ডা. মোহাম্মদ ওমর ফারুক

স্কটিশ পার্লামেন্ট পরিদর্শন শেষে আমরা ছুটে যাই এডিনবার্গ ক্যাসেল দুর্গ দেখতে। এটি স্কটল্যান্ডের একটি জাতীয় ঐতিহ্য, যার গুরুত্ব ১৯ শতকের প্রথম দিক থেকে ক্রমবর্ধমানভাবে স্বীকৃত হয়ে আসছে। স্কটল্যান্ড রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ হিসাবে ১৪তম শতাব্দিতে স্কটিশ স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকে ১৭৪৫ সালে জ্যাকবাইটের উত্থানে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনায় এডিনবার্গ ক্যাসেল জড়িত ছিল। মধ্যযুগীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আর্টিলারী বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে দুর্গটির অধিকাংশ ধ্বংস করা হয়েছিল।
১২তম শতাব্দির প্রথম দিক থেকে সেন্ট মার্গারেট চ্যাপেলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দশর্নীয় স্থান হল এডিনবার্গের প্রাচীনতম ভবন, রয়েল প্রাসাদ। দুর্গটি স্কটল্যান্ডের অনার্স নামে পরিচিত। ব্রিটিশ সেনারা এখনো দুর্গ রক্ষায় নিয়োজিত আছেন, যদিও তাদের উপস্থিতি মূলতঃ আনুষ্ঠানিক এবং প্রশাসনিক। কিছু দুর্গ পর্যটক আকর্ষণ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। স্কটল্যান্ডের তত্ত্বাবধানে দুর্গটি সবচেয়ে পরিদর্শনকৃত পর্যটক আকর্ষণ। ২০১৭ সালে ২ মিলিয়ন এরও বেশি দর্শনার্থী দুর্গটি পরিদর্শন করেন এবং এডিনবার্গের স্থায়ী বসতিদের মধ্যে ৭০% হলেন অবসরপ্রাপ্ত। বার্ষিক এডিনবার্গ ফেস্টিবলের সময় দূর্গটি এডিনবার্গ এবং স্কটল্যান্ডের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত প্রতীক হয়ে উঠেছে। এডিনবার্গ গঘঝ ঈড়ষষবপঃরড়হ শপিংমলে কেনাকেটার জন্য পর্যটক সবাই হুড়মুড় খেয়ে পড়ে।
সান্ধ্য খাবারের আয়োজন ইন্ডিয়ান গ্রীলে। ২৮ এপ্রিল ইএনটি সার্জন ডা. জামাল সহ চড়ঁহফ ডড়ৎষফ -এ যাই শপিং এর উদ্দেশ্যে। গ্লাসগো শহরে আজ আমাদের শেষ দিন- তড়িঘড়ি ব্যাগ গোছানোতে সবাই ব্যস্ত। সকাল সাড়ে ১১ টায় নির্ধারিত গাড়িতে আমরা সবাই চেপে বসলাম। বোটানিকেল গার্ডেন বা উদ্ভিদ উদ্যান-এর দিকে আমাদের যাত্রা। যথাসময়ে পৌঁছলাম গ্ল্যাসগো বোটানিকেল গার্ডেন-এ। ধীরলয়ে আমরা সবাই ঢুকে পড়লাম ভেতরে। অদ্ভুত এক নয়নাভিরাম দৃশ্য, সবুজে সবুজে যেন ছেয়ে গেছে সারা উদ্যান- রকমারী ফুলের বাহার সর্বত্র।
মহান রব্বুল আলামিনের কি অর্পূব সৃষ্টি-যেন সু-শোভিত চাদরের উপর পুষ্পিত সৌরভের আচ্ছাদন। যতই দেখি যেন চোখ জুড়িয়ে যায়। বিমূর্ত প্রতীকের মতন থেমে যাই এই ¯িœগ্ধ বেলায়। ঘন সবুজ পত্র-পল্লবে পরিবেষ্ঠিত বাগানটি আমাদের পর্যটকদলকে দিয়েছে এক দুরন্ত আনন্দের সমৃদ্ধ উপাখ্যান। এরই মাঝে ছবির মহড়া চলে প্রতিক্ষণ। পরিপাটি করে সাজানো বাগানে চিৎপটাং হয়ে শুয়ে থাকাটা বেশ মজাদার, রোমাঞ্চকর আর এরই স্বাদ নিতে লাগলেন পর্যটক বন্ধুরা। ওখান থেকে আমরা দেখতে যাই টহরাবৎংরঃু ড়ভ এষধংমড়।ি
এটি একটি পাবলিক গবেষণাগার বিশ্ববিদ্যালয়। ১৪৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশ্বে ৪র্থ প্রাচীনতম এবং স্কটল্যান্ডের চারটি প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অন্যতম। আইন, ঔষধ, সিভিল-সার্ভিস, শিক্ষা, বিজ্ঞান এবং প্রকৌশল ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশাল ভূমিকা পালন করে। ২০১৭-২০১৮ সেশনের অর্থবছরে এটির বার্ষিক আয় ছিল ৬২৬.৫ মিলিয়ন পাউন্ড। বিশ্ববিদ্যালয়টি শহরের হাই স্ট্রিটে অবস্থিত। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন পৃথিবী জোড়া খ্যাতির শীর্ষে থাকা ব্যক্তিত্বগণ যেমন: জেমস উইল্সন, দার্শনিক ফান্সিস, প্রকৌশলি জেম্স ওয়াট, দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদ এডাম স্মীথ, পদার্থ বিজ্ঞানী লর্ড কেবিন, ৭ নোবেল বিজয়ী এবং ৩ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী।
যুক্তরাজ্যের প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এটি একটি প্রতিষ্ঠান যা কয়েকটি বিভাগে ¯œাতক উত্তর মাস্টার ডিগ্রি প্রদান করে থাকে। ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগো পরিদর্শন শেষে আমাদের বাহন ছুটে চলল গ্লাসগো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অভিমুখে। বোর্ডিং, ইমিগ্রেশন শেষে আমাদের অপেক্ষা ৩০ নং গেইটের সামনে। ঊসরৎধঃবং অরৎধিুং যোগে নান্দনিক এক শহর সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাণিজ্যিক নগরী দুবাই এর উদ্দেশ্যে। টাইগ্রীস নদীর উপর দিয়ে ছুটে চলে ঊসরৎধঃবং। ২৯ এপ্রিল সকাল ৭.৩৮ মিনিটে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করল বিশালাকায় ঊসরৎধঃবং।
আমাদের টিম লিডার ডা. দেলোয়ার মামুন-এর ভিসা না হওয়াতে সবাই হতাশ হয়ে পড়লাম কিছুক্ষণের জন্য। অবশেষে ওনাকে ট্রানজিট ভিসা করতে হয়েছে। উনি আসার পর আমরা ইমিগ্রেশনে দাঁড়ালে অফিসিয়াল পাসপোর্ট হোল্ডাদের ফিরিয়ে দেয়া হয়। কারণ হিসাবে যেটা আমরা বুঝতে পেরেছি আমাদের ভিসাকপিতে লেখা ছিল অর্ডিনারী পাসপোর্ট। তাতেই ঘটে বিপত্তি। অগত্যা আমাদেরকেও ট্রানজিট ভিসা করতে হল এবং তাতেই আমরা সবাই ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করি।
দুবাই শহরের কেন্দ্রস্থল আল্-মুতিনা স্ট্রীটে অবস্থিত তিন তারকা হোটেল মার্কোপোল-এ গাইড আমাদেরকে নিয়ে গেলেন। দুবাই শহরে যে তিন দিনের সংক্ষিপ্ত সফর তার অস্থায়ী বাসস্থান এখানেই। সবাই ক্ষুধায় ভীষণ কাতর-পাশ্ববর্তী পাকিস্তানি হোটেলে আমরা সবাই অতি ক্ষুধার তীব্রতা নিবারণ করি নিমিষেই। আমিরাতের মুদ্রা ৩০ দেরহাম দিয়ে এতিসালাত কোম্পানীর একটি সিমকার্ড নিয়ে ফেলি ঝটপট। মার্কোপোলের ১২৬ নম্বর রুমে আমি আর ডা. জামাল উঠি। দুপুরে ভাতিজা হাতেম ও ভাগিনা জসিম এলো আমাদের হোটেলের রুমে। ভাগিনা জসিম এ’ শহরের প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী। ৮০-র দশকে তাঁর এখানে আসা। কাঁচা তরিতরকারি ও বিভিন্ন প্রজাতির মাছের ব্যবসা করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। বাংলাদেশ সহ অনেক আরব দেশ ও এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকেও তিনি শাকসবজি ও মাছ আমদানি করেন।
এখানে রয়েছে বাংলাদেশীদের বিশাল বাজার। শহরের উপকন্ঠে অবস্থিত আবির ফ্রূটস মার্কেট এরই স্বাক্ষর বহন করে। হাজার হাজার বাংলা ভাষাভাষী শ্রমিক এই মার্কেটে দিন রাত পরিশ্রম করেন। দৈন্যদশাময় সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরে আনার দুর্নিবার স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন বাংলার অনেক যুবক ও মধ্যবয়স্ক মানুষ। বুকভরা আশা নিয়ে অনেকে এসেছেন পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর দৃপ্ত প্রত্যয় নিয়ে। অনেকেই ব্যবসায়ে প্রভূত উন্নতি সাধন করেছেন আবার অনেকের জীবনে নেমে এসেছে চরম হতাশা আর বঞ্চনা। আমরা দেখেছি, আবির ফ্রুটস মার্কেটে অনেক বাংলাদেশী সবজি ও বিভিন্ন রকমারি ফলমূল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানী করে প্রচুর অর্থ সম্পদের মালিক হয়েছেন। এমন কি সিআইপি (বাণিজ্য ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি) খেতাবটুকুও ঘরে আনতে মোটেও ভুল করেননি।

লেখক: সভাপতি, রাউজান ক্লাব, জুনিয়র কনসালটেন্ট (ইএনটি), জেনারেল হাসপাতাল, রাঙ্গামাটি ফৎড়সধৎভধৎড়ড়শ@মসধরষ.পড়স

Share