শৈল, সমতল, সরিৎ, সাগর কুন্তলা চট্টলভূমি নৈসর্গিক লীলা-নিকেতন রূপে চিরদিনই ইতিহাস প্রসিদ্ধ। সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চার ক্ষেত্রেও সাধক কর্মবীরদের এক অনুপম সাধনা কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত।
বাংলার কবি-সাহিত্যিকগণ মধ্যযুগের সাহিত্য ভা-ারকে স্বীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে যে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন, তাঁদের মধ্যে চট্টগ্রামের বিদগ্ধ কবি-সাহিত্যিক প-িতগণের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারী উদ্যোগে ১৮৬৮ খিৃস্টাব্দে প্ুঁথি সংগ্রহ শুরু হয়। এ সময় লর্ড লরেন্স ভারতের সব প্রাদেশিক সরকার প্রধানকে পত্র মারফত জানায়ে দিলেন যে পুঁথি সংগ্রহের ব্যবস্থা নিতে। বরাদ্দ করলেন ২৪,০০০ টাকা। বাংলার ভাগে পড়ল ৩২০০ টাকা। ২৩ বছর ধরে সংগ্রহের ফলে ১৮৯১ সালের গণনায় মোট ১১ হাজার পুঁথি উদ্ধার হয়। এর উপর নির্ভর করে বাংলা ভাষার ইতিহাস রচনার কাজ শুরু হলো। এ ২৩ বছরের সংগৃহীত পুঁথির তালিকায় প্রকাশ পেল ১৫০ জন কবির নাম। উল্লেখ্য যে এ সময় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কর্তৃক চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ইত্যাদি অঞ্চল থেকে পুঁথি সংগ্রহের জন্য নিযুক্তি লাভ করেন ড. দীনেশ চন্দ্র সেন ও বিনোদ বিহারী কাব্যতীর্থ। তাদের বিপুল সংগ্রহে মুসলিম কবির কোন পুঁথি ছিল না।
১৮ সালে মধ্যযুগের সাহিত্যের ইতিহাস লেখক বাংলার মৌলিক গবেষক মুন্সী আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ জানায়ে দিতে চেয়েছিলেন যে প্রাচীন বাংলা সাহিত্য চর্চায় হিন্দু কবির সমান অবদান রেখেছেন মুসলিম কবিগণও। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হিন্দু কবির চেয়েও অগ্রগামী ছিল।
এ বিষয়ে আরো উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি যে, বাংলা প্রাচীন পুঁথি সাহিত্যের অমর গবেষক ও আবিষ্কর্তা মুন্সী আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ, ড. মুহাম্মদ এনামুল হক, ড.আহমদ শরীফ, আবদুস সাত্তার চৌধুরী প্রমুখদের ব্যাপক পুঁথি সংগ্রহের সুবাদে মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্যের যেসব নিদর্শনের সন্ধান আমরা এ যাবৎকালে পেয়েছি তাতে চট্টগ্রামের ভূমিকা ও অংশীদারিত্ব দেখে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না। মনে হয় বাংলা সাহিত্য চর্চায় মধ্যযুগে চট্টগ্রাম যেন সারা বাংলাদেশকে পথ দেখিয়েছে। মধ্যযুগ বিশেষজ্ঞ প-িত ড.আহমদ শরীফ বলেছেন, “মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলমানের রচনা বলতে প্রায় সবটাইতো চট্টগ্রামের দান। এমনকি বাংলাদেশের যে কোন অঞ্চলের চেয়ে চট্টগ্রামের হিন্দুদের দানও কম নয়।”
আমাদের চট্টলায় সৃষ্ট সাহিত্য ভা-ারের কথা এ সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে তুলে ধরার প্রয়াস মাত্র। সম্প্রতি আমাদের সংগ্রহে এসেছে শেখ শাহ পরান বিরচিত ‘ছুরে আমপারার মাহাত্ম’ নামে ক্ষুদ্রাকারের একখানি প্রাচীন পা-ুলিপি। এটি চট্টগ্রামের কোন এক অজ্ঞাত গ্রাম থেকে সংগ্রহ হয়ে পটিয়ার আবদুস সাত্তার চৌধুরী পুঁথি শালায় সংরক্ষিত হয়। প্রাপ্ত পা-ুলিপি খানি আরবী হরফে লেখা বাংলা পুঁথি। পুঁথিতে প্রাপ্ত তথ্যে আলোকে আমাদের ধারণা কবি শেখ শাহ পরান (র.) হযরত শাহ জালাল (র.)’র শিষ্য সাথী ছিলেন। সে হিসেবে ধারণা করা যায় কবি ১৩১৫-২০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কাব্য লেখা শুরু করেন। এটির লিপিকাল প্রায় আড়াই শত বছরের প্রাচীন।
এভাবে পঞ্চদশ শতকের শুরুতে পাই শাহ মুহাম্মদ সগীর ও তাঁর কাব্য ইউসুপ জোলেখা। এটি ঐতিহাসিক প্রণয়-কাহিনী। এ রোমান্টিক উপাখ্যান কাব্যখানি সুলতান জিয়াসুদ্দিন আজম শাহের রাজত্বকালে (১৩৯০-১৪১০ খৃঃ) কবি রচনা করেন। কাব্যটি ড. এনামুল হক কর্তৃক সম্পদিত হয়ে প্রকাশিত হয়।
প্রাচীন কবি কৃত্তিবাসের পূর্বপুরুষ নবসিংহ ওঝা বাংলাদেশের কোন এক রাজার পাত্র ছিল। রাজার নাম বেদানুজ (দনুজ) কোন এক সময় বঙ্গদেশে প্রমাদ দেখা দিলে’ নরসিংহ ওঝা দেশ ত্যাগ করে গঙ্গা তীরে আশ্রয় নেন এবং সেখানে বসতি স্থাপন করেন। তার এক উত্তর পুরুষ হলেন কবি কৃত্তিবাস।
কৃত্তিবাস চট্টগ্রামবাসী নরসিংহ ওঝার বংশধর। কর্মজীবনে তিনি গঙ্গাতীরবর্তী ফুলিয়া গ্রামে বাস করতেন। লক্ষণীয় চট্টগ্রামের ওঝারা ঝাড়ফুকের মন্ত্রে নরসিংহের দোহাই দিয়ে থাকেন, ও নরসিংহের দোহাই, ভাল ইত্যাদি গেয়ে থাকেন। এছাড়া চট্টগ্রামবাসী হিন্দু পরিবারে বেশি বেশি রামায়ণ পাঠক, সংগ্রাহক কর্তৃক সপ্তকান্ত রামায়নের অনেক পা-ুলিপি উদ্ধার হয়।
ঐতিহাসিক তথ্য বিচারে কবি শেখ শাহ মোজাম্মিলকে পঞ্চদশ শতকের কবি বলে চিহ্নিত করতে পারি। কবির উক্তিÑ
“শাহা বদরুদ্দিন পীর কৃপা কুল হরি।
শতমুখে সে বাখান কহিতে ন পারি ॥
তাহান আদেশ মাল্য শিরেতে ধরিয়া।
রচিলেও মোজাম্মিলে মান আকলিয় ॥”
(সায়াৎনামা)
পঞ্চদশ শতকের প্রাচীন চট্টগ্রামের আরেকজন প্রখ্যাত কবি হচ্ছেন শেখ শাহ জৈনুদ্দিন সিদ্দিক। তার একটি মাত্র কাব্য “রাসুল বিজয়” বা ‘জঙ্গনামা’। কবি সুলতান ইউসুফ শাহের (১৪৭৪-১৪৮১ খৃঃ) সভাকবি ছিলেন।
বৌদ্ধযুগে চট্টগ্রামের বৌদ্ধরাজ জয়চন্দ্রের (১৪৮২-১৫৩১) সভাকবি দ্বীজ ভবানী নাথ রাজার আদেশে পাঁচ হাজার পংতি বিশিষ্ট “রামচন্দ্রের রাজ্যভিষেক বা লক্ষণ দিগি¦জয়” নামে পৌরাণিক কাব্য রচনা করেন।
এ সাথে যাকে পাচ্ছি তিনি হচ্ছেন কবি দ্বিজ শ্রীধর কবিরাজ। তিনি বিদ্যাসুন্দর নামে একখানী কাব্য রচনা করেন। তিনি তার কাব্যে সুলতান আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহের প্রশস্থি গেয়েছেন।

অতএব আমরা ধারণা করতে পারি যে কবি ফিরোজ শাহের (১৪৯৩-১৫১৯) সময় কালের মধ্যে কাব্য চর্চায় মনোনিবেশ হন।
ষোড়শ শতকে যারা চট্টগ্রামে বসে কাব্য চর্চা করেছেন আমরা তাঁদের অনেকের কীর্তি কর্মের সাথে পরিচিত। গৌড়েশ্বর হোসেন শাহের শাসন আমলে তাঁরা এক প্রকার মহাভারত রচনায় প্রতিযোগিতায় নেমে ছিলেন মনে হয়।
হোসেন শাহের (১৪৯৬-১৫১৯) পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে পরাগল খাঁর আদেশে কবি কবিন্দ্র পরমেশ্বর দাস চট্টগ্রামে পরাগল পুরে বসে পরাগণী মহাভারত রচনা করেন।
পরাগল খাঁর পুত্র ছুটি খাঁ’র আদেশে শ্রীকর নন্দী মহাভারতের অশ্বমেধ পর্ব রচনা করেন। তার জন্ম পটিয়ার জঙ্গলখাইন গ্রামে। বাংলা সাহিত্যে এটি ছুটিখানি মহাভারত নামে খ্যাত। এটি রচিত হয় সুলতান নসরত খাঁ’র (১৫১৯-১৫৩১ খিৃঃ) শাসন আমলে।
ত্রিপুরার রাজা ধন্যমানিক্য ১৫১৩ খিৃস্টাব্দে চট্টগ্রাম জয় করেন এবং চট্টগ্রামকে ত্রিপুরা রাজ্যের অধীনে নিয়ে আসেন। ১৫১৫ খিৃস্টাব্দের শেষের দিকে গৌড়েশ্বর হুসেন শাহের সাথে যুদ্ধে পরাজয় বরণ করেন। এ প্রতাপশালী রাজা ১৫১৫ খিৃঃ মৃত্যুবরণ করেন। উপরে বর্ণিত সময় কালের মধ্যে দেখা যায় তিনি বাংলা সাহিত্যের অনুবাদ কর্মে উৎসাহদান করেছিলেন। যাকে তিনি উৎসাহ দান করেছিলেন তিনি হচ্ছেন কাশীরাম দাস। সম্প্রতি আমাদের সংগ্রহে কাশীরাম দাশ বিরচিত মহাভারতের আদি পর্ব প্রাপ্য হই। অজ্ঞাত নামা লিপিকার বাত সংখ্যক পৃষ্ঠায় আদি পর্ব সমাপ্ত করেছিরেন তা বলা কঠিন। কারণ সমাপ্তপত্র পাওয়া যায় নি।
এ বিষয়ে অন্য তথ্য না আসা পর্যন্ত আমরা মনে করতে পারি কাশী রামদাস ধন্যমানিকের আমলে ত্রিপুরা বা চট্টগ্রামের কোন এক এলাকায় বসে মহাভারতের আদি পর্ব রচনা শুরু করেন। উল্লেখ্য কাশীরাম দাস রচিত মহাভারত ১৬০৪-০৫ খিৃস্টাব্দে রচিত হয় বলে প্রচার রয়েছে। কবির নিবাস গঙ্গানদী তীরবর্তী সিদ্ধি গ্রামে। পুঁথি রচনা কালে তিনি চট্টগ্রামে (?) চাকুরী বা প্রবাসী জীবন কাটাচ্ছিলেন বলে অনুমিত হয়।
কবি শাবিরিদ খাঁ ফটিকছড়ির নানুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ড. আহমদ শরীফের মতে কবি ১৫৩০-১৫৫০ খিৃস্টাব্দের মধ্যেই তিনি যে তিনটি কাব্য লিখেছেন সেগুলো হলো: ১ বিদ্যাসুন্দর ২) রসুল বিজয় ৩) হানিফ ও কয়বা পরী। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে রোমান্টিক প্রণয়োপ্যাখ্যানমূলক কাব্যের ধারায় দৌলত উজির বাহরাম খাঁ একজন উল্লেখযোগ্য কবি। এ যাবৎ তার রচিত দু’খানি কাব্যের পা-ুলিপি উদ্ধার পায়। ১) লাইলী মজনু ২) ইমাম বিজয়। কবি আফজল আলী ফিরোজ শাহের আমলে (১৫৩২-১৫৩৩ খিৃ:) ‘নসিয়ত নামা’ কাব্য রচনা করেন। প্রশ্ন আসে পদ সাহিত্য রচয়িতা আফজল ও নসিরত নামা কাব্য রচয়িতা আফজল যদি অভিন্ন হয় তাহলে ধরে নিতে হবে কবি সুলতান ফিরোজ শাহের (১৫৩২-৩৩ খিৃ:) আমলের লোক। ১৫৩০-৭৫ সালের মধ্যে শেখ মীর ফয়জুল্লাহ রচনা করেন। সোর্খবিজয়, গাজী বিজয়, পদাবলী ইত্যাদি। মুহাম্মদ কবির বিরচিত মধুমালতী, কোন ফারসী কাব্যের স্বতঃস্ফূর্ত অনুবাদ বলে বিজ্ঞ প-িতগণ মনে করেন। এ রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান খুবই জনপ্রিয়তা পেয়েছে। মহাকবি সৈয়দ সুলতানের জন্ম সিলেটের কোন এক ঐতিহ্যবাহী গাঁয়ে হলেও তিনি তার প্রৌঢ় বয়স ও বৃদ্ধকাল কাটায়ে দেন তৎকালীন আরাকান রাজ্যের শাসনাধীন চট্টগ্রামের চক্রশালা বর্তমান পটিয়া উপজেলায় বারিপাড়া গ্রামে। এখানে তার বসত ভিটা আজো বর্তমান। এ ভিটাকে এলাকা লোক সৈয়দ সুলতানের ভিটা নামে খ্যাত করেন। সৈয়দ সুলতান রচনা করেন নবী বংশ, জ্ঞান প্রদীপ, জ্ঞান চৌতিশা ও জয়কুম রাজার লজাই। এসাথে অসংখ্য পদাবলীর রচয়িতা। নবীবংশ কাব্যখানি রচিত হয় ১৫৮৪-৮৬ খিৃস্টাব্দে। এটি কবির শ্রেষ্ঠ কীর্তি। ষোড়শ শতকের শেষভাগে ১৫৯৫ খিৃস্টাব্দে দেয়াং বা দেব গ্রামবাসী গোবিন্দ দাস ‘কালিকা মঙ্গল বা বিদ্যা সুন্দর রচনা করেন। ১৫৯৮-৯৯ খিৃস্টাব্দে কবি সফর আলী রচনা করেন ‘গোলে হরমুজ’ নামে রোমান্টিক উপাখ্যান। কাব্য ও কবি দুটাই নবাবিষ্কৃত। এটার আবিষ্কর্তা পুঁথি সংগ্রাহক আবদুস সাত্তার চৌধুরী। এ শতকের শোষার্ধে পটিয়া বাসী রমেশ্বর ‘শিবায়ন’ নামক কাব্য রচনা করেন। সতের শতকে যারা বাংলা সাহিত্যের সম্পদ বৃদ্ধি করে চট্টগ্রামকে ধন্য করেছেন তাদের মধ্যে কাজী দৌলত প্রাচীনতম কবি। তিনি ‘সতীময়না’ লোরচন্দ্রাথী কাব্য রচনা করেন।
জীবনকাল ১৬০০-১৬৩৮ খিৃস্টাব্দ। তিনি রোসাঙ্গ রাজ শ্রী সুধর্মের (১৬২২-১৬৩৮ খ্রীঃ) সমর সচিব আসরফ খানের অনুগ্রহ লাভ করে তার কাব্য রচনা শুরু করেন। তিনি গোটা বাংলা সাহিত্যে দেব-দেবীর কাহিনী বিবর্জিত অতি রোমান্স রচয়িতাদের অন্যতম। কাজী দৌলত শুধু বাঙালী মুসলমান কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নহেন। প্রাচীন বাংলার শক্তিমান কবিদের মধ্যেও তিনি একজন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। তিনি রাউজানের সুলতানপুর গ্রামের কাজী বংশে জন্মগ্রহণ করেন।
কবি মরদন কাজী দৌলতের সমসাময়িক ছিলেন। তিনি নসীব-নামা নামে একটি মৌলিক কাহিনী কাব্য রচনা করেন। আরকান রাজসভার প্রধানমন্ত্রী ও কবি আলাওলের আশ্রয়দাতা কবি ননা গাজী এক জন সুফী সাধক কবি। তিনি পটিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন পাইরোল গ্রামের জমিদার প্রখ্যাত পাঠানি তরফদার দৌলত হামজা বংশের কৃতী সন্তান। সূফী বিষয়ক তার একখানি কাব্যের নাম ‘ইবলিশ নামা’। এটি আঠাশতকের শেষার্ধে রচিত হয়। এ কাব্যের আদেষ্ঠা ও তার শিক্ষা গুরু বিখ্যাত দরবেশ আলেম হযরত শাহ সূফী সৈয়দ বাহাউদ্দিন (রহ)। সাতকানিয়ার সুখছড়ি গ্রামবাসী কবি নওয়াজিস খাঁ গোলেবকাওলী নামক উপখ্যান কাব্য ছাড়াও ‘সরওয়ার সিংহ কার্তি’ ও ‘পাঠান প্রশংসা’ নামক জীবন কাহিনীদ্বয় এবং বহুপদ রচনা করেছেন। পারিবারিক সূত্রে জানা কবি ১১৭ বছর বয়স লাভ করেছিলেন। কবি তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘গোলে বকাওলী’ কাব্য খানি ১৬৩০-১৬৫০ সালের মধ্যে রচনা করেন মর্মে মত প্রকাশ করেন ড. শরীফ। কবি মঙ্গল চাঁদ মঙ্গল কাব্যের আদলে ইসলামের মহিমাজ্ঞাপক ‘শাহা জালাল মধুমালা’ একখানি কাব্য রচনা করেন। করুল ডেঙ্গা নিবাসী জ্ঞাত নামা সঙ্গীতবিদ কমর আলী প-িত ‘ছরছালের নীতি,’ ‘রাধার সংবাদ’ ‘ঋতুর বারমাস ও পদ রচনা করেছেন। মুহাম্মদ ফসিহ ‘আরবী ত্রিশ হরফের বয়ান’ নামক চৌবিশা-জাতীয় এক অভিনব স্মৃতিমূলক পুঁথি রচনা করেন। আরকান রাজসভার কবি আবদুল করিম খোন্দকার ‘দুল্লাহ মজলিস’, ‘হাজার মসায়েল,’ নূর ফরামিসনামা’, ওমীম আনসারী প্রভৃতি ধর্ম বিষয়ক কাব্য রচনা করেন। দ্বিজরামদেব বিরচিত ‘অভয় মঙ্গল কাব্যখানির উপর গবেষণা করে শ্রী আশুতোষ দাস ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন। খান গয়াস বিজয় হামজানামে বৃহৎ কাব্য রচনা করেন। এ নবাবিষ্কৃত কাব্যের একটি মাত্র খ-িত পা-ুলিপি উদ্ধার হয়। এটার আবিষ্কৃর্তা প্রখ্যাত পুঁথি সংগ্রাহক আবদুস সাত্তার চৌধুরী। এটি চ. বি. গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত হয়। কবির পিতার নাম দরিয়া খান। পিতামহ বুধা খান। তিনি জনৈক এয়ার মোহাম্মদ চৌধুরীর পুত্র জমিদার নাসির মোহাম্মদের আদেশে কাব্যখানি রচনা শুরু করেন। অষ্টাদশ শতকের প্রথম দশকে সন্দ্বীপের আবদুল হাকিম একজন শক্তিধর ও প্রতিভাবান কবি হিসেবে সুপরিচিতি। তাঁর রচিত কাব্য ‘নূর নামা’, ‘ইউসুফ জুলেখাঁ’, ‘লাল মতি সয়ফল মুলুক ও ‘নাসিয়তনামা’। ছিলিমপুর নিবাসী কবি আবদুল নবী খলিফা ১৬৮৪ খিৃস্টাব্দে রচনা করেন বিজয় হামজা পুঁথি। এ অমর কবি তার বিশাল কাব্যটি আশি পর্বে সমাপ্ত করেন। কাব্যের বিশলতা নিয়ে কবি বলেন “উত করে উঠে পরাণ দেখিলে ডরায়”। কাব্য গবেষকগণ বলেন এ সুন্দর কাব্যের ভাষা ও রচনা শৈলী এক মাত্র কাশি রাম দাসের মহাভারতের সাথে তুলনা হয়। সীতাকু-বাসী শেখ পরাণ ১৬১৩ সালের দিকে নুর জামাল ও নসীহত নামা নামে দু’খানি ধর্মীয় কাব্য রচনা করেন। এ কবি পুত্র শেখ মুতালিব ১৬৩৯ সালে রচনা করেন ‘কিফায়িতুল মছল্লিন’। এটি ধর্ম বিষয়ক একটি চমৎকার কাব্য। তার অপর আর এক খানি কাব্যের নাম ‘কায়দানী কিতাব’। রামুবাসী কবি নেওয়াজ ও তৎপুত্র আশরাফও শরীয়ত বিষয়ক কাব্য রচনা করেন। আরো যারা কাব্য সাধনা করে চট্টগ্রাম গৌরবান্নিত করেছেন তাদের মধ্যে সুচক্রদ-ীর কবি দ্বিজ রতি দেব ১৬৭৪ সালে ‘মৃগলুব্ধ’ কাব্য রচনা করেন। সৈয়দ সুলতানের পৌত্র কবি শরীফ শাহ ‘লাল-মতি সয়ফল মুলুক’-নামীয় প্রণয়োপাখ্যান রচনা করেন। ধারণা হয় কবি সতর শতকের শেষ পাদে পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। অষ্টাদশ শতকের কবি কাজী বদিউদ্দিন পুঁথিকার ও পদ সাহিত্য রচয়িতা হিসেবে সুপরিচিত। তার নিবাস পটিয়া বাহুলী। তাঁর তিন খানি কাব্য যথাক্রমে ১। চিপতে ঈমান’ ২। ফাতেমার সুরত নামা’, ৩। নামাজের কিতাব’। কবির কাব্যে গুরুর নাম চাম্পা গাজী। তিনি পদকার হিসেবে পরিচিত। তাঁর নিবাস বোয়ালখালীর খিতাবচর।
বাঁশখালীর বাহার ছড়া নিবাসী খোন্দকার নসুরুল্ল খান বিরচিত কাব্যসমূহের মধ্যে ‘জঙ্গনামা’ রচিত হয় যুদ্ধকাহিনী নিয়ে। কবির অন্যান্য কাব্যের নাম ‘শরীয়ত নামা’ এটার রচনা কাল ১৭৫৫ খৃ:। এবং ‘মুসারসাওয়াল’,। ও সব-ই-মেরাজ।
১৭১৮ খিৃস্টাব্দে হাটহাজারীর চারিয়া গ্রামের মুহাম্মদ উজির আলী রচিত একটি কাব্যের নাম পাওয়া যায়। এটির নাম ‘নছলে ওসমান ইসলামাবাদ বা শাহনামা। এটা ইসলামের তৃতীয় খলীফা হযরত ওসমান (র)-র জীবন কথা নিয়ে লেখা কাব্য। সৈয়দ সুলতানের পৌত্র মীর মুহাম্মদ সফি ‘নূর নামা’ পুঁথি রচনা করেন এবং দৌহিত্র কবি মুজাফফর ‘ইউনানী’ নামক কাব্য রচনা করেন। তিনি ‘সিনামা’ নামে অপর একটি কাব্যেরও রচয়িতা। কবি সুলতানের দ্বিতীয় অপর এক পৌত্র কাজী মনসুর অসংখ্য পদ রচনা করেছেন। এ কবি দু’জনের নিবাস পটিয়াই।
হুলাইন গ্রামের কবি ফাজিল মোহাম্মদ চৌধুরী ‘গজান্দর সার’ নামে আত্মবিবরণী কাব্য রচনা করে কবি খ্যাতি লাভ করেছেন। মূলতঃ তিনি একজন পেশাদার অনুলেখক ছিলেন। তার অনুলিখি অনেকগুলো সংগ্রহ হয়েছে। একই গ্রামভূক্ত বেলমুড়ি বাসী আরব চৌধুরীর পুত্র বক্সা আলী একজন পরিচিত পদকার ছিলেন সম্প্রতি ‘রাগমালা’ নামে তার একটি কাব্য আবিষ্কৃত হয়েছে।
আঠার শতকের কোন এক দশকে বৌদ্ধ কবি সুমন রচনা করেন ‘সুগত শাসন’ নামে একটি পা-লিপি আমাদের সংগ্রহে এসেছে। এটিও নবাবিষ্কৃত পা-ুলিপি। এটা বুদ্ধের চরিত বিষয় কাব্য। দেব গ্রাম নিবাসীমুক্তরাম সেন ও তার ভাই রইলাল সেন যথাক্রমে ‘মনসা মঙ্গল’ ও চ-ী মঙ্গল কাব্য রচনা করেন। ১৭১৯ সালে চনহারার জনৈক কবির চ-ী মঙ্গল নামে একটি কব্যের সংবাদ পাওয়া যায়। এসময় সফর আলী নামে অপর এক দরবেশী কবি জন্ম হয় পটিয়ার চরকানাই গ্রামে।
সম্প্রতি এ নিবন্ধের লেখক কর্তৃক ‘চৌতিষা’ ও দরবেশী পুঁথি নামে দু’খানি কাব্যের পা-ুলিপি আবিষ্কৃত হয়েছে। কবি রাম জীবন বিদ্যাভূষণ বাঁশখালীর সাধন পুরের অধিবাসী। তাঁর রচিত ‘মনসা মঙ্গল’ বিদ্যাভূষণী মনসা নামেও পরিচিত। ভবানী সংকর দাসের ‘চ-ীম-ল’ কাব্য খানা আকারে খুব বড়। ইদিলপুরবাসী কবি মুহাম্মদ আলী রচিত তিন খানা কাব্যের পরিচয় আছে। এগুলোর নাম হচ্ছে ‘হয়রাতুল ফেকাহ’, ‘শাহপরী মল্লিক জাতা’, এবং ‘হাসান বানু’। তাঁর আর একটি কাব্য সাত্তার চৌধুরী কর্তৃক সংগ্রহ হয়। এটি একটি নবাবিষ্কৃত কাব্য। বর্তমানে এটি বাংলা একাডেমির সংগ্রহে সংরক্ষিত।
মধ্যযুগের রোমান্স কাব্যগুলোর মধ্যে একটির নাম হচ্ছে “মৃগাবতী” কাব্য। এটির রচয়িতা কবি করমুল্লা। তাঁর নিবাস সীতাকু- থানার নিজাস পুরের মুরাদপুর। কবি মোহাম্মদ রাজা বখ্তপুর গ্রামে ১৬৯১ সালে জন্ম গ্রহণ করেন “তমীম গোলাল ও চর্তুন চিল্লাল” এবং মিশ্ররী জামাল’ নামে দু’খানি প্রণয়োপাখ্যান কাব্যের সন্ধান মেলেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর কবি মুনসী মোহাম্মদ মুকিম রচনা করেন ‘ফারদুল মুকতদী,’ ‘কালাকাম’, ‘মৃগাবতী’, ও আইয়ুব নবীর কথা। উনিশ শতকের সুপ্রসিন্ধ ও জনপ্রিয় কবি মুহাম্মদ মুকিম রচনা করেন ‘গোলে বকাওলী’।
কাজী আইনুদ্দিন বিরচিত কোরানের তফসির। পবিত্র কোরানে বর্ণিত তৈয়মুল লংয়ের রাজ শাসন ও ব্যক্তি জীবন আলোচনা প্রাপ্ত পা-ুলিপির লিপিকলি ১১৬৭ মঘি/১৮০৫ খিৃঃ/সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায় কবি অন্তত ১৮ শতকের লোক।
মহিলা কবি রহিমুন্নেসা সুলভ একজন অনুলেখিকা হলে তিনি একজন কবি। আলাওল বিরচিত পদ্মাবতী কাব্যের প্রতি লিপি তৈয়বীর সমাপ্তি পর তিনি তার আত্মপরিচয় তুলে ধরেন কয়েক পৃষ্ঠা ব্যাপী এ মহিলা কবি শুলকবহরের অধিবাসী জঙ্গলী শা (রাঃ) বংশধর।তার গুরু আবুল হোছেন (হুলাইন গ্রাম বাস)।
ঊনিশ শতকে যারা পুঁথি রচনা করে সাহিত্যের পুরানো ধারাকে চলমান রেখেছিলেন তাঁদের সংখ্যাও অর্ধশতাধিক। এ শতকের চল্লিশ জন কবি ও কাব্যের একটা তালিকা নি¤েœ তুলে ধরা গেল।
এ নিবন্ধে সব কবি ও কাব্যের পরিচয় উঠে আসেনি। নিবেদিত সংগ্রহ প্রেমিকদের দ্বারায় এ পর্যন্ত বিলুপ্তের হাত থেকে যেসব সাহিত্য নিদর্শন ব্যবস্থা হয়েছে তা থেকে অনুসন্ধানী গবেষকরা অনেক উপাদান খোঁজে বের করেছেন। চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে সংগৃহীত হয়ে অনেকগুলো পুঁথি-পা-ুলিপি দেশের নানা প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত রয়েছে; সেগুলোর যথাযথ বিবরণ প্রকাশিত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের অনেক নূতন নূতন উপকরণ পাওয়া যাবে। প্রকৃত প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাঙলা সাহিত্যে বৃহত্তর চট্টগ্রামের অবদান সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে হলে অনুসন্ধানী সংগ্রাহক-গবেষকগণের উদ্যোগে ও তৎপরতা বৃদ্ধির যথোচিত ব্যবস্থা করতে হবে।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে অসংখ্য হিন্দু পদাকারের ন্যায় বহু মুসলমান পদাকারের পরিচয় সাহিত্যের ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। যেমনÑষোড়শ শতাব্দীতে পদাকার আফজল আলী; চাদকাজী; শেখ কবির; শেখ মীর ফয়জুল্লাহ; সৈয়দ সুলতান; সৈয়দ মতুর্জা; সপ্তদশশতকে যাদের পেয়েছি-আলাওল; গরীব খান; ফতেখান মীর্জা কাঙ্গালী’, শাহআকবর’ মনুয়র’ সালেহ বেগ’ অষ্টাদশ শতকে কমর আলী প-িত’ খলিল, সৈয়দ নাসির উদ্দিন’, ফাজিল নাসির মোহাম্মদ আফজল, আবাল ফকির; আববাস, আমান; আলী রজা; কাজী বদিউদ্দিন। চাম্পা গাজী;চাসরু; জীবন আলী প-িত; দানিশ কাজী, পীর মোহাম্মদ; বকসা আলী প-িত; ডিকন,আলিমুদ্দিন; আলী মিঞা; দুলা মিঞা লালবেগ; ঊনবিংশ শতাব্দীর আস্কর আলী প-িত; সুন্দর ফকির; ওহাব ফকির; প্রমুখ শতাধিক পদকার গণ পদ সাহিত্য রচনা করে অমর হয়ে আছেন। অমর পুঁথি সংগ্রাহক বাংলার খ্যাতনামা মৌলিক গবেষক মুন্সী আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদের পরে যে সব পুঁথি সংগ্রাহকদের মাধ্যমে পুঁথি প্রাচীন পা-ুলিপি সংগ্রহ হয়ে দেশের সরকারী বেসরকারী নানা প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত রয়েছে; সে সবের একটা বিবরণী মূলক তালিকা অন্তত স্ব স্ব প্রতিষ্ঠান থেকে মুদ্রণ আকারে প্রকাশিত হলে জাতীয় ও আঞ্চলিক ইতিহাসের বহু উপকরণ বের হয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
লেখক : পুঁথি গবেষক