মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯০ শতাংশ হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। তাই কর্ণফুলীকে বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফ লাইন বলা হয়। তবে অবৈধ দখলদারের করাল গ্রাসে কর্ণফুলী এখন বিপর্যস্ত। করুণ অবস্থায় পড়ে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মুমূর্ষু হয়ে পড়েছে। সরকারের সদিচ্ছায় উচ্ছেদ করা হচ্ছে অবৈধ দখলদারদের। ফিরে পাচ্ছে প্রাণ, জীবন-যৌবন ও পুরোনো রূপ। বুকের উপর থেকে জগদ্দল পাথর সরিয়ে যাওয়ার পর নিঃশ্বাস ফেলছে স্রােতস্বিনী কর্ণফুলী। চট্টগ্রামবাসীর অভিমত, ফের যেন বেদখল না হয় সেজন্য সরকারকে একই উদ্যোগ নিতে হবে। নান্দনিক বিনোদনকেন্দ্র নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছে সরকার। নগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রকৌশলীও একই অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন গতকাল পূর্বকোণকে বলেন, ‘কর্ণফুলী নদী যাতে আর বেদখল হতে না পারে, সেজন্য মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হবে। মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী নদীর পাড়ে ওয়ার্কওয়ে, পার্ক নির্মাণ করে আনন্দ-বিনোদনের পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে। হাতির ঝিলের মতো নান্দনিক পার্ক নির্মাণ করা হবে।’
কর্ণফুলীকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নিদের্শনা মতে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ করছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। সেই মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ অনেকটা এগিয়ে গেছে বলে জানা যায়। মাস্টারপ্ল্যানের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘সব সংস্থার সমন্বয়ে সমন্বিতভাবে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন চূড়ান্ত করা হবে। তিনি আরও বলেন, কর্ণফুলী হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফ লাইন। অর্থনীতির গতি বাড়ানোর প্রয়োজনে জেটি নির্মাণ করা হবে।
ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদও উদ্ধার করা জায়গা পন্টুন জেটি ও বিনোদনকেন্দ্র নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে ওঠা কোনো অবৈধ স্থাপনা থাকবে না। উদ্ধার করা জায়গায় দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ভালো পরিবেশে যাতে ভালোভাবে কর্ণফুলী নদীর সৌন্দর্য দেখা যায়।’
আগ্রাবাদ সার্কেলের সহকারী কমিশনার তাহমিলুর রহমান জানান, কর্ণফুলী নদীকে তিনটি জোনে ভাগ করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রথম পর্যায়ের উচ্ছেদ কাজ শেষ করা হয়েছে। এতে বেদখল হওয়া ১০ একর জায়গা উদ্ধার করা হয়েছে। উচ্ছেদ করা হয়েছে ২৩০টি অবৈধ স্থাপনা। উচ্ছেদ করা স্থানে সিটি করপোরেশন আবর্জনা অপসারণ এবং উচ্ছেদ করা জায়গা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া কথা ছিল।
দেখা যায়, মাঝিরঘাট এলাকায় উচ্ছেদ করা জায়গা এখন ট্রাক স্ট্যান্ডে পরিণত হয়েছে। নদীতে স্থাপিত ঘাট থেকে ক্রেনের মাধ্যমে ট্রাকে মালামাল উঠানো-নামানোর কাজ চলছে। উদ্ধার করা জায়গা সংরক্ষণ না করায় এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ট্রাকের সারি দাঁড়িয়ে থাকায় ফের বেদখলের আশঙ্কা স্থানীয়দের।
কর্ণফুলী নদীসহ ঢাকার আশপাশের নদীগুলোকে ঘিরে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ করছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এনিয়ে ঢাকায় একাধিকবার বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ দ্রুত এগোতে চায় সরকার। গত নভেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের অগ্রগতির বিষয়ে তথ্য পাঠানো জন্য জেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই নির্দেশনা মেনে কর্ণফুলীর নাব্যতা ও স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ অব্যাহত রাখা, দূষণরোধ ও দখলদারিত্বের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রেরণ করেছেন জেলা প্রশাসক।
গত বছরের ৩ জুলাই চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীসহ ঢাকার চারপাশের নদীগুলো নিয়ে দূষণরোধ ও নাব্যতা বৃদ্ধির জন্য মাস্টারপ্ল্যান তৈরি সংক্রান্ত কমিটির চতুর্থ সভায় ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি খসড়া মাস্টারপ্ল্যান উস্থাপন করেছে। মাস্টারপ্ল্যানের ওপর মতামতের জন্য খসড়া কপি কমিটির সদস্যদের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, সিটি কর্পোরেশন, সিডিএ, ওয়াসাসহ সেবাধর্মী সকল সংস্থার সমন্বয়ে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের সিদ্ধান্ত হয়।
মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নে উচ্চ পর্যায়ের এ কমিটিতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার, সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, ঢাকার মেয়র, নৌপরিবহন মন্ত্রী, পানিসম্পদ মন্ত্রী, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক, ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান, বুয়েটের দুইজন অধ্যাপক, বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান কমিটির সদস্য।
চট্টগ্রাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান প্রফেসর ড. আসিফুল হক পূর্বকোণকে বলেন, ‘উদ্ধার করা জায়গায় পার্ক ও ওয়ার্কওয়ে নির্মাণ করা হলে মানুষের চলাচল বেড়ে যাবে। এতে নতুন করে আর বেদখল হওয়ার সুযোগ থাকবে না। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। না হলে সন্ধ্যা নামলে নেশাখোর ও ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যেতে পারে। এতে পুলিশের ভূমিকাও রয়েছে।
নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পর মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে উন্নয়ন কাজের উদ্যোগের অভিমত ব্যক্ত করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী এম আলী আশরাফ। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ আগেও হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকায় তা স্থায়িত্ব করা যায়নি। এবারও উচ্ছেদের পর একটি প্ল্যান করতে হবে। রিভার ফ্রন্ট (নদীর সম্মুখ বা পাড় উন্নয়ন) প্ল্যান রয়েছে। সেটি অনুসরণ করে উন্নয়ন পরিকল্পনা নিতে হবে। না হলে দীর্ঘমেয়াদি হবে না। তিনি বলেন, নদীর পানির অংশে কোনো উন্নয়ন হবে না। পাড় অংশে আয়বর্ধকসহ নানা উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে। সবকিছু হচ্ছে, আগে প্ল্যান করতে হবে, তারপর উন্নয়ন করতে হবে।
সরকারের সদিচ্ছা থাকলে কর্ণফুলী আর বেদখল হওয়ার সুযোগ নেই উল্লেখ করে প্রফেসর ড. আসিফুল হক বলেন, ‘সরকারের উঁচু মহলের সঙ্গে আঁতাত করে প্রভাবশালীরা নদীর জায়গা দখল করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি বাড়ানো হলে সেই সুযোগ আর থাকবে না।’
চুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান ড. আসিফুল হক আরও বলেন, ‘উন্নত বিশ্বের মানুষ অনেক সচেতন। নিজেরাই নদ-নদী রক্ষা করে। আর আমাদের জাতিগতভাবে সমস্যা রয়েছে। উল্টো দখল আর দূষণে বিপর্যস্ত করি।’ অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের পর নদী দূষণমুক্ত করার তাগিদ দেন তিনি। এজন্য পরিবেশ অধিদপ্তর ও সরকারি সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে উদ্যোগ নিতে হবে। যাতে শিল্প-কারখানা ও মানব বর্জ্য নদীতে ফেলা না হয়।
২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট কর্ণফুলী নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের রায় দেন হাইকোর্ট। ৯০ দিনের মধ্যে দুই হাজার ১৮৭টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের রায় দেন আদালত। ২০১০ সালে কর্ণফুলী নদীর সীমানা নির্ধারণ, দখল, ভরাট ও নদীতে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখার জন্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেছিলেন মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস এ- পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। হাইকোর্টের নির্দেশনার পর প্রায় আড়াই বছর ধরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হয়।

Share
  • 1
    Share