যুক্ত রাষ্ট্রে ধর্ষণের এক মামলায় মিঃ ডারহামকে ২০ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়। অভিযোগ ছিল, এ মামলায় জুরীরা যথেষ্ট মনোযোগ দেননি। ঘটনাস্থলে আসামী ছিল, এমন প্রমাণ নেই। আদালতে ১৯ জন সাক্ষী শপথ নিয়ে বলেছিলেন, মি. ডারহাম একটি ক্রীড়া অনুষ্ঠানে তাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু বিচারকরা এসব সাক্ষীকে ‘ভুয়া ও সাজানো’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। পরে ডিএনএ পরীক্ষার পর আসামী খালাস পায়। ফৌজদারী বিচার ব্যবস্থায় এমন অজ¯্র গলদ আছে। ১৯৯১ সনের ১৮ ফেব্রুয়ারী চট্টগ্রামের জেলা ও দায়রা জজ লাপাত্তা হয়ে যাওয়া ৩ আসামীর বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যুর জন্য সিএমএম’কে নির্র্র্র্দেশ দিয়েছিলেন। ১১ বছর পর এ নির্দেশ মামলার নথিপত্রসহ পৌঁছে সিএমএম’এর কাছে। একই ভবনের উপরে আর নীচে ছিল এ দুটি আদালত। এ এক অদ্ভুত রহস্য! এসব বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের সিনিয়র বিচারপতি খড়ৎফ ডড়ড়ষভ বিচার ব্যবস্থার সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন “বিলম্ব” এবং “ব্যয়” কে, যে’কারণে তিনি বিকল্প উপায়ে মামলা নিষ্পত্তির উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এ সমাজে অপরাধের অন্তর্নিহিত স্বরূপ কতটা আমরা উদ্ঘাটন করতে পারি? আমাদের চিন্তা ও মনন মানবীয় আবেগ ও প্রবৃত্তি দ্বারা প্রভাবিত। রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার নিয়ত পরিবর্তনশীলতার ধারায় যুক্ত হয় নতুন সমাজ ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, শাসন ব্যবস্থা এবং বিচার ব্যবস্থা। তারই আলোকে ঈৎরসরহধষ ঔঁংঃরপব ঝুংঃবস-এ মোবাইল কোর্ট ব্যাপকভাবে সমাদৃত বিচার কার্যক্রম। যেখানে অপরাধ, সেখানেই বিচার। মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে যাওয়া বিচার, অর্থাৎ চোখের সামনে ঘটে যাওয়া অপরাধের প্রকাশ্য বিচার। এটিই মোবাইল কোর্টের রূপরেখা। ১৯৫০ সালে মাদ্রাজ হাইকোর্ট যার প্রবক্তা। ঞৎরধষ ধঃ ঃযব ঢ়ষধপব ড়ভ ড়পপঁৎৎবহপব, না দেখা অপরাধ এবং বাস্তবে দেখা অপরাধ, এ দু’য়ের মাঝে রয়েছে বিশাল তফাত। বাস্তবে যা’ দেখা হয়নি, তার বিচারে প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য প্রমাণ।
বাস্তবতা হলো, বিচার আদালত বিচার দিতে ইচ্ছুক, কিন্তু আদালতে বাদী বা সাক্ষী নেই, তারিখ পড়ছে বারবার, সমন বা ওয়ারেন্ট দিয়েও সাক্ষী আনা যাচ্ছে না, আবার আদালতে এসে ঘটনার সময়কার স্মৃতি ভুলে দুর্বল সাক্ষ্য দেয়া হচ্ছে, এমনকি প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীরাও মুখ খুলছেনা। এছাড়া আছে অজ্ঞাতনামা আসামী, তদন্ত কর্মকর্তাদের গাফিলতি ও ত্রুটি, অভিযোগনামায় সত্য গোপনের চেষ্টা, পারিপার্শ্বিক প্রমাণ মুছে ফেলা। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ২০১০ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়ের করা এক মামলায় এখনো চার্জশীট উপস্থাপন হয়নি। একটি মামলায় ৫৩ বার তারিখ পড়েছে, অথচ আদালতে প্রসিকিউশন অনুপস্থিত। বছর গড়িয়ে যায়, অপরাধীও অদৃশ্য বালিয়াড়িতে হারিয়ে যায়। বারমুডা ট্রায়াংগেলের রহস্যময় ট্র্যাপের মত এভাবে হারিয়ে গেছে বহু সাক্ষ্য প্রমাণ, ফলে বিচার অনিষ্পন্ন রয়ে যায়। বিচারের পথটি এভাবে ক্যাক্টাসের মত কণ্টকময় হয়ে আছে। এরপর আছে সমাজের দুষ্টক্ষত, মিথ্যা মামলা দায়েরের প্রবণতা। মিথ্যা মামলার ফাঁদে ফেলে অজ¯্র অর্থ ও সময়ের অপচয় সম্পর্কে তদানীন্তন মাননীয় প্রধান বিচারপতি এম রুহুল আমীন দুঃখের সঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন, “সত্য গোপন করে এবং জাল কাগজ দিয়ে যে কেউ তার অনুকূলে আদালতের রায় নিতে পারে।”
ব্রিটিশ পূর্ব উপমহাদেশের মুসলিম ফৌজদারী বিচার ব্যবস্থায় দেশের কোথাও ডাকাতি, দস্যুতা বা খুনের মত গুরুতর অপরাধ ঘটলে তাৎক্ষণিক জেলা কাজী সার্কিট অধিবেশন বসিয়ে অকুস্থলে সাক্ষ্য প্রমাণ নিয়ে বিচার করতেন। আমাদের ফৌজদারী কার্যবিধির ৩৫২ ধারা আদালতকে তাঁর অধিক্ষেত্রের যেকোন স্থানে বসে বিচার করার এখতিয়ার দিয়েছে। বিচার উপেক্ষা বা বিলম্বিত বিচারের সংস্কৃতি সৃষ্টি করে অপরাধের ক্রমবৃদ্ধি। এসব প্রেক্ষাপটে সরকারি সম্পদ, জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশকেন্দ্রিক অপরাধ দমনে মোবাইল কোর্ট অনন্য শক্তি। মোবাইল কোর্টের হাতে প্রকাশ্যে অপরাধীর দৃশ্যমান শাস্তির ইতিবাচক প্রভাব পড়ে আইনের শাসনের সূচকে। মোবাইল কোর্টের সেতু বেয়ে বিএসটিআই, পিডিবি, বিআরটিএ, ওয়াসা, ডিপিডিসি, রাজউক, বন্দর, তিতাস গ্যাস, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বহু প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বাস্তবতায় দেশের উচ্চ আদালত খাদ্য ও সড়ক নিরাপত্তা, পরিবেশ ও নদ-নদী রক্ষাসহ জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট জনগুরুত্বপূর্ণ বহু বিষয়ে নির্বাহী বিভাগকে যে নির্দেশনা দিচ্ছেন, তার সফল বাস্তবায়নে নিরন্তর কাজ করছে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা।
আইন শৃংখলা বাহিনী, প্রসিকিউশন, সংস্থার প্রতিনিধি বা বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে যৌক্তিক প্রমাণসহ গভীর অনুসন্ধানী চোখ ও মন নিয়ে মোবাইল কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেটকে বিচার কাজ করতে হয়। অপরাধকে সামনে রেখেই অপরাধীর স্বীকারোক্তি, তাই অপরাধ ঘটিয়ে মোবাইল কোর্টের সামনে মিথ্যা বলার বা মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেবার সুযোগ নেই। নির্দোষ ব্যক্তি ভুলক্রমে মোবাইল কোর্টে দ-িত হলেও উচ্চ আদালত থেকে অবধারিতভাবে মুক্তি পাবে। এমনকি ন্যায়বিচারের প্রশ্নে ডিএম/এডিএম আদালত থেকেও জামিনে মুক্তি পাবে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের আদেশের বিরুদ্ধে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আপীল, এরপর বিজ্ঞ দায়রা জজের কাছে রিভিশন, সর্বশেষে আছে সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে রিট দায়ের। সুতরাং মোবাইল কোর্টের আদেশ বা রায় অপরিবর্তনীয় নয়।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা খাদ্যে ভেজাল, বাল্য বিয়ে, ইভটিজিং, ভূমি দস্যুতা, পরিবেশ দূষণ, হাসপাতালে অপচিকিৎসা, সিন্ডিকেট ব্যবসা, অবৈধ ভবন নির্মাণ, মানহীন পণ্য উৎপাদন, গ্যাস ও বিদ্যুত চুরি, অবৈধ ইটভাটা, নদ-নদী দখল, মাদক সেবন ও ব্যবসা, নিষিদ্ধ ইলিশ শিকারসহ অগনিত দিগন্তে ছড়িয়ে থাকা অপরাধের বিরুদ্ধে নিরন্তর অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। কত নিষ্ঠায়, ত্যাগে ও শ্রমে মানুষের কষ্ট লাঘব এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষতি রোধ করছে মোবাইল কোর্ট, তার হিসাব অপরিমেয়। মোবাইল কোর্টে এমন কিছু প্রভাবশালী অপরাধী ধরা পড়ে, যারা তাৎক্ষণিক জামিন চাইলেও পায়না। কারাগারে পাঠালেই চূর্ণ হয় এসব অপরাধীর স্পর্ধা। জেল-জরিমানা যত স্বল্পই হোক মোবাইল কোর্টের অভিঘাত পড়ে নাগরিক জীবনে, প্রতিষ্ঠানে, সমাজে, অর্থনীতিতে। তবে শুধু দ- প্রদানে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। মোবাইল কোর্টের বৈপ্লবিক ভূমিকায় অপরাধ থেকে সমাজকে পরিত্রাণ দেয়া সম্ভব, যে কোন প্রতিষ্ঠানকে সুশাসনের উচ্চ মাত্রিকতায় প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। চট্টগ্রাম বন্দর, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিদ্যুত সেক্টরে মোবাইল কোর্টের সাফল্য তার উজ্জ্বল প্রমাণ।
নাগরিকদের মধ্যে শাণিত হচ্ছে আইন মান্যতার চেতনা, সেটিও মোবাইল কোর্টের সার্থকতা। প্রতিটি মোবাইল কোর্টই আইনের ক্যাম্পেইন। এতে ভোক্তা অধিকার, নাগরিক অধিকার সম্পর্কে মানুষ সচেতন হচ্ছে। খাদ্যে ভেজালের অনেক অজানা তথ্য জাতির সামনে উপস্থাপন করেছে মোবাইল কোর্ট। তাই পরিবেশ দূষণ ও খাদ্যে ভেজালের বেদনা ও যন্ত্রনায় দগ্ধ মানুষ মোবাইল কোর্টের নিরবচ্ছিন্ন অভিযান চায়, এর ছন্দপতন হলে জ্যামিতিক হারে বাড়ে অপরাধ।
ফৌজদারী অপরাধে ১১০টি আইনের আওতায় বিচার করছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। তাঁদের সঠিক পথ নির্দেশনা ও অনুপ্রেরণা দিলে অসাধারণ সাফল্য আসবে। অকাট্যভাবে প্রমাণিত অপরাধে জড়িতদের মোবাইল কোর্টে দ-ের পর বিচারের পরবর্তী ধাপে দ-াজ্ঞা বহাল না থাকলে মোবাইল কোর্টের চেতনা অর্থহীন হয়ে যাবে। তবে জরিমানার চাইতে কারাদন্ডের প্রভাব বেশি। কারাদ-ের যে গ্লানি, তা’ ট্রান্সমিট হয়ে সামাজিকভাবে শিক্ষনীয় হচ্ছে। সুতরাং বড় মাত্রার অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলে কারাদ- প্রদান অবশ্যই যুক্তিযুক্ত। দন্ড প্রদানের ক্ষমতা বা এখতিয়ার নেই, তফসিল বহির্ভূত এমন অপরাধ কিন্তু বিচারিক আদালতে যাচ্ছে। শুধু ২০১৩ থেকে ২০১৮ ইং সনের পরিসংখ্যান মতে, মোবাইল কোর্টে ৬ লাখ ৩৫ হাজার মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, জরিমানা আদায় হয়েছে ২০৯ কোটি টাকা। এ বিপুল সংখ্যক অপরাধের মামলা বিচার বিভাগের উপর এক বাড়তি চাপ হতে পারতো। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রতি পরামর্শ থাকলো, মাসে কতটি মোবাইল কোর্ট হলো, কত জরিমানা হলো, তার সংখ্যাগত মূল্যায়ন নয়। মানদ-ের ভিত্তি হতে হবে ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচারিক মান।
গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটল রাষ্ট্র পরিচালনার সফলতার জন্য ত্রিমাত্রিক ক্ষমতা বিভাজনের কথা বলেছিলেন: চঁনষরপ অংংবসনষু, গধমরংঃৎধঃব এবং ঔঁফরপরধৎু. এখানে গধমরংঃৎধঃব নির্বাহী শাসনের প্রতীক। ফরাসী দার্শনিক মন্টেস্কু তাঁর বিখ্যাত ঞযব ঝঢ়রৎরঃ ড়ভ খধংি বইয়ে ঞযবড়ৎু ড়ভ ঝবঢ়ধৎধঃরড়হ ড়ভ ঢ়ড়বিৎং- সম্পর্কে বলেছেন: ঊধপয ঢ়ড়বিৎ ংযড়ঁষফ নব পযবপশবফ ্ নধষধহপবফ. যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রীম কোর্ট ফেডারেল ঔঁফরপরধষ ঝুংঃবস-এ সর্বোচ্চ আপিল আদালত, যা’ যুক্তরাষ্ট্রের ঈড়হংঃরঃঁঃরড়হ, ঋবফবৎধষ খবমরংষধঃরড়হ এবং ঞৎবধঃরবং এর ব্যাখ্যা প্রদান করে। এখানে বলা হয়েছে, “খবমরংষধঃরাব গধশবং ঃযব খধ,ি ঊীবপঁঃরাব ঊহভড়ৎপবং ঃযব খধি ্ ঔঁফরপরধষ ওহঃবৎঢ়ৎবঃং ঃযব খধ.ি” কিন্তু কোন বিচার কাজেই কোন বিভাগ সর্বশক্তিমান নয়। প্রত্যেকের ক্ষমতা ও এখতিয়ার সংবিধান ও আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্যে যার যার অবস্থানে সবাই বিচারক, কিন্তু প্রত্যেকে একে অন্যের পরিপূরক। তবে, সবার উর্ধ্বে আছেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মহান আল্লাহ্। এ দৃঢ় বিশ্বাস বিচারিক জ্ঞান ও প্রজ্ঞার শক্তিশালী আধার।
প্রধান বিচারপতির পদ অলংকৃত করার পর মরহুম বিচারপতি মইনুর রেজা চৌধুরী বলেছিলেন, “সততা ও যোগ্যতার অভাব ঘটলে কোন নীতি-ব্যবস্থাই শেষ পর্যন্ত সুফল আনতে পারেনা, তা’ যতই উত্তম হোক্ না কেন।” সুতরাং ন্যায়বিচার এবং সততা ও যোগ্যতা এক সূত্রে গাঁথা। আসুন, মোবাইল কোর্টের অভিযাত্রায় আইন শৃংখলা বাহিনী, সিভিল সোসাইটি, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকরা একাত্ম হই। আইন না মানার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট শক্তিশালী অস্ত্র। এর যথার্থ প্রয়োগে সম্ভব সমাজের অবক্ষয় দূর করা। ২০১৯ সালকে স্বাগত জানিয়ে নবীন ম্যাজিস্ট্রেটদের আহ্বান জানাবো, “জলপ্রপাতের মতো তীব্র স্রােতে এগিয়ে সমাজের পচন ধুয়ে ফেলো, শুভ্র ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলো।”

লেখক : মহাপরিচালক, দুর্নীতি দমন কমিশন, বসধরষ: সসঁহরৎপ@মসধরষ.পড়স ফোন: ০১৮১৭-২১১৪৪৬

Share