মশিউর রহমান আদনান

থিয়েটার সৃজনশীল শিল্পমাধ্যম বলেই এর পরিবেশিত বিষয় প্রায়শ সমাজ সচেতনতার জ্বলন্ত ছাপ রাখে। এটি সবাই জানেন যে শিল্প সাহিত্য মাধ্যম হিসাবে থিয়েটার অন্যন্য শিল্প সাহিত্য মাধ্যমগুলোর তুলনায় অনেক বেশী রাজনীতিপ্রবণ। সুতরাং রাজনীতিমনস্কতা থিয়েটারের দুটো প্রধান বৈশিষ্ট্যের একটিÑঅপরটি হচ্ছে সৃজনশীলতা। এই দুটি বৈশিষ্ট্যের একটির শূন্যতা হলে তাকে থিয়েটার না বলে প্রোপাগান্ডা বলা উচিত। থিয়েটার কখনোই প্রোপাগান্ডা বা পোস্টার নয়; এটি একটি সৃজনশীল ও রাজনীতিমনস্ক শিল্প-সাহিত্য মাধ্যম। এবং এ কারণেই থিয়েটার গুণগতভাবে দীর্ঘজীবী।
চট্টগ্রামে আধুনিক গ্রুপ থিয়েটার চর্চা হচ্ছে বাংলা ভাষায় হাজার বছরের পুরানো সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা/আন্দোলনের ধারাবাহিকতা। এই ধারাবাহিক সাহিত্য সংস্কৃতি-নাট্যচর্চা ক্রমাগত অতিক্রম করে চলেছে একগুচ্ছ উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে লেবেদফ সূচিত আধুনিক ইয়োরপীয় প্রসেনিয়াম থিয়েটার চর্চা, কোলকাতায় রঙ্গশালা ও সাধারণ রঙ্গশালার বিকাশ, ভারতীয় গণনাট্য সংঘের অভ্যুদয়, বাংলাদেশের মহান একুশের ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি প্রেক্ষাপটসমূহ অনেক সময় নাট্যচর্চাকে বেগবান করেছে, প্রণোদনা যুগিয়েছে এমনকি নাট্যচর্চাকে কখনোবা নাট্যান্দোলনে উত্তীর্ণ করেছে।
থিয়েটার একগুচ্ছ উপাদানের সমষ্টি। এই উপদানগুলোর মধ্যে মুখ্য হচ্ছে পা-ুলিপি (অবশ্য পা-ুলিপিবিহীন থিয়েটার ও মাইম ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী গড়ে ওঠেছে)। নাটককে সাহিত্য মাধ্যম হয়েও অন্যন্য অনেক শিল্প মাধ্যমের সহায়তা নিতে হয়। নাটকে বিভিন্ন মাত্রায় যুক্ত হয় অভিনয়, মূকাভিনয়, সংগীত, নৃত্য, রূপসজ্জা, আলোক প্রক্ষেপণ, নানাবিধ কারিগরী কলা-কৌশল। থিয়েটার প্রদর্শিত হয় প্রসেনিয়ামে অথবা উন্মুক্ত চত্বরে যেখানে নির্ধারিত, আমন্ত্রিত, দর্শনীর বিনিময়ে আসা, পথ-চলতি দর্শক সমবেত হয়ে দেখবেন এবং বাচিক পরিবেশনা হলে শুনবেন একটি পা-ুলিপিকে (কখনোবা পা-ুলিপিবিহীন) ঘিরে এক বা একাধিক অভিনেতা-অভিনেত্রী, শিল্পী, কলা-কুশলীদের শিল্পিত প্রয়াসে একটি জীবন্ত নাটকÑঅর্থাৎ থিয়েটার।
থিয়েটার সভ্যতার সমবয়সী। থিয়েটার প্রগতির পরিচয়পত্রÑইতিহাসের অন্যতম সুকুমার পাতা। থিয়েটার ইতিহাসের চড়াই-উৎরাই পেরুনো সভ্যতার এক ঘামঝরানো শৈল্পিক অভিযাত্রিকÑরক্তঝরানো নান্দনিক মুক্তিযোদ্ধা। থিয়েটারের ঘর্মাক্ত ও রক্তাক্ত ইতিহাসের পাতাগুলো জাজ্বল্যমান সাক্ষ্য দেয় যে থিয়েটার সর্বদাই প্রতিক্রিয়াশীলতার আজন্ম শত্রু আর তাই মানবিকতার ও জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সহযোগী শক্তি। প্রতিক্রিয়াশীলতা প্রায়শ তাকে পরাজিত করতে চেয়েছে, উৎখাত করতে চেয়েছে আবার কখনোবা চেয়েছে থিয়েটারকে ঢেলে সাজিয়ে পণ্যে পরিণত করতে। কিন্তু থিয়েটার দমেনি, শক্তি সঞ্চয় করে পুনরায় উঠে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করেছে এবং শেষ পরিণতিতে তার প্রগতি অভিমুখী অস্তিত্বের জয়গান ঘোষণা করেছে। মুনীর চৌধুরী ও সফদার হাশেমী থিয়েটারের আত্মত্যাগী ইতিহাসের অমর সাক্ষী।
উল্লিখিত থিয়েটারী মানসভুবন নিয়েই গড়ে উঠেছে চট্টগ্রামের থিয়েটার। আগেই বলেছি, চট্টগ্রামের থিয়েটার ইতোমধ্যেই একগুচ্ছ মাইলফলক অতিক্রম করে ফেলেছে। এগুলোই চট্টগ্রামের থিয়েটারের অনন্যতা। বাংলা থিয়েটারের সাধারণত্ব ধারণ করেই এসব অনন্যতা বা স্বতন্ত্রতা সামগ্রীকভাবে বাংলা থিয়েটার বা বিশ্ব থিয়েটারকে সমৃদ্ধ করেছে। আমরা এখন সেগুলো নিয়েই আলোচনায় অগ্রসর হব।
চট্টগ্রামেই পঞ্চাশ দশকে সবচাইতে বেশী অনুভূত হয় ভারতীয় গণনাট্য সংঘের প্রত্যক্ষ প্রভাব। মার্কসবাদী প্রভাবে গড়ে ওঠা পিপলস্ থিয়েটার বা গণনাট্য মানবসভ্যতার সমবয়সী থিয়েটারকে এক নতুন মাত্রায় উত্তীর্ণ করেছে। থিয়েটারের রাজনীতিমনস্কতা পেয়েছে একটি মূর্ত নির্দিষ্ট রূপ। শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থার কথা গণনাট্যের নাট্যকারদের মাধ্যমে তাদের পরিবেশিত নাটকগুলোয় বারবার সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখেছে। শোষণহীন সমাজব্যবস্থার পক্ষে, শ্রমিক-কৃষক-জনতার মুক্তির স্বপক্ষে সৃজনশীলভাবে নাটক রচনায় ব্রতী হন মার্কসবাদে আস্থাশীল নাট্যকার ও নাট্যশিল্পীবৃন্দ। ফ্রান্সে রোমা রোঁলা, জার্মানীতে ব্রেশট ও পিসকাটার, ভারতে গণনাট্যসংঘ, রাশিয়াতে মায়ারহোল্ড, চীনে পিকিং রেভ্যুলুশনারি অপেরা ইত্যাদি ব্যক্তি ও সংগঠন এই গণনাট্যের সূচনা করেন। ভারতীয় গণনাট্য সংঘের প্রথম ঐতিহাসিক প্রযোজনা বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’-এ কৃষক অত্যাচারের নির্মম চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এভাবেই গণনাট্যের নাট্যচর্চা নাট্যান্দোলনে উত্তীর্ণ হয়ে যায় সেই চল্লিশ দশকেই। বিষয়বস্তুগতভাবে থিয়েটার আরো বেশী গণ-মানুষের কাছে এসে ধরা দেয়। এই কাছে আসা আর শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থার পক্ষে থাকাটাই ভারতীয় গণনাট্য সংঘের বিপ্লবী অঙ্গিকার। এই অঙ্গীকারেই উজ্জীবিত ছিলেন ভারতীয় গণনাট্য সংঘের নাট্যকারবৃন্দ। এগিয়ে এলেন বিজন ভট্টাচার্য, শম্ভুমিত্র, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, সলিল দত্ত প্রমুখ ত্যাগী নাট্যজনেরা। কোলকাতার এই উজ্জীবনী গণমুখী বিপ্লবী জাগরণ বাংলাদেশ অঞ্চলে সবচাইতে বেশী দোলা দিয়ে যায় চট্টগ্রামকে। ১৯৫১ সালে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের প্রগতিশীল আদর্শে গড়ে ওঠে চট্টগ্রামের ‘প্রান্তিক নবনাট্য সংঘ’। ‘দুঃখীর ঈমান’, ‘ছেঁড়া তার’ ইত্যাদি প্রগতিশীল নাটক মঞ্চস্থ হয়। ‘প্রান্তিক’ চট্টগ্রামের নাট্যচর্চায় বা নাট্যান্দোলনে বিশেষ করে মঞ্চসজ্জায় ও অভিনয়ে আধুনিকতার অভিনবত্ব মাত্রা যুক্ত করে। নাট্যান্দোলনের পাশাপাশি ‘প্রান্তিক’-এর গণ-সংগীত স্কোয়াড গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষকে অধিকার সচেতন করে তোলার দায়িত্ব অত্যন্ত সফলতার সাথে পালন করতে থাকেন। ‘প্রান্তিক’-এর অভ্যুদয়ই চট্টগ্রামে নাট্যচর্চার প্রথম উল্লেখযোগ্য অনন্যতা।
চট্টগ্রামে গ্রুপ থিয়েটার চর্চা গড়ে ওঠার পেছনে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন রণাঙ্গণ থিয়েটারের অবদান অনস্বিকার্য। এটি আজ সকলেই নির্দ্বিধায় স্বীকার করে। যে চট্টগ্রামেই মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী শক্তি হিসেবে নাটক জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। বস্তুত পঞ্চাশ দশকের ‘প্রান্তিক’ ও একাত্তরের রণাঙ্গনের থিয়েটারকে একবার উপলব্ধিতে আনতে পারলে আমরা শনাক্ত করতে পারবো মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালের চট্টগ্রামের গ্রুপ থিয়েটার চর্চার বীজটিকে। ১৯৭১ সালের ১৫ মার্চ ঐতিহাসিক লালদিঘি ময়দানের উন্মুক্ত মঞ্চে অধ্যাপক মমতাজউদ্দিন আহমেদ রচিত ‘এবারের সংগ্রাম’ নাটকটি লক্ষাধিক দর্শকের উপস্থিতিতে মঞ্চস্থ হয়। একই মাসের ২৪ মার্চ চট্টগ্রামের প্যারেড ময়দানে প্রায় আশী হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে মমতাজউদ্দিন আহমেদ রচিত আরো একটি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক নাটক ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ মঞ্চস্থ হয়। পরবর্তীতে এই নাটক দুটি মুক্তযুদ্ধকালীন সময়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ও গ্রামে-গঞ্জে পরিবেশিত হতে থাকে। জীবন্ত দর্শকের সংগ্রামী উপস্থিতিতে লড়াকু অভিনেতা অভিনেত্রীদের শিল্পিত প্রয়াসে গড়ে ওঠে একাত্তরের রণাঙ্গণের জীবন্ত থিয়েটার। একাত্তরের চট্টগ্রাম জন্ম দেয় এক সংগ্রামী লাল-সবুজ নাট্যকার অধ্যাপক মমতাজউদ্দিন আহমেদ। এটিও চট্টগ্রামের একটি অন্যতম থিয়েটারী অবদান।
‘প্রান্তিক’ এর মার্কসবাদী ভাবাদর্শ এবং একাত্তরের লাল-সবুজ ভাবাদর্শ একাত্তর-পরবর্তী চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও শ্রমিক শ্রেণীর মতাদর্শ ভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপ থিয়েটারের অভ্যুদয়কে ত্বরান্বিত করে। ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম ক্লাব মিলনায়তনে চট্টগ্রামের প্রথম গ্রুপ থিয়েটার ‘থিয়েটার ’৭৩’ শহীদ জহির রায়হান রচিত এবং অধ্যাপক জিয়া হায়দার নির্দেশিত “ম্যাসাকার” মঞ্চায়নের মাধ্যমে দর্শনীর বিনিময়ে চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে আধুনিক গ্রুপ থিয়েটার চর্চার সূত্রপাত হয়। ঠিক এখানটাতে আমরা চট্টগ্রামের ভিন্নতা পাইনা। কেননা ঢাকায় এর আগেই দর্শনীর বিনিময়ে প্রসেনিয়ামে গ্রুপ থিয়েটার চর্চার সূচনা হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালের চট্টগ্রামের গ্রুপ থিয়েটার চর্চার অনন্যতা অন্যত্র পাওয়া যায়। উল্লেখ্য, স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে ১৯৭৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মিলন চৌধুরী রচিত ও নির্দেশিত এবং ‘গণায়ন’ পরিবেশিত নাটক ‘যায় দিন ফাওনো দিন’ বাংলাদেশে প্রথম মঞ্চস্থ পথ নাটক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বস্তুত ‘প্রান্তিক’ ও একাত্তরের লাল-সবুজ নাট্যচর্চা/নাট্যান্দোলনের আদর্শ হৃদয়ে উজ্জীবিত ছিল বলেই ‘গণায়ন’ নাট্যজনদের পক্ষেই এ রকম একটি সৃজনশীল রাজনীতিমনস্ক পথ নাটক মঞ্চস্থ করার অগ্রগামী ভূমিকাটুকু ইতিহাসের পাতায় সংযোজন করা সম্ভব হয়েছিল।
পঞ্চাশ দশকের ‘প্রান্তিক’ নবনাট্যান্দোলনের সাথে একাত্তরের লাল-সবুজ নাট্যান্দোলনই গণায়নকে প্রথম পথ নাটক মঞ্চস্থ করার সুমহান দায়িত্বে প্রণোদনা যুগিয়েছিল। আমার আলোচনায় চট্টগ্রামের তিন তিনটি উল্লেখযোগ্য অনন্যতার কথা তুলে ধরলাম।
এই তিনটি অনন্যতাসমূহ হল : পঞ্চাশ দশকের ‘প্রান্তিক’ সূচিত মার্কসবাদী নবনাট্য আন্দোলন, একাত্তরে অধ্যাপক মমতাজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে একাধিক লাল-সবুজ নাটকের মঞ্চায়নের মাধ্যমে সুমহান মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী শক্তিরূপে জনগণকে উদ্বুদ্ধকরণ এবং বাংলাদেশে পথ নাটক মঞ্চায়নের অগ্রপথিক হওয়ার গৌরব। এই তিনটি অনন্যতা আজ এই আলোচনায় তুলে ধরা হল। চট্টগ্রামের নাট্যচর্চা এরপর নানারকম চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে শিল্পকলা একাডেমী, টি,আই,সি, স্টুডিও থিয়েটার, ডি.সি. হিল মুক্তমঞ্চ, শিল্পকলা একাডেমি মুক্তমঞ্চে নিয়মিত তার সরব উপস্থিতির স্বাক্ষর বাচিক এবং নির্বাক ভঙ্গিমায় রেখেই চলেছে। আজ একটি চট্টগ্রাম আর্কাইভের প্রয়োজনীয়তার কথা সর্বত্র উচ্চারিত হচ্ছে। একটি চট্টগ্রাম আর্কাইভে উল্লিখিত অনন্যতাসমূহ আরো বিস্তারিতভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হতো।