নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » উচ্চ-শিক্ষার সংকটের আয়তন এবং চেহারা

মোহিত উল আলম

উচ্চ-শিক্ষার সংকটের আয়তন এবং চেহারা

প্রাত:ভ্রমণের সময় নিত্য দেখি এলাকার মসজিদের সামনে ভ্যানগাড়িতে করে সব্জীওয়ালারা সব্জী বিক্রি করছে। একদিন দেখলাম একটিতে চালকের আসনে বসে আছে ৮/১০ বছরের এক বালক। পেছনে তার গাড়ি সব্জীতে ভরা। কিন্তু বালকটি গাল হা করে ঘুমোচ্ছে। বুঝলাম তার বাবা হয়তো আশেপাশে কোথাও আছে, ছেলেকে রেখে গেছে চৌকিদারিতে। আবার ভাবলাম, তাওতো না হতে পারে, হয়তো সেই বিক্রেতা। মানুষের মনের চিন্তা এগোয় একটি দেখার অনুবর্তী দেখাগুলোর ক্রমানুসারে। তখন মনে পড়ল, এর একটু আগে একটি কিশোরবয়সী স্কুল ছাত্রকে দেখেছিলাম স্কুলে যাচ্ছে ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে—শেক্সপিয়ারের ভাষায়, শম্বুকগতিতে, নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে। এর সাথে যোগ হলো আরো কতিপয় স্কুল শিশুর মা বা বাবার সঙ্গে হেঁটে এলাকাস্থ স্কুলে যাওয়ার ছবি। কোন কোন শিশুর নিজের পিঠের ওপর ব্যাগের ভারি বস্তা, আবার কোন কোন শিশুর ব্যাগ তার বাবা বা মা বহন করছে। একই সূত্রে আমার নাতি-নাতনিকে তাদের মায়ের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সময় দেখাশোনা করার জন্য নিযুক্ত কাজের কিশোরী ‘বুয়া’র (আমার নাতি-নাতনিরা ডাকে ‘আপু’) কথা মনে পড়ল।
ওপরের ছবিগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছে দেশে অনেক শিশুই দারিদ্রের জন্য স্কুলে যেতে পারছে না। অনেক শিশু স্কুলের লেখাপড়াকে পছন্দ করছে না, এবং অনেক শিশুর মনস্তত্ত্বে স্কুলে গমনের সময় ব্যাগের ভারি এবং বড় হওয়াটাই শিক্ষার আসল উপকরণ হিসেবে ঢুকে গেছে। শিশুর মন সবসময় বড় কলাটা, বড় পিঠাটা চায়, সেই একই কারণে ব্যাগ বড় হওয়াটাই তাদের পছন্দ। তাদের মেরুদন্ডের ক্ষতির কথাতো তারা আর জানবে না।
তবে আমার আজকের লেখাটা শিশু-কিশোর শিক্ষা নিয়ে নয়, আমি লিখতে চাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কিছু অধ্যয়নিক বিষয় নিয়ে । বস্তুত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থী ভর্তি সংক্রান্ত সংকট নিয়ে। এ ছবিটা আরো বিভ্রান্তিজনক। আমি যেহেতু পেশাগতভাবে ইংরেজির শিক্ষক, কাজেই শিক্ষার্থীর ইংরেজির মানকে সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থার ওপর প্রতিফলন হিসেবে দেখাই আমার জন্য প্রামাণিকভাবে যৌক্তিক হবে, যদিও এটি অবশ্যই খন্ডিত অভিমত হবে। তবে একথাটাও স্বীকার করতে হবে সাধারণত প্রথাগতভাবে আমাদের সমাজে ইংরেজি জানা বা না-জানা নিয়ে সাধারণ শিক্ষার মান যাচাই করার রেওয়াজ আছে। যদিও এটি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি নয়।
উচ্চ-মাধ্যমিক পাশ করে আসা শিক্ষার্থীদের আমরা ভর্তি করাই। ভর্তি পরীক্ষার সময় লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগের অক্ষমতা দেখে আমরা ফাঁপড়ে পড়ি। শিক্ষার্থীর মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিকে ইংরজির নম্বর মার্ক শীটে দেখাচ্ছে ‘এ প্লাস’, কিন্তু সে ‘গরু ঘাস খায়’ বাক্যটার ইংরেজি লিখতে পারছে না। যদি একজন দু’জনের ক্ষেত্রে এটা হতোকথা ছিল না, কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষার্থীর বেলায় একই ব্যর্থতা দেখে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হই, স্কুল-কলেজগুলোতে আমরা ঠিকমতো লেখাপড়া করাচ্ছি না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হবার আগে যখন ডিগ্রি পরীক্ষা ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হতো তখন একটা কথা প্রায় প্রমাণিত ছিল যে ডিগ্রি পরীক্ষায় পাশ করা যতোটা না কঠিন ছিল ঠিক সেরকম সহজ ছিল যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে (তখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হয়নি।) যে কোন বিষয়ে ভর্তি হয়ে অনার্স, মাস্টার্স করে বের হয়ে আসা। ডিগ্রি সিলেবাস দু’বছরের থাকলেও, এটার পরীক্ষা পদ্ধতি ছিল পাবলিক পরীক্ষার আদতে। এখনো তাই। অন্যদিকে অর্নাস, এম এ ছিল বিভাগের অর্ন্তগত শিক্ষাব্যবস্থাধীন। এখনো তাই। এ কথাটা তুলে আনলাম এ জন্য যে যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের (এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাও ধরে বলছি।) অধীনস্ত কোন বিভাগে অনার্স, মাস্টার্স করার জন্য ভর্তি হওয়ার অর্থ হলো শিক্ষার্থী নিশ্চিত ভালো বা খারাপ একটা সার্টিফিকেট নিয়ে বের হবেই। শিক্ষার্থী নিজে থেকে ড্রপ আউট না হলে শেষ পর্যন্ত সে রি-টেক টি-টেক দিয়ে একদিন বের হবেই। বিশ্ববিদ্যালগুলোর সমস্যাটা এখানে বুঝতে হবে, তারা শিক্ষার্থী ভর্তি করাচ্ছে তাদেরকেই যারা মাধ্যমিক এবং উচ্চ-মাধ্যমিক পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার যোগ্যতা কাগজে-কলমে অর্জন করেছে।
‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার যোগ্যতা কাগজে-কলমে অর্জন করেছে’-এ কথাটা আবার সরলার্থে বলা যাবে না। এখানে স্বায়ত্তশাসিত এবং সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এক ধরনের সমস্যা আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আরেক ধরনের সমস্যা বিরাজ করছে।
স্বায়ত্তশাসিত এবং সরকারি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যাটা হচ্ছে এত বিপুল পরিমাণে শিক্ষার্থী ¯œাতক সম্মানে ভর্তি হবার জন্য আবেদন করে যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইউনিট ভিত্তিক পরীক্ষা নেওয়া ছাড়া উপায় থাকেনা, এবং প্রশ্নপত্র হয় বহু-নির্বাচনীবা মাল্টিপল চয়েস অনুযায়ী। শিক্ষার্থীর জনসংখ্যাধিক্যের কারণে এর বিকল্পও থাকে না। ইউনিটভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা এখন সব ধরনের স্বায়ত্বশাসিত এবং সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু থাকলেও, কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে, আমার ধারণা, ইউনিটভিত্তিক পরীক্ষা অনুষদভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষারই নামান্তর। দু’টোর মধ্যে সামান্য পার্থক্য আছে। অনুষদভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার অর্থ হচ্ছে অনুষদের অর্ন্তগত সকল বিভাগের ভর্তি পরীক্ষা ঐ অনুষদ দ্বারা পরিচালিত হবে। আর ইউনিটভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষায় ইউনিটের অধীনে বিভিন্ন অনুষদ থেকে ভেঙ্গে বিভাগ অর্ন্তভুক্ত করা যেতে পারে। যেমন ধরুন, কোন বিশ্ববিদ্যালয় ঠিক করল যে কলা অনুষদের নাম হবে ‘ক’ ইউনিট, বিজ্ঞান অনুষদ ‘খ’ ইউনিট, বাণিজ্য অনুষদ ‘গ’ ইউনিট, সমাজবিজ্ঞান ‘ঘ’ এবং এর বাইরে তারা একটা ‘ঙ’ নামে অতিরিক্ত ইউনিট খুলতে পারে যেখানে ‘চারুকলা’, ‘নাট্যকলা’, ‘সংগীত’ ইত্যাদি সৃজনশীল বিভাগগুলো অর্ন্তভুক্ত হতে পারে। এ ছাড়াও অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা ইউনিট থাকে যেটার অধীনে শিক্ষার্থী তার অনুষদ বদলানোর জন্য পরীক্ষা দিতে পারে। এই ইউনিটের অধীনে একজন বিজ্ঞানের ছাত্র কলা অনুষদের অধীনে বা বাণিজ্য অনুষদের অধীনে কোন বিভাগে ভর্তি হবার সুযোগ নিতে পারে। বা উল্টোটাও হতে পারে—কলার শিক্ষার্থী বিজ্ঞানে বা বাণিজ্যে যেতে পারে। এই ইউনিটটি ট্রানজিটের মতো কাজ করে।
আগেই বলেছি, ইউনিটভিত্তিক পরীক্ষাগুলি হয় বহু-নির্বাচনী বা মাল্টিপল চয়েসের ভিত্তিতে। কিন্তু আমার বিবেচনায় এ ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি মৌলিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার চারিত্রের বিরোধী। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত উচ্চ শিক্ষার বিস্তারের কাজে নিয়োজিত। কিন্তু এটার কার্যকর ভিত্তি হলো উন্নত মানের শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি করা ও দেশ ও সমাজের প্রয়োজনে দক্ষ, সৎ, ভিশনারি ও দেশপ্রেমিক জনগোষ্ঠী তৈরি করা। এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু যে কোন শিক্ষার্থীর অভীষ্ট লক্ষ্য হচ্ছে সে যে বিষয়ে পড়তে চায়, সে বিষয়ে ভর্তি হতে পারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্ত বিভাগগুলোরও লক্ষ্য হচ্ছে তাদের যার যার বিভাগে এমন শিক্ষার্থী ভর্তি হোক যাদের স্বকীয় প্রবণতা ঐ বিষয়গুলো পড়বার জন্য অস্তিত্বমান। কিন্তু অনুষদভিত্তিক কিংবা ইউনিট সিস্টেম প্রবর্তিত হবার পর থেকে বিভাগগুলোর আর নিজেদের বিষয়ানুযায়ী প্রবণতাসম্পন্ন শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর সুযোগ বা স্বাধীনতা থাকে না। এটা বিভাগস্থ শিক্ষকেরা হাড়ে হাড়ে টের পান যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিকসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য আবেদন করার প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিভাগ থেকে নির্বাচনী পরীক্ষা পরিচালনার অধিকার প্রত্যাহার করে অনুষদের ওপর দায়িত্ব দেয়। এটা ছাড়া হয়তো উপায়ও ছিল না।
এটা সম্ভবত আমি নব্বই দশকের শুরুর দিকের কথা বলছি। অনুষদভিত্তিক পরীক্ষা পরিচালনার আগে আগে দুই কি তিন বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চেষ্টা করেছিলো বিভাগের অধীনেই নির্বাচনী পরীক্ষা চালু রাখা। তখন সমস্যাটা তৈরি হলো এ জন্য যে যাতে শিক্ষার্থীরা একাধিক বিভাগে ভর্তি হবার সুযোগ নিতে পারে সে জন্য আলাদা আলাদা দিনে বিভাগগুলোর অধীনে পরীক্ষা নেওয়া শুরু হলো। যেমন, তখন বাংলা এবং ইংরেজির পরীক্ষা, কিংবা পদার্থ বিজ্ঞান এবং রসায়ন বিজ্ঞানের পরীক্ষা একই সময়ে হতো না, পারস্পরিক সমানুগতার জন্য। ফলে পরীক্ষা নেওয়া, ফলাফল বের করা ইত্যাদি প্রশাসনিক জটিলতায় দেখা গেল যে এক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেড় থেকে দু’মাস শুধুমাত্র ভর্তি পরীক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক ক্লাস ও পরীক্ষাসহ বিভিন্ন নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম চালানো গেল না। ফলে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হলো যে বিভাগগুলোর বদলে সংশ্লিষ্ট অনুষদই পরীক্ষা নেবে। তখন অনুষদভিত্তিক পরীক্ষা নেওয়া শুরু হলো। অর্থাৎ বিভাগ কর্তৃক পরীক্ষা নেওয়ার অধিকার প্রত্যাহার করে অনুষদের ওপর পরীক্ষা নেওয়ার দায়িত্ব বর্তায়। তখন থেকেই আসলে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ-শিক্ষার মৌলিক চরিত্রের বিপরীতে হাঁটা শুরু হলো। কারণ আগে যেমন বিভাগুলোর—বিস্তর সময় ক্ষেপণ হলেও বিষয়ভিত্তিক প্রবণতা অনুযায়ী ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা নিয়ে তারপর নির্বাচিতদের মৌখিক পরীক্ষায় ডেকে বিষয়ভিত্তিক প্রশ্ন করে যাচাই-বাছাই করে উপযুক্ত শিক্ষার্থী নির্বাচনের সুযোগ ছিল, সেটি আর রইলো না। চলবে

লেখক : প্রফেসর, ইংরেজি বিভাগ, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম

Share