নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » শীতকালীন সব্জী : চাষীদের হাসি মুখ যেনো অটুট থাকে

শীতকালীন সব্জী : চাষীদের হাসি মুখ যেনো অটুট থাকে

দেশের উৎপাদক কৃষকসমাজের অকাতর শ্রমদানের সুফল এখন ভাগ্যের পরিবর্তন এনেছে। সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের অবদান এক্ষেত্রে স্মরণীয়। বিশে^র স্বীকৃতিও মিলেছে যে, এদেশের কৃষিব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা অর্থনীতির অগ্রযাত্রার বড়ো সহায়ক। চাষীদের ঘরে বিগত কয়েক বছরে শীতের সব্জীর চাষ নিয়ে এসেছে সচ্ছলতার সুবাতাস। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া সর্বত্রই চাষীদের সুদিন, স্বস্তির দিনকাল। আর, সাফল্যের নির্মল আনন্দের ছোঁয়া দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই শীতকালীন এই কৃষিজ ফসলের চাষে বাম্পার ফলন হওয়ায় খুশির জোয়ারে ভাসে আমাদের চাষীকূল। খুশির কারণ শুধু শীতের ফসলের ফলনের প্রাচুর্যের জন্যে যে ঘটেছে তা নয়, শাকসব্জী তরিতরকারী বাজারে নিয়ে গিয়েও তারা বেশ ভালো দাম পাচ্ছে। ন্যায্য দাম পেলে চাষীদের মুখে আনন্দের যে রৌদ্র ছড়িয়ে পড়ে, তারই ঝলকানি বাস্তবিকই এখন দেখার মতো।
শ্রম দিয়ে ঘাম ঝড়িয়ে মাঠের বুকে ফসল ফলিয়ে উপযুক্ত মূল্য পাওয়াই তো উচিত। কিন্তু তা যদি তাঁরা না পান তাহলে সেটি হয়ে ওঠে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। পাইকারদের সিন্ডিকেট তাদের জন্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পণ্যেল উপযুক্ত মূল্য পেতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলেও বাজার পরিবেশ মূলত ভালো দাম পাওয়ার অনুকূলে। দেশের নানা অঞ্চলে চাহিদা ও ক্রেতা সাধারণের ক্রয় ক্ষমতার উন্নতিই এর একটা বড়ো কারণ। লক্ষ্যণীয় যে, যে শহর নগর বন্দরের হাটবাজারগুলোতে দামে বিক্রি হচ্ছে শীতকালীন কৃষিজ খাদ্যপণ্যগুলো, মাঠ পর্যায়ের উৎপাদক চাষীরা লাভবান হয়, তার চাইতে বেশ কম। দর কষাকষিতে নিজেদের উৎপাদিত ফসলের বাড়তি মূল্য আদায় করতে তাদের এই পচনশীল পণ্যের সংরক্ষণ ওবাজারজাতকরণের সুযোগ দরকার।
উল্লেখ করা সঙ্গত যে, আমাদের শীতকালীন শাক-সবজী ও তরি-তরকারীগুলো কেবল দেশের মানুষের চাহিদার দিকে লক্ষ্য রেখে উৎপাদিত হচ্ছে না। এই সমস্ত শীতকালীন ফসল এখন দেশের গ-ি ছাড়িয়ে মাধ্যপ্রাচ্যের দেশসহ ইউরোপ-আমেরিকাতেও রপ্তানি হয়ে চলেছে। ফলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চাষীবৃন্দকে ফসল চাষে প্রয়োজনীয় পরামর্শের পাশাপাশি উৎপাদনবৃদ্ধির জন্য সব ধরনের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। বিদেশে সৃষ্ট সব্জী বাজার ধরে রাখার জন্য এবং এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের খাত অব্যাহত রাখঅর প্রয়াস হিসেবে আমরা মনে করি, সরকারের কৃষি দপ্তরকে সর্বদাই উৎপাদক চাষীদের পশে থাকতে হবে। একইভাবে বাম্পার ফলন ফলানোর কৌশল ও আনুষঙ্গিক সুযোগ সুবিধাসমূহ অর্থাৎ বীজ, সার, সেচ, কীট বিনাশের বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি ইত্যাদি চাষীদের জন্য সহজলভ্য রাখতে হবে সবসময়।
শীতের শুরুটা ফলনের খানিকটা আগে শুরু হলে কিংবা প্রথম দিক থেকেই একাধিক শৈত্যপ্রবাহ নেমে আসলে সব্জীর মাঠ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা দেখা যায়। তখন বিষয়টি নিতে দ্রুত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দেশের বিভিন্ন জেলা উপজেলা পর্যায়ে সব্জী চাষীদের মধ্যে সচেতনতামূলক প্রচার প্রচারণা অব্যাহত রাখা আবশ্যক। শৈত্যপ্রবাহের সময় কীভাবে সব্জী ক্ষেত সংরক্ষণ করা উচিত সে বিষয়ে মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের কাছে নির্দেশনা পাঠানো, চাষীদের তথ্য জানানো দরকার। উদ্যোগ নিয়ে মাঠ কর্মকর্তাগণও চাষীদের পরামর্শ প্রদান করবেন। শৈত্যপ্রবাহের হাত থেকে রক্ষা পেতে এ সময় বীজতলা ঢেকে রাখতে হবে, চারা রোপণ করতে হবে কিছুটা দেরি করে। পরামর্শ দরকার হয় কোন ফসলের জমিতে কত সেন্টিমিটার পানি ধরে রাখা উচিত এমন সব বিষয়েও।
অতিরিক্ত শীতে আমাদের চির পরিচিত শাকসব্জী, তরি তরকারী ইত্যাদির তেমন ক্ষতি না হলেও আলু চাষে ক্ষতিটা অধিক হয়। অতি ঠা-ায় বিশেষ করে ‘নাবিধসা’ অর্থাৎ আলুগাছ পুড়ে যাওয়ার মতো হলুদ হয়ে যায়। এটি দেখা দিলে সাথে সাথে ছত্রাক-নাশক স্প্রে করতে হয়। বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ইত্যাদিতে অধিক শীতে পোকামাকড়ের আক্রমণ ঘটাতে পারে। তাই, কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিয়ে কীটনাশের নানা পদ্ধতি ব্যবহার দরকার হয়ে পড়ে।
চট্টগ্রামের শঙ্খ নদী বর্ষায় দু’কূল ছাপিয়ে বানে ভাসায়। শীতের এ দিনে কিন্তু চিত্র হয় অন্যরকম। বর্তমানে সেই নদীর কূলবর্তী চর এলাকা শীতকালীন নানাজাতের সব্জীর বাম্পার ফলনে সয়লাব হয়ে গেছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লা জেলাসহ আরও দুর দুরান্ত থেকে পাইকাররা এসে এসব সব্জী নিয়ে যায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে সরবরাহ করার জন্য। কৃষি বিশেষজ্ঞদের কারো কারো মতে, চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ ও সাতকানিয়া উপজেলার শঙ্খ নদীর উপকূলবর্তী চরের মাটি সব্জী চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এই এলাকার উৎপাদিত সব্জী সুস্বাদু হওয়ায় চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলাগুলোর মানুষের কাছে রয়েছে এর ব্যাপক চাহিদা।
প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মাটিই উৎপাদিকা গুণসম্পন্ন। উপযুক্ত সহায়তা ও পরামর্শ পেলে এই মাটিতে আমাদের চাষীরা ফসলের বান ডেকে আনতে পারে নিরলস শ্রমের মাধ্যমে। আমরা মনে করি, দেশের সব্জী চাষীদের আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত চাষপদ্ধতির প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রয়োজনীয় সব সহায়তা দিলে সব্জীর উৎপাদন বর্তমানের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি বাড়ানো সম্ভব। তাতে, বিদেশের বাজার ধরে রাখার বিষয়টিও নিশ্চিত করা যাবে, দেশের চাহিদাও ভালভাবে পূরণ করা সম্ভব হবে।

Share