো নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা যার হাতে তিনি হলেন, ম্যাজিস্ট্রেট মুনীর চৌধুরী। অতীতে মুনীর চৌধুরীর দুঃসাহসিক অভিযানে পরিবেশ, ভূমি, বন্দর, খাদ্য, ওষুধ, ওয়াসা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, জনস্বাস্থ্য ও নৌ পরিবহন সেক্টরে যেভাবে দুর্নীতির মাত্রা হ্রাস পেয়েছিল, বর্তমানে দুদকেও তার কঠোর পদক্ষেপে চলছে এখন বহুমাত্রিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান। গত এক বছরে চলমান এ সাঁড়াশি অভিযানে উদ্ধার হয়েছে প্রচুর সরকারি জমি, পাহাড়, নদ-নদী। দুদক অভিযান কেন্দ্রে (হটলাইন ১০৬) অভিযোগ আসা মাত্রই সাঁড়াশি অভিযানে নামছে দুদক টিম, মুহূর্তেই ছড়িয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন অফিসে, প্রতিষ্ঠানে, নদীতে, পাহাড়ে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, ইটভাটায় ও হাসপাতালে। ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে দুদকের হটলাইনে অভিযোগ পাওয়া মাত্র সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বান্দরবানের লামায় অভিযান চালিয়ে ৫০ একর পাহাড় কাটা বন্ধ করা হয়। জব্দ করা হয় ৩টি বুলডোজার। গত সপ্তাহে কক্সবাজারে রক্ষা করা হয় প্রায় ১০০ একর পাহাড় । গত ১৬ জানুয়ারি দুদক টিম একসঙ্গে বাংলাদেশের ১০টি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অভিযান চালিয়ে শতকরা ৬২% চিকিৎসককে অনুপস্থিত পায়। এ অভিযানের পর সরকারি হাসপাতালগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরে আসতে শুরু করছে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ১৪টি পাসপোর্ট অফিসে অভিযান চালিয়ে আটক করা হয় ৮ জন দালাল। এছাড়া সম্প্রতি ঢাকার ডিসি অফিসে আকস্মিক অভিযান চালিয়ে ৩ কোটি টাকার ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ চেকের বিপরীতে ৩০ লাখ টাকা ঘুষ আদায়ের চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়া হয়। এছাড়া নারায়নগঞ্জের রূপগঞ্জে ভূমি হুকুম দখলের একটি ঘটনায় অবৈধভাবে ভবন বানিয়ে কোটি কোটি টাকা সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও রুখে দেয় দুদক। বিএসটিআইতে দুদকের দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে আটক হয় প্রায় ৩০ মেট্রিক টন দূষিত ও নিষিদ্ধ খাদ্য। দুদকের এনফের্সমেন্ট অভিযানে বরখাস্ত হয়েছে ৩৮ জন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। দুদকের অভিযানে প্রবাসী শ্রমিকের কাছ থেকে প্রচুর ঘুষ-দুর্নীতির ঘটনাও উদঘাটন করা হয়। প্রায় অর্ধশতাধিক অভিযানে বিদেশগামীদের ক্ষেত্রে এ দুর্নীতির মাত্রাও কমে আসে। এছাড়া রাজউকের ব্যাপক দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালায় দুদক। দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিমের উপস্থিতিতে রাজউকের সহায়তায় ধ্বংস করা হয় রাজধানীতে কমপক্ষে ২ ডজনেরও বেশি অবৈধ স্থাপনা। এছাড়া সারা দেশে স্কুলের জমি দখলের বিরুদ্ধেও অভিযানে নামে দুদক টিম। অন্তত এক ডজন স্কুলের জমি ও মাঠ ভূমিদস্যুদের দখল থেকে অবমুক্ত করা হয়। অপরদিকে মেঘনা নদীতে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে উচ্ছেদ করা হয় বিপুল সংখ্যক নদী দখলদারদের। আটক করা হয় বিপুল সংখ্যক ড্রেজার। সিলেটে ও সুনামগঞ্জে অবৈধ পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধেও চালানো হয় ব্যাপক অভিযান। এছাড়া সারা দেশে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে এ যাবৎ উচ্ছেদ করা হয়েছে শতাধিক পরিবেশ দূষণকারী ইটভাটা। বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন, দুদকের এ ব্যতিক্রমী অভিযান প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি হ্রাস এবং সুশাসন ফিরিয়ে আনতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এক সময় জনপ্রিয় ম্যাজিস্ট্রেট মুনীর চৌধুরী সামাজিক, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক অপরাধের বিরুদ্ধে যে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তা’ এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে দুর্নীতি দমন অভিযান যোগ হয়ে। মানুষের মনে প্রত্যাশা, দুদক আরো শক্তিশালী অবস্থানে থেকে দেশকে দুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হবে।

Share
  • 13
    Shares