নীড়পাতা » শেষের পাতা » শরিকরা বিএনপির ওপর চাপাচ্ছে বঞ্চনার দায়ভার

ঘুরে দাঁড়ানোর চিন্তায় বিএনপি

শরিকরা বিএনপির ওপর চাপাচ্ছে বঞ্চনার দায়ভার

শিবুকান্তি দাশ , ঢাকা অফিস

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে সিদ্ধান্ত গ্রহণে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে প্রধান্য দেওয়া এবং নানা বঞ্চনার দায়ভার বিএনপির ওপরে চাপাচ্ছে শরিকরা। পুরোনো ভুলভ্রান্তি শুধরে জোটকে নিয়ে নতুন আঙ্গিকে রাজনৈতিক কর্মসূচি দেওয়ার পক্ষে অধিকাংশ শরিক দল। তবে অধিকাংশই এই সরকারের অধীনে আর কোনও নির্বাচনে যাওয়ার বিপক্ষে। শরিকরা মনে করছেন দ্রতই জোটের বৈঠক ডেকে করণীয় নির্ধারন করা দরকার। জোটের শরিক দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব বিষয় জানা গেছে। এদিকে বিএনপিতেও দলের শীর্ষনেতারা দলকে নতুন করে সাজিয়ে ঘুরে দাঁড়ানের কথা বলা শুরু করেছে।
গত শুক্রবার (১৮ জানুয়ারি) রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৮৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সুপ্রিম কোর্ট বার মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, ‘নির্বাচনে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে নাই। সেজন্য আজকে আমাদের যেটা প্রয়োজন, জনগণের ইচ্ছার পুনর্বাসন করতে হবে। একমাত্র উপায় হলো নতুন করে দলের পুনর্গঠন করা এবং এই কাজ এখন আমাদেরকে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে করতে হবে।’ এ সময় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে আবারো জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার আন্দোলনের আহ্বান জানান তিনি। একই সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ড. খন্দকার মোশারফ হোসেনও একই সুরে বক্তব্য রেখেছেন। দলীয় সূত্র বলেছেন, আগামী মার্চ এপ্রিলে বিএনপি কাউন্সিল করে নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে দলকে ঘুরে দাঁড়ানোর কাজ শুরু করার চিন্তা ভাবনা করা হচ্ছে। জোট প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এলডিপির যুগ্ম মহাসচিব শাহদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘আপাতত কোনও এজেন্ডা না থাকায় জোটের কোনও বৈঠক হচ্ছে না। এখন জোটের প্রধান কাজ হবে মাঠপর্যায়ে দলকে শক্তিশালী করা। কারণ তৃণমূলের সংগঠনের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়।’ খেলাফত মজলিসের আমির অধ্যক্ষ মাওলানা ইসহাক বলেন, ‘জোটের ভবিষ্যত কী হবে তা এই মুহুর্তে বলতে পারছি না। জোটের আবার মিটিং হলে তখন বলা যাবে। তাছাড়া দেশে তো একনায়কতন্ত্র চলছে, কোনও কর্মসূচি পালন করা যাচ্ছে না। জোটের অনেক নেতা আক্ষেপ করে বলেন, ‘বিএনপি সারাক্ষণ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে মেতে আছে। অথচ ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন নতুন করে আবারও জামায়াত ইসু আলোচনায় এনে বিএনপিকে যেমন চাপে ফেলেছে,

তেমনি সরকারকেও একটি আলোচনার খোরাক তুলে দিয়েছে।’
ডেমোক্রেটিক লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন আহমেদ মনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, ২০ দলীয় জোট আর বিএনপির রাজনীতি একই ধারার। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের রাজনীতির কোনও মিল নেই। কারণ, আমরা জিয়াউর রহমানের আদর্শের রাজনীতি করি। আর ঐক্যফ্রন্ট শেখ মজিবুর রহমানকে তাদের আদর্শ মনে করে। এখন বিএনপি কাকে প্রাধান্য দেবে তাদের তা ঠিক করতে হবে।’
পিপলস লীগের চেয়ারম্যান গরীব নেওয়াজ বলেন, ‘এখন জোটের প্রতি বিএনপির মনোযোগ কিছুটা কম বলে মনে হচ্ছে। তবে আমি মনে করি, সংগঠন গুচিয়ে বিএনপিকে মাঠের কর্মসূচিতে ফিরতে হবে।
জোটের নেতারা বলছেন, ‘আগামী কয়েকদিনের মধ্যে হয়তো ২০ দলীয় জোটের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে জোটের নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে মাঠের কর্মসূচিতে ফিরবে বিএনপি।’
জাতীয় পার্টির মহাসচিব মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, ‘জোটের তো কোনও কর্যক্রম নেই। আমার ধারণা, হয়তো আগামী সপ্তাহে মিটিং করে এই বিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত আসতে পারে।’ তিনি বলেন, বিএনপির প্রতি শরিকদের অবহেলার অভিযোগ থাকলেও জোট ছাড়ার বিপক্ষে তারা। জোটের নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়ার হাত ধরে এই জোট গঠিত হয়েছে। এখন খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে তারা জোট ছাড়বে না। তবে কেউ কেউ জোটে থাকা নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্ধে আছেন।
কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান ইব্রাহীম বলেন, ‘এখনও পর্যন্ত ২০ দলীয় জোটে আছি, সামনেও থাকবো। দেখা যাক সামনে কী হয়।’
বাংলাদেশ ইসলামী পার্টির চেয়ারম্যান আবু তাহের চৌধুরী বলেন, ‘আমরা জোটে থাকা- না থাকা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্ত নিইনি। জোটে থাকার বিষয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমাদের।’
জোটের নেতাদের অভিযোগ, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন হওয়ার পর থেকে বিএনপির সব মনোযোগ ও কার্যক্রম তাদেরকে ঘিরে। কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বা পরে পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের থেকে। ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে কোনও আলাপ-আলোচনা করা হয় না। ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনের একদিন পরে ২০ দলীয় জোটের বৈঠক হয়। এরপর জোটের কোনও বৈঠক বা কোনও কর্মসূচি ছিল না। অথচ বিএনপির নেতারা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের নিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগর দুটি জেলা সফরেও গিয়েছেন। এই সফরগুলোতে ২০ দলীয় জোটের নেতাদের ডাকা হয়নি।’
জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, ‘আমার সঙ্গে বিএনপির তেমন কোনও যোগাযোগ নেই। জোটের কোনও কর্মসূচি নেই।’ তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জোটের একটি দলের শীর্ষ নেতা বলেন, ‘২০ দলীয় জোট নিয়ে বিএনপির কোনও চিন্তা -ভাবনা নেই। তাদের মনোভাব এখন এমন যে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টই সবকিছু। জোট না থাকলেও চলবে। জোটের কোনও কর্মসূচি না থাকলেও বিএনপি তো জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে নিয়ে বিভিন্ন জেলা সফরে যাচ্ছে। প্রতিদিন তাদের নিয়ে মিডিয়াতেও আসছে।’
জাগপার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তাসনিয়া প্রধান বলেন, ‘নির্বাচনে প্রাথমিকভাবে আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। পরে কেনও দেওয়া হয়নি, তা বলতে পারবো না। এ কারণে আমি আমাদের দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছি।’ তিনি আর বলেন, ‘আমরা এখন ২০ দলীয় জোট নিয়ে কোনও চিন্তা করছি না। নিজেদের দল গোছানো নিয়ে ব্যন্ত আছি। ২০ দলীয় জোট নির্বাচনে না গেলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমরা দলগতভাবে অংশ নেবো।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯৯ সালের ৬ জানুয়ারি জাতীয় পার্টি, জামায়াত ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোটকে সঙ্গে নিয়ে ‘চারদলীয় জোট’ গঠন করেছিল বিএনপি। পরে এরশাদ নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি বেরিয়ে গেলে যুক্ত হয় নাজিউর রহমান মঞ্জুর বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)। পরবর্তিতে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল নতুন ১২টি দলে সংযুক্তির মাধ্যমে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে থাকা চারদলীয় জোট কলেবরে বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ দলীয় জোটে। এরপর জোটের পরিধি দাঁড়ায় ২০ দলে। তবে ২০ দলীয় জোট থেকে ইসলামী ঐক্যজোট, এনপিপি, ন্যাপ ও এনডিপির একাংশ জোট ছেড়ে যায়।

Share