নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা অফিস

সদ্য শেষ হওয়া ভোটে দলের প্রার্থীদের নিরঙ্কুশ বিজয়ে জনগণের কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে আওয়ামী লীগ। এবারের ভোটে জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৫৭টিতে জয়ী হয়ে টানা তৃতীয়বারের মত সরকার গঠনের রেকর্ড গড়ল আওয়ামী লীগ। দলের ধারাবাহিক বিজয়ের এ সাফল্য প্রচারে ভোটের ১৯ দিন পর, ঢাকায় বড়সর জনসভার আয়োজনের মধ্যদিয় বিজয় উৎসব পালন করল দলটি। অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, যারা আমাদের ভোট দিয়েছেন এবং যারা ভোট দেননি, সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। কামার, কুমার, জেলে, কৃষক, শ্রমিক, মজুর সকল স্তরের মানুষকে আমি ধন্যবাদ জানাই। আপনারা রায় দিয়ে আমাদের সুযোগ দিয়েছেন আপনাদের সেবা করার। জনগণের এ রায় অন্ধকার থেকে আলোর পথের যাত্রার রায়। আমরা যেহেতু সরকার গঠনের সুযোগ পেয়েছি, জনগণের সেবা করার সুযোগ পেয়েছি, আমরা সবার তরে সবার জন্য কাজ করবো।’ আওয়ামী লীগ সভাপতি আরও বলেন, সুদীর্ঘ পরিকল্পনা নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। বাংলার মানুষকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারে নাই, পারবেও না। আমরা বাসযোগ্য, উন্নত সমৃদ্ধ সোনার বাংলা করবই। বিশাল এই জনসভার সভাপতি শেখ হাসিনাসহ সব বক্তাই জাতিকে ধন্যবাদ জ্ঞাপনের সঙ্গে দেশ গঠন, সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
আওয়ামী লীগের বিজয় সমাবেশ উপলক্ষে গতকাল সকাল থেকেই ঢাকা হয়ে ওঠে সোরাওয়ার্দীউদ্যান মুখী। দুপুর হওয়ার আগেই জনজোয়ারে ভাসতে শুরু করে রাজধানী শহর ঢাকা। ঢাকার বাইরে থেকে ট্রেন-বাস-লঞ্চে ছুটে আসেন লাখখানেক মানুষ। সমাবেশে বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দিলেন দেন শেখ হাসিনা। বলেন, ‘বাংলার মাটিতে স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী, দুর্নীতিবাজ-জঙ্গিবাদের কোনও জায়গা হবে না।’ তিনি বলেন, ‘এই বিজয় নির্বাচনী ইশতেহারের পক্ষে জনতার রায়। ভোটের সম্মান যাতে থাকে, মাথায় রেখে সুষম উন্নয়ন করে যাব। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ-মাদক-দুর্নীতির বিরুদ্ধে রায়। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মনে রাখতে হবে, কঠিন দায়িত্ব আমরা পেয়েছি, সর্বান্তকরণ দিয়ে এটা পালন করতে হবে। জনগণ শান্তি চায়, উন্নয়ন চায়। এটা আমরা করব। অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রার রায় দিয়েছে তরুণ সমাজক।’ শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘যে আস্থা এবং বিশ্বাস নিয়ে জনগণ আমাকে ভোট দিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছে; জনগণের সে মর্যাদা আমি রক্ষা করব। প্রয়োজনে আমার জীবন দিয়ে হলেও ভোটের মর্যাদা রক্ষা করব।’
সমাবেশে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা থেকে আবৃত্তি করে দৃঢ়কণ্ঠে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, আমি আগেও বলেছি, এখনও বলছি- ‘চলে যেতে হবে আমাদের। চলে যাব, তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ। প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল, এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি। নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’ তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক কর্মি হিসেবে এটাই আমি মনে করি, মানুষের জন্য কতটুকু করতে পারলাম, কতটুকু দিতে পারলাম, এটাই বড় কথা। কি পেলাম, না পেলাম সেটা বড় নয়। সবার সহযোগিতা চাই, আসুন সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশকে গড়ে তুলি। বর্তমানকে উৎসর্গ করি ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘ব্যক্তিগত জীবনে আমার কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। আমি কী পেলাম না পেলাম তার চেয়ে আমি কী দিতে পারলাম সেটাই বড় কথা। দেশের জনগণ আমার ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রেখে ভোট দিয়েছে। আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তুলব।’
এর আগে সমাবেশে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি মৃত্যুর মিছিলে দাঁড়িয়ে গেয়েছেন জীবনের জয়গান। ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে উড়িয়েছেন সৃষ্টির পতাকা। বাংলার বাতিঘর আপনাকে অভিবাদন।’ তিনি বলেন, ‘সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে বঙ্গবন্ধু মুজিবের স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। আপনি জেগে থাকেন বলে বাংলাদেশ নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নবাহক আপনি এই দেশমাতৃতাকে আপন সত্তায় ফিরিয়ে এনেছেন।’ ‘আপনি বলেছেন যুদ্ধাপরাধীদর বিচার হবে, আপনি বলেছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘৃণিত খুনিদের বিচার এ দেশের মাটিতেই হবে। কথা দিয়ে কথা রাখার সংস্কৃতি আপনি ফিরিয়ে এনেছেন। জনগণ তাদের রায়ের মধ্যে প্রমাণ দিয়েছে তারা স্বাধীনতাবিরোধী, সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত।’ কাদের বলেন, ‘আপনার প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বের গুণে কেবল জল স্থল নয়, অন্তরীক্ষেও আমাদের গৌরবময় বিচরণ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচয় দিয়ে আমরা আজ গর্ববোধ করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশকে আরও একটি নতুন শতাব্দীর উপযোগী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে আপনার প্রণীত ডেলটা প্ল্যান নতুন প্রজন্মকে উজ্জীবিত করেছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আপনাকে অভিবাদন জানাচ্ছি।’
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিজয় সমাবেশের শুরুতে কোরআন তেলাওয়াত করেন ড. মাওলানা একেএম আব্দুল মজিদ সিরাজী। এরপর পবিত্র গীতা পাঠ করেন ড. আসিস সরকার। বাইবেল ও ত্রিপিটক পাঠ করে শোনানো হয়। উদ্যানের ভিতরে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক নৌকার আদলে তৈরি করা হয় ‘বিজয় মঞ্চ’, তার পেছনের ব্যানার সাজানো হয় দলের এবারের ইশতেহারের মলাটের রঙে। বৈঠাসহ ছোট বড় ৪০টিরও বেশি নৌকা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার ছবি সংবলিত ফেস্টুনে সাজানো হয় সমাবেশ মাঠ।
আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ ও উপ-সম্পাদক আমিনুল ইসলামের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন, দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমদ, সভাপতিম-লীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী প্রমুখ।
‘জয় বাংলা’ স্লোগান আর ঢাকঢোলের বাদ্যে উজ্জীবিত দলের নেতাকর্মীরা দুপুর থেকে সন্ধ্যা অবধি মাতিয়ে রেখেছিলেন গোটা জনসভাস্থল। গানের সুরে মুগ্ধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও করতালি দিয়ে উৎসাহ যুগিয়েছেন শিল্পীদের। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী রফিকুল আলমের পাশাপাশি কণ্ঠ মেলান সাংসদ ও ফোক শিল্পী মমতাজও। এছাড়াও গান গেয়ে শোনান ফকির আলমগীর, জানে আলম, পথিক নবী, আঁখি আলমগীর, সালমা। ব্যান্ড দল জলের গানও তাদের পরিবেশনা নিয়ে আসে এই উৎসবে। জিতল এবার নৌকা, শেখ হাসিনার সালাম নিন, উন্নয়নের শপথ নিন, এমন মুগ্ধ দর্শক তরঙ্গের উত্তাল ঢেউয়ে দুলেছে-নেচেছে উপস্থিত সবাই। এ সব গানে গানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বন্দনা যেমন ছিল, তেমনি ছিল গত এক দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-ের কথাও।

Share
  • 1
    Share