ইমাম হোসাইন রাজু

কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নগরীর ষোলশহর এলাকায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)-র হিমাগারটি কেন নির্মাণ করা হয়েছে, সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে কৃষিজাত পণ্য উৎপাদকদের কাছে।
পচনশীল পণ্য সংরক্ষণের জন্য প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নগরীর ষোলশহরে নির্মিত হিমাগারটি দীর্ঘ দশ বছরে একদিনের জন্যও ব্যবহার হয়নি। হিমাগারটি নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি স্থাপনসহ সকলক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়েছে প্রক্রিয়াগত গোঁজামিল। দুর্নীতি ও বিভিন্ন অনিয়মের কারণে হিমাগারটি আলোর মুখই দেখতে পেল না। হিমাগারে স্থাপিত মূল্যবান যন্ত্রপাতির হদিস নেই বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাছাড়া হিমাগারে পুরোনো যন্ত্রপাতি স্থাপন, জোড়াতালি দিয়ে ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন অসঙ্গতির কারণে চালু হয়নি সম্ভাবনাময় হিমাগারটি। এজন্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগ ওঠেছে। এতে সরকারের কয়েক কোটি টাকা নয়-ছয় হয়ে গেছে।
খবর নিয়ে জানা যায়, সবজি সংরক্ষণের জন্য ২০০৬ সালে বিএডিসি কর্তৃপক্ষ একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। সেই প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও যশোরে ২০০৬ সালে হিমাগার নির্মাণের টেন্ডার আহ্বান করা হয়। টেন্ডারে ক্রয়াদেশের ২১০ দিনের মধ্যে বিএডিসি কর্তৃপক্ষকে হিমাগারগুলো বুঝিয়ে দেয়ার জন্য ঠিকাদারদের বাধ্যবাধকতার কথা জানানো হয়। সকল শর্ত পূরণের মাধ্যমে ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার হিমাগার বিএডিসি কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেয় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার।
বুঝে নেয়ার পর হিমাগারগুলো ব্যবহার না করে ফেলে রাখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এতে করে বহু মূল্যবান যন্ত্রাংশ অলস পড়ে থাকায় বলতে গেলে এখন পরিত্যক্ত হতে চলেছে। চালু না হওয়ার কারণে সবজি চাষীদের বহু প্রতীক্ষিত হিমাগারের স্বপ্ন মুখ থুবড়ে পড়ে। হিমাগারের মাধ্যমে নিজেদের ফসল সংরক্ষণ করে তা উপযুক্ত মূল্যে বিক্রির যে স্বপ্ন দেখেছিলেন চাষীরা, সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে গেলো তাদের। এতদঞ্চলে একটি হিমাগার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘদিনের দাবি শেষ পর্যন্ত অপূর্ণ থাকল।
অভিযোগ রয়েছে, ২০০৬ সালে তদবিরের জোরে হিমাগারগুলো নির্মাণের কার্যাদেশ পায় সেই সময়ের প্রভাবশালী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স সিএমএস ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল। অভিজ্ঞতা ছাড়াই হিমাগারটির কাজ শুরু করার পর কাজের মান নিয়ে একাধিক প্রশ্নও ওঠে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। কিন্তু সেই সময়কার কর্মকর্তারা কোন অভিযোগ আমলেই নেননি। কাজের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের টাকার বিনিময়ে মুখ বন্ধ রাখেন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান।
সূত্র জানায়, কাজের মান ও বিভিন্ন অসঙ্গতির বিষয়ে জানাজানি হলে তৎকালীন বিএডিসির মহা-ব্যবস্থাপক (ক্রয়) মো. খোরশেদ আলম ২০১২ সালের ১৯ নভেম্বর চট্টগ্রাম, কুমিল্লা হিমাগার পরিদর্শনের জন্য একটি টিম গঠন করেন। চট্টগ্রামের ষোলশহর নির্মিত হিমাগারটি পরিদর্শনের জন্য বিএডিসি চট্টগ্রামের সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সওকা) প্রবেশ চন্দ্র বড়–য়াকে আহ্বায়ক, তৎকালীন পটিয়া বিএডিসির যুগ্ম পরিচালক (উদ্যান) মো. ইদ্রিস মিয়া ও ঢাকা বিএডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী (উদ্যান) মো. আব্দুর রাজ্জাকে সদস্য এবং ঢাকা বিএডিসির সহকারী প্রধান প্রকৌশলী (পরিদর্শন) এ বি এম মাহমুদ হাসান খানকে সদস্য সচিব করে একটি কমিটি করা হয়। এই কমিটিকে ২০১২ সালের পাঁচ নভেম্বরের মধ্যে সামগ্রিক কাজ সমাধান শেষে বিস্তারিত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। আদেশ পাওয়ার পর কমিটি একই বছরের ২ ডিসেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত হিমাগারটি পরিদর্শন করে একটি প্রতিবেদন দেন। ওই পরিদর্শন কমিটিতে প্রধান কার্যালয় থেকে করা চারজন ছাড়াও স্থানীয় বিএডিসির ছয় কর্মকর্তা ও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সত্বাধিকারী সেলিমুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শন করা কমিটি ওই প্রতিবেদনে হিমাগারের সিভিল ও মেশিনারিজ কাজের একধিক ত্রুটি থাকার কথা উল্লেখ করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, হিমাগারের ভিতরের বিভিন্ন দেয়ালে প্রচুর ফাটল রয়েছে, করিডোর এবং ভিতরের বিভিন্ন স্থানে ফ্লোর দেবে গেছে। মোজাইক কাজের ফিনিশিং ওয়ার্ক সঠিক ভাবে হয়নি। এমন ১৩টি ত্রুটির কথা উল্লেখ করা হয় এই প্রতিবেদনে। পাশাপাশি পরিদর্শনে মেশিনারিজের ৩০টি কাজের ত্রুটি উল্লেখ করেন তাঁরা।
এদিকে, ২০১২ সালের ১৯ নভেম্বর তৎকালীন বিএডিসির মহাব্যবস্থাপক (ক্রয়) মো. খোরশেদ আলম পরিদর্শনের জন্য যে আদেশ কপি দিয়েছেন তাতে কমিটির উপস্থিতিতে ঠিকাদারের নিকট হতে যে অবস্থায় হিমাগারটি আছে সে অবস্থায় বুঝে নিয়ে অসম্পন্ন কাজ উদ্যান উন্নয়ন বিভাগের মাধ্যমে নিজস্ব অর্থে সম্পন্ন করার নির্দেশ দেয়া হয়। তবে কর্তৃপক্ষের নির্দেশ থাকলেও সেই অনুপাতে কিছু টাকা ব্যয় করে বিএডিসির উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কিছু কাজ করলেও শেষ করেনি। হিমাগারটির অবকাঠামো নির্মাণ কাজ কোন রকম সম্পন্ন হলেও মেশিনারিজ স্থাপনে মহাঘাপলা ছিল।
বিএডিসির এই প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একটি তথ্যে দেখা যায়, ২০১৩ সালে হিমাগারটির কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য চায় বিএডিসির প্রধান শাখা। সেই প্রেক্ষিতে একই বছরের ১৪ আগস্ট তৎকালীন পটিয়া বিএডিসির যুগ্ম পরিচালক (উদ্যান) শিমুল বিকাশ দাশ একটি প্রতিবেদন দেন। প্রতিবেদনে হিমাগার নির্মাণ ও মেশিনারিজ বাবদ এক কোটি ৯১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৮৩ টাকার একটি হিসাব দেখানো হয়।
সূত্র মতে, নির্মাণ ও মেশিনারিজ স্থাপন নিয়ে বিএডিসি ও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একধিকবার চিঠি চালাচালিও হয়। কিন্তু বিএডিসির কিছু কর্মকর্তা বিষয়টিকে কোন গুরুত্ব দেননি। প্রশ্রয় পেয়ে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান জোড়াতালি দিয়ে কাজ দ্রুত শেষ করে।
জানতে চাইলে বিএডিসির চট্টগ্রামের যুগ্ম পরিচালক (উদ্যান) মো. ইদ্রিস মিয়া বলেন, হিমাগারটি অনেক পুরনো। আমার কাছে এ বিষয়ে তেমন কোন তথ্য নেই। তাই এই মুহূর্তে কিছু বলতে পারছি না। হিমাগারটি কেন চালু হয়নি জানতে চাইলে তিনি বলেন, যতটুকু জানি মেশিনারিজ স্থাপনের ত্রুটির কারণে হিমাগারটি চালু হয়নি। বিষয়টি ঢাকা থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। তারাই এর সম্পর্কে বলতে পারবে। আমরা এই বিষয়ে কিছুই জানি না। তিনি বলেন, আমরা একবার হিমাগারটি চালু করেছিলাম, তখন মেশিনের যন্ত্রপাতিগুলো নষ্ট থাকায় চালু করা যায়নি। আর কাজগুলো প্রকৌশল বিভাগ দেখেছে তারাই বলতে পারবে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই হিমাগার নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্ট কোন কর্মকর্তাই বর্তমানে বিএডিসিতে কর্মরত নেই। দুই ব্যক্তি ছাড়া বাকি সকলেই বহু আগেই অবসরে গেছেন। হিমাগার নির্মাণ ব্যয় থেকে শুরু করে সবকিছু হয়েছে আলোচ্য অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের হাতে। হিমাগার পরিদর্শনের জন্য যে কমিটি গঠন করা হয়েছে তারাও অবসরে রয়েছেন।
২০১২ সালে হিমাগার পরিদর্শনের তদন্ত কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সেই প্রতিবেদনে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেসার্স সিএমএস ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল সত্বাধিকারী ক্যাপ্টেন মো. সেলিমুজ্জামানেরও স্বাক্ষর রয়েছে। তিনি স^াক্ষরের উপরে লিখেছেন ‘উপরোক্ত মন্তব্যের সাথে একমত না হওয়া সত্বেও হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষর করিলাম’। এ বিষয়ে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য নেয়ার চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি।
জানা যায়, বিএডিসির চট্টগ্রাম সার্কেল দপ্তরের ওয়ার্ক এসিস্ট্যান্ট নজরুল ইসলামের হাতেই এই প্রকল্পের সকল হিসাব-নিকাশ ছিল। তার হাত ধরেই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে টাকা পয়সা দেয়া হয়। পুরো বিষয়টি তিনি নিজেই দেখাশোনা করেছেন।
এদিকে, প্রতিবেদনে স্বাক্ষরকারী তৎকালীন বিএডিসি চট্টগ্রাম জোনের সহকারী প্রকৌশলী (নির্মাণ) মো. নুরনবীর কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। পরে প্রতিবেদনের কপি উপস্থাপন করলে তিনি বলেন, ঢাকা থেকে আসা কমিটির লোকেরা আমাদের ডেকে নেন, তাই তাদের সাথে পরিদর্শনে যাই। আমরা যা দেখেছি তাই লিখেছি। তবে এই বিষয়ে পুরোপুরি বলতে পারবে ওয়ার্ক এসিস্ট্যান্ট নজরুল ইসলাম।’
ওয়ার্ক এসিস্ট্যান্ট নজরুল ইসলাম বর্তমানে অবসরে রয়েছেন। এ বিষয়ে মুঠোফোনে একাধিক যোগাযোগ করা হলে তিনিও প্রথমে কিছুই জানেন না বলে এড়িয়ে যান। পরে কাগজ দেখে জানাতে সময় নেন প্রতিবেদকের কাছ থেকে। এরপর একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে কল পেয়ে তিনি ফোন বন্ধ করে রাখেন।
প্রসঙ্গতঃ ৫০ মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতার চট্টগ্রামের হিমাগারটির আয়তন ৬৪৮৭ দশমিক ৭৫ বর্গফুট। এখানে রয়েছে ৪টি চেম্বার। যেসব চেম্বারে টাটকা সবজি সংরক্ষণ করার কথা ছিল। একই সাথে ফ্রোজেন ভেজিটেবল, ফ্রোজেন ফিশ ও ফুডস সংরক্ষণেরও ব্যবস্থা ছিল এই হিমাগারটিতে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হিমাগারটির বাইরে থেকে তালাবন্ধ করা। ভবনের চারপাশে আগাছা জমে আছে। ভবনের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে। কিছুদিন আগে ভবনটিতে কিছু কর্মচারী বসবাস করতো বলে জানিয়েছেন সেখানে থাকা কয়েকজন কর্মচারী। তবে ভবনে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় সেখান থেকে তাদের বের করে দেয় কর্তৃপক্ষ।
এ প্রকল্পের প্রকৌশল বিভাগের চরম গাফেলতি ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের গাফেলতির কারণেই কাজের অগ্রগতি ও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ত্রুটি ছিল বলে অভিযোগে প্রকাশ।
এ বিষয়ে বিএডিসি চট্টগ্রাম অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী আশারফুজ্জামানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি এখানে যোগ দিয়েছি মাত্র দুই বছর আগে। এই বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই। আর যাদের কথা বলছেন তারা সবাই অবসরে রয়েছেন।

Share
  • 57
    Shares