নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » দুর্ঘটনা : সড়কে-মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল

দুর্ঘটনা : সড়কে-মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল

নাগরিক দাবির প্রেক্ষিতে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় সরকারের নানা পদক্ষেপের পরও সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, দেশে জ্যামিতিক হারেই বাড়ছে সড়কদুর্ঘটনা. ঈাল্লা দিয়ে বাড়ছে হতাহতের সংখ্যাও। পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে তথ্য-পরিসংখ্যান প্রকাশ করতে গিয়ে এক সংবাদসম্মেলনে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের সভাপতি চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন জানিয়েছেন, শুধু গত বছরই সড়কদুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে চার হাজার ৪৩৯ জন। আহত হয়েছে সাত হাজার ৪২৫ জন। এই এক বছরে দুর্ঘটনা ঘটেছে তিন হাজার ১০৩টি। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত বছর সড়কদুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল পাঁচ হাজার ৫১৪টি। আর এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে সাত হাজার ২২১ জন। আহতদের সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৯৮০। সড়কদুর্ঘটনায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে ৪২ শতাংশ ঘটেছে গাড়ি চাপায়, ২৪ শতাংশ দুটি যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষে, ৭ শতাংশ গাড়ি উল্টে এবং ৪ শতাংশ গাড়ি খাদে পড়ে যাওয়ায়। বলার অপেক্ষা রাখে না সড়কদুর্ঘটনা নিয়ে এসব তথ্য-পরিসংখ্যান রীতিমতো উদ্বেগকর।
উল্লেখ্য, সড়কদুর্ঘটনা ও হতাহতের এই পরিসংখ্যানের চেয়ে বাস্তব চিত্র আরো ভয়াবহ। কারণ এসব তথ্য-পরিসংখ্যান হচ্ছে পত্রিকানির্ভর। সড়কদুর্ঘটনা নিয়ে যারা কাজ করেন তারা বলছেন, সংবাদসম্মেলনে উপস্থাপিত সংখ্যার চাইতেও অনেক বেশি দুর্ঘটনা এবং অনেক বেশি সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। ছোট-বড় অনেক দুর্ঘটনার এবং হতাহতদের খবরই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না। সব বিবেচনায় নিলে স্বীকার না করে উপায় নেই যে, দেশে সড়কদুর্ঘটনার পাশাপাশি নিহত এবং আহতদের সংখ্যা লাফিয়ে বেড়ে চলেছে। এমন অবস্থা অবশ্যই চলতে দেয়া যায় না। মনে রাখা দরকার প্রতিটি প্রাণই অমূল্য। আর যারা আহত হয়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারায়, কর্মক্ষমতা হারিয়ে পরিবারের বোঝায় পরিণত হয়, তাদের জীবনে অন্ধকার নেমে আসে। বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্ট বলছে, বিশ্বে সড়কদুর্ঘটনার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। বাংলাদেশে সড়কদুর্ঘটনায় এক দশকে যত মানুষ মারা যায়, বড় বড় যুদ্ধেও এত মানুষ মারা যায়নি। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সড়কে প্রতি বছর বাংলাদেশে ২১ হাজার প্রাণহানি ঘটছে। গত এক দশকে সড়কদুর্ঘটনায় বাংলাদেশে লক্ষাধিক মানুষ মারা গেছে। ড্রাইভারদের গাফিলতির কারণে ও অদক্ষতায় সংঘটিত দুর্ঘটনায় নিঃস্ব হয়ে পথে বসে অনেক পরিবার।
স্বেচ্ছাচারিতা ও বেপরোয়া গতিই যে সড়কদুর্ঘটনার প্রধান কারণ তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। নিরাপদ সড়ক চাই-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ঘুষবাণিজ্যসহ পুলিশের বিভিন্ন অপরাধও দুর্ঘটনা ও মৃত্যুসহ ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ী। বিভিন্ন অনুসন্ধানী রিপোর্টও তাই বলছে। কিন্তু কেনো বেপরোয়া চালকদের রাশ টানা যাচ্ছে না, তা বোধগম্য নয়। হতাহতের এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পরিবার যেমন চরম ক্ষতির শিকার হচ্ছে, তেমনি ক্ষতির শিকার হচ্ছে রাষ্ট্র। প্রসঙ্গত, গত কয়েক দশকে সড়কনেটওয়ার্ক দেশের মহানগরী থেকে আনাচে-কানাচে বিস্তৃৃত হয়েছে। বেড়েছে যানবাহনের সংখ্যা এবং নাগরিক চলাচল। কিন্তু সেই অনুপাতে মনোযোগ দেয়া হয়নি সড়কপথের নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রতি। সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় সরকার ও নাগরিকসমাজ মনোযোগ দিলেও বলিষ্ঠ পদক্ষেপের অবাবে জনকাক্সিক্ষত ফল আসছে না। সরকারের উচিত হবে এ বিষয়ে আরো আন্তরিক পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়া।
দুর্ঘটনা ও মৃত্যু কমিয়ে আনার উদ্দেশ্যে যাত্রীকল্যাণ সমিতি কয়েকটি সুপারিশ পেশ করেছে। সুপারিশের আকারে উপস্থাপিত প্রস্তাগুলোর মধ্যে রয়েছে সড়কে ট্রাফিকের নিদেশনা মেনে চলা বাধ্যতামূলক করা, যেখানে-সেখানে গাড়ি রাখা নিষিদ্ধ করা, নির্দিষ্ট স্থান বা স্টপেজ ছাড়া যাত্রীদের ওঠানো-নামানো নিষিদ্ধ করা, ওভারটেকিং এবং বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া। এসবের বাইরে ফুটওভার ব্রিজ ও আন্ডারপাস দিয়ে যাতায়াত করার ব্যাপারে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার কথাও রয়েছে সুপারিশমালায়। সরকারের উচিত হবে সেসব সুপারিশ জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া।
আমরা মনে করি, সব মিলিয়ে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হলে সড়ক-মহাসড়কেই শুধু নয়, রেল ও জলপথেও দুর্ঘটনা কমে আসবে। আর এই ব্যবস্থা নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদী সামগ্রিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে- যার মধ্যে বাস-ট্রাক ও ট্রেন তো বটেই, লঞ্চ ও স্টিমারসহ সব ধরনের নৌযানকেও অন্তর্ভুক্ত রাখতে হবে। বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে সড়কদুর্ঘটনা রোধে জোরালো প্রতিশ্রতি দিয়েছে। তা আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে ২০২০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে দুর্ঘটনা অন্তত ৫০ ভাগে নামিয়ে আনা সম্ভব। আমরা আশা করতে চাই, সরকার সড়কদুর্ঘটনা রোধে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার পরিচয় দিয়ে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপই গ্রহণ করবে।

Share