নীড়পাতা » প্রথম পাতা » কঠোর দুদক, আতঙ্কে দুর্নীতিবাজরা

‘ফাঁদ’ ভীতিতে সরকারি স্বায়ত্তশাসিত অফিসের সংশ্লিষ্টরা

কঠোর দুদক, আতঙ্কে দুর্নীতিবাজরা

নাজিম মুহাম্মদ

চট্টগ্রাম কাস্টমস অফিসে ধাপে ধাপে অনিয়ম আছে। দুই বছর আগে রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন করে কাস্টমস কর্মকর্তাদের সংশোধন হতে বার্তা দিয়েছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এরপরও দুদকের নীতিকথা তেমন গুরুত্ব পায়নি। দুই বছরের মাথায় ঠিকই দুদকের ‘ফাঁদে’ আটকা পড়েন কাস্টমস হাউসের রাজস্ব কর্মকর্তা (প্রশাসন) নাজিম উদ্দিন আহমেদ। গত ৬ জানুয়ারি ঘুষের ৬ লাখ টাকাসহ দুদক কর্মকর্তাদের হাতে ধরা পড়েন তিনি।
২০১৭ সালের ৩০ জানুয়ারি কাস্টমস কর্মকর্তা ও বন্দরের বিভিন্ন কর্মকর্তার সাথে বৈঠক করেন দুদক কমিশনার এ এফ এম আমিনুল ইসলাম, দুদকের মহাপরিচালক আতিকুর রহমান ও মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী। সেই সময় দুদক কর্মকর্তারা বলেছিলেন, কাস্টমস হাউসে ধাপে ধাপে অনিয়ম আছে। অনিয়মের সাথে জড়িত কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুরোধ করেছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে দুদক কমিশনার আমিনুল ইসলাম বলেছিলেন, কর্তৃপক্ষ চাইলে ধাপে ধাপে অনিয়ম দূর করতে পারে। একাধিক পত্রিকায় কাস্টমস হাউস সম্পর্কে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় ও টকশোতে ফুটেজ দেখিয়েছে-কাস্টমস হাউসের মধ্যে কীভাবে টাকা লেনদেন হয়। এটা অত্যন্ত দুঃখের বিষয়। এ জন্য নির্দেশনা দিয়ে ছেড়ে দিলে হবে না। কাস্টম হাউসে পরিদর্শনের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেছিলেন, সিএন্ডএফ এজেন্টরা কাস্টমস কর্মকর্তাদের কক্ষে ফাইল নিয়ে অবাধে চলাচল করে। এগুলো বন্ধ করতে হবে। কাস্টমস কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে দুদক কমিশনার বলেছিলেন, দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করুন। দুদকও তদন্ত করবে। এখন সতর্ক করতে এসেছি। শুধু কাস্টমস নয়। হাতেনাতে ঘুষের টাকাসহ রাজস্ব কর্মকর্তা নাজিম ধরা পড়ার পর নড়েচড়ে বসেছে কাস্টমস হাউস। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কাস্টমস কর্মকর্তা বলেন, অনৈতিক লেনদেনে সর্বোচ্চ সাবধানতা অবলম্বন করছে কাস্টমসে কর্মরত কর্মকর্তা কর্মচারীরা। সবাই দুদক আতঙ্কে রয়েছে। শুধুই কাস্টমস অফিস নয়। দুর্নীতির বলয় ভাঙতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কর্মরত সারা দেশের ২৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দিয়েছিল দুদক। গত ২৩ জানুয়ারি স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ে ওই চিঠি পাঠিয়েছিলো দুদক। চিঠিতে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন বিভিন্ন কার্যালয়ে কিছু দুর্নীতিবাজ, স্বেচ্ছাচারী, ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মস্থলে চাকরি করার সুবাদে দুর্নীতির শক্তিশালী বলয় তৈরি হয়েছে। এদের কারণে অধিদপ্তরের সুশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দুর্নীতির বলয় তৈরি করা এসব কর্মকর্তা কর্মচারী ক্ষমতার অপব্যবহার করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। দুর্নীতিবাজ এই ২৩ কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করেছে দুদক। চিঠি পাবার পর পরই গত ৩১ জানুয়ারি স্বাস্থ্য বিভাগের যুগ্মসচিব (পার-২) এ কে এম ফজলুল হক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তিন কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ২৩ কর্মকর্তার বদলির প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়-আদেশের সাতদিনের মধ্যে ২৩ কর্মকর্তা বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগ না দিলে বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অব্যাহতি পেয়েছেন বলে গণ্য হবে। এরমধ্যে চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের উচ্চমান সহকারী ফয়জুর রহমানকে সুনামগঞ্জের বিশ্বরম্ভরপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, প্রধান সহকারী মাহফুজুল হককে নেত্রকোনা সিভিল সার্জন কার্যালয় ও কম্পিউটার অপারেটর আজমল খানকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে বদলির আদেশ দেয়া হয়।
গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক ডা. মো. আবুল কাশেম জানান, ফয়জুর রহমান নামে আমাদের অফিসে কেউ কর্মরত নেই। মাহফুজ ও আজমলকে ইতিমধ্যে রিলিজ দেয়া হয়েছে। তবে বদলিকৃত স্থানে তারা যোগদান করেছেন কিনা তা আমি জানি না। স্বাস্থ্য কিংবা কাস্টমস নয়। রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি অনিয়ম ছড়িয়ে আছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাসপাতাল, পাসপোর্ট অফিস, বিদ্যুৎ, বিআরটিএ, নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), ওষুধ প্রশাসন, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন, পুলিশ, রেলওয়েসহ সরকারি সব দপ্তরে। সাম্প্রতিক সময়ে তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় দুদকের ‘ফাঁদ’ আতঙ্কে ভুগছে বিভিন্ন সরকারি অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীরা।
দুদকের মহাপরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী বলেন, দুদক দুর্নীতি নির্মূলের পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর গভর্ন্যান্স উন্নত করতে চায়। এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
স্বাস্থ্যে ১১ খাতে দুর্নীতিরোধে ২৫ দফা সুপারিশ: স্বাস্থ্যবিভাগে দুর্নীতি হচ্ছে এমন ১১টি খাত চিহ্নিত করেছে দুদক। দুর্নীতিরোধে ২৫টি সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। সুপারিশ সম্বলিত চিঠি গত ৩১ জানুয়ারি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিকের হাতে তুলে দিয়েছেন দুদকের কমিশনার (অনুসন্ধান) মোজাম্মেল হক। যেসব খাত চিহ্নিত করা হয়েছে তা হলো-স্বাস্থ্যখাতে কেনাকাটা, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন, চিকিৎসা সেবায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ব্যবহার, ওষুধ সরবরাহ ইত্যাদি।
এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে ২৫ দফা সুপারিশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
হাসপাতালগুলোতে দৃষ্টিগোচর হয় এমন স্থানে সিটিজেন চার্টার এবং ওষুধের স্টকের তালিকা প্রদর্শন করা কেনাকাটায় অনিয়ম ও দুর্নীতিরোধে বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা, জনবল না থাকলে যন্ত্রপাতি না কেনা, কেনাকাটার ক্ষেত্রে ইজিপিতে টেন্ডার আহ্বান করা, বিশেষজ্ঞ সংস্থার প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে যন্ত্রপাতি কেনা, সরকার নির্ধারিত ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা মূল্যতালিকা জনসমক্ষে প্রদর্শন করা, মেডিকেল যন্ত্রপাতির হালনাগাদ তথ্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা, ইলেক্ট্রনিক স্টক রেজিস্টারের সঙ্গে ডিসপ্লেযুক্ত করা, ই-রেজিস্টার চালু করা ,দালালচক্র প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি রাখা, অনুমোদনহীন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধে সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে নজরদারি কমিটি গঠন করা, নকল ওষুধ ও কারখানার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া,
চিকিৎসকদের পদায়ন ও বদলির জন্য সুনির্দিষ্ট বদলি নীতিমালা তৈরি করা, হাসপাতালের রাজস্ব আদায় কার্যক্রমকে অটোমেশনের আওতায় আনা, প্রাইভেট প্র্যাকটিসের জন্য নীতিমালা তৈরি করা, ব্যবস্থাপত্রে ওষুধের না লিখে জেনেরিক নাম লেখা বাধ্যতামুলক করা, ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে উপঢৌকন না নেয়া, নাগরিকদের স্বাস্থ্যবীমা চালু করা, প্রশাসনিক সুবিধার্থে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ভেঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তর নামে দুটি অধিদপ্তর করা, পদোন্নতির জন্য সরকারি চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে পিএসসি এবং বেসরকারি চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে মহাপরিচালক (স্বাস্থ্য) এবং পিএসসির প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে সুপারিশ দেওয়া, ইন্টার্নশিপ এক বছর থেকে বাড়িয়ে দুই বছর করা এবং বর্ধিত এক বছর উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে থাকা বাধ্যতামূলক করা। সব হাসপাতালে জরুরি হটলাইন, পরামর্শ ও অভিযোগকেন্দ্র এবং যোগাযোগের সার্বক্ষণিক ব্যবস্থা রাখা, প্রতি তিনমাস অন্তর নৈতিকতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখাসহ ২৫টি সুপারিশ করা হয়েছে।

Share
  • 1
    Share