বেগম মুশতারী শফী

আমি তখনও তাঁকে চোখে দেখিনি, শুধু বাঁশি শুনেছি। শুনতাম প্রায় প্রতি রাতেই। বিশাল বিশাল বৃক্ষের ছায়া ঘেরা নিবিড় নিঝুম শান্ত এলাকাÑ নন্দনকাননে। পাখ-পাখালির কিচিরমিচির ডাক আর ঝাঁক ঝাঁক বর্ণাঢ্য প্রজাপতির চঞ্চল ছুটোছুটি, সব মিলিয়ে স্বর্গোদ্যানের মতোই ছিল এলাকাটি। আজকের মতো নগরীর রাস্তা এত প্রশস্ত ছিল না। গড়ে ওঠেনি এত অট্টালিকা ঘর বাড়ি দোকান পাট।
বলছি সেই ৫৫ সালের কথা। বিয়ে হয়ে সবে এসেছি চট্টগ্রামে। স্বামী দন্ত চিকিৎসক। আমাদের বাসগৃহ এনায়েত বাজারে। এনায়েতবাজার আর নন্দনকানন, পাশাপাশি দুটি এলাকা। এনায়েত বাজারে কিছু ঘন বসতি থাকলেও নন্দনকানন ছিল একেবারেই ফাঁকা। ঘন সবুজ পাতার আড়ালে কোকিল ডাকতো। বৈশাখে কৃষ্ণ চূড়ার ফুলে লালে লাল হয়ে উঠতো পাহাড়ের সবুজ শরীর। পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায় জেলা প্রশাসকের বাংলো, বিভাগীয় কমিশনারের বাংলো, বন বিভাগের সদর দপ্তর এবং একটি পাহাড়ের ওপর মন্দির নাম-তুলসী ধাম। সংক্ষেপে এই পাহাড়গুলোকে বলা হয় ডিসি হিল, কমিশনার হিল, ফরেস্ট হিল ইত্যাদি। ফরেস্ট হিল আর তুলসী ধামের মাঝখানে একটি ছোট্ট টিলা। তার ওপর একটি ছোট্ট টিনের বাড়ি। নাম ‘নিভৃত নিলয়’। কী অপূর্ব মিল বাড়ির নামের সাথে চারদিকের পরিবেশের। এমন রোমান্টিক নামের বাড়িটির মালিক কে? তখনও জানি না। প্রায় প্রতি রাতেই বিশেষ করে গরমকালের রাত ৯টার পর চেম্বার বন্ধ করে ডা. শফী আর আমি নিশি ভ্রমণে বেরোতাম। হাঁটতে হাঁটতে বৌদ্ধ মন্দিরের সামনে দিয়ে ডিসি হিল, ফরেস্ট হিল পেরিয়ে চলে যেতাম তুলসী ধাম ছাড়িয়ে কাটা পাহাড়ের মাঝ দিয়ে অনেক দূর। ফরেস্ট হিলের কাছাকাছি গেলে প্রায় রাতেই শুনতে পেতাম বাতাসে ভেসে আসছে বাঁশিতে রাগ ঈমন, বাগেশ্রী অথবা পূরবীর মিষ্টি আলাপ। কোনো রাতে রাগ দরবারির ভাব গম্ভীর আলাপ আমাদের সম্মোহিত করতো, নিশি পাওয়ার মতো টেনে নিয়ে যেতো সেই ছোট্ট টিলাটির কাছে। আমরা বসে পড়তাম পাহাদের ঢালুতে দূর্বা ঘাসের ওপর কিংবা আরেকটু এগিয়ে তুলসী ধামে ওঠার সিঁড়ির ধাপে। আকাশ চুয়ে নামা জ্যোৎ¯œার প্লাবন কিংবা অমাবস্যার ঘুটঘুটে আঁধার রাতÑবাঁশির সুরে আরও মায়াবী হয়ে উঠতো। আলাপ থেকে লয়, আরো দ্রুত ধুন হয়ে বৃক্ষরাজির শাখায় শাখায় পাতায় পাতায় তুলতো শিহরণ। আমরা তন্ময় হয়ে যেতাম। বলতাম আমি, চলো না একবার ঐ বাড়িতে যাই, পরিচয় দিয়ে দেখে আসি শিল্পীকে।
শফী বলতো, দূর তাই কী হয়? তা ছাড়া এত রাতে গেলে শিল্পীর মগ্নতা কেটে যাবে। সাধনার ব্যাঘাত ঘটবে।
যাওয়া আর হয় না। তবে কিছুদিনের মধ্যেই শিল্পীর নাম জেনে যাই, সুচরিত চৌধুরী। চট্টগ্রামের খুব নামকরা শিল্পী-রেডিও আর্টিস্ট। রেডিও আমার কাছে তখন স্বপ্নের জগৎ। চট্টগ্রামে তখন কোনো রেডিও স্টেশন নাই। সারা দেশে একটি রেডিও স্টেশন ঢাকায়। শিল্পী সেখানেই গিয়ে বাঁশিতে রাগ-রাগিণী পরিবেশন করেন। এমন একজন শিল্পীকে দেখার আগ্রহ আরো বেড়ে যায়।
চট্টগ্রাম থেকে তখন যে ক’টি পত্রিকা বের হতো, তার মধ্যে একটি সিনেমা মাসিক ‘উদয়ন’। নিয়মিত পড়তাম। সম্পাদক ছিলেন রুহুল আমিন নিজামী। পত্রিকাটি খুব নাম করেছিল। ‘উদয়ন’ এর প্রতি সংখ্যায় সুরাইয়া চৌধুরীর ছোট গল্প এবং শুধু চৌধুরীর রোমান্টিক কবিতা আমাকে আকৃষ্ট করতো। ‘নভেরা’ নামের একটি গল্প পড়ে লেখিকা সুরাইয়া চৌধুরীকে দেখার আগ্রহ জাগে মনে।
আরো পরে সম্ভবত ৫৬ সালের মাঝামাঝি চীনা সাংস্কৃতিক দল এলো চট্টগ্রামে। তখন চট্টগ্রাম স্টেডিয়াম তৈরি হয়নি। সেখানে ছিল ধু ধু মাঠ। সেই মাঠে বিশাল মঞ্চ তৈরী করে চৈনিক সাংস্কৃতিক দল অনুষ্ঠান পরিবেশন করেছিল চারদিন ব্যাপী। শেষ দিন ছিল স্বাগতিক জেলা চট্টগ্রামের অনুষ্ঠান।
আর্য সঙ্গীত সমিতি ও ‘সঙ্গীত পরিষদ’ মাত্র এই দুটি সঙ্গীত বিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছিল তখন চট্টগ্রামে। আমি ছিলাম সঙ্গীত পরিষদের ছাত্রী। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে তালিম নিচ্ছি শ্রী শিব শংকর মিত্রের কাছে এবং একই সাথে সেতার শিখছি চুলু বাবুর (শ্রী সৌরিন্দ্র লাল দাশ) কাছে। সেই অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিষদ ষড়ঋতু ভিত্তিক উচ্চাঙ্গ নৃত্যানুষ্ঠান ছাড়াও একটি সমবেত অর্কেস্ট্রা পরিবেশন করবে। সেই অর্কেস্টায় আমাকেও অংশ নিতে হয়েছিল, তবে তানপুরায়।
প্রথম দিন রিহার্সালে গিয়ে দেখি বাঁশিতে নির্মল মিত্র ছাড়াও আরেকজন আছেন। যাঁকে এর আগে আর কখনো দেখিনি। সৌম্য সুদর্শন এক যুবক। খুব কম কথা বলছেন। চুলু বাবুর নির্দেশনায় রাগভিত্তিক অর্কেস্ট্রার বিভিন্ন যন্ত্রে নারী পুরুষ মিলিয়ে অংশ নিচ্ছি প্রায় কুড়ি বাইশ জন। বার বার তাল কেটে যাচ্ছে। ভুল হয়ে যাচ্ছে সুর। চুলু বাবু রেগে যাচ্ছেন। আমরা কেউ হাসছি, কেউ বা বিরক্ত হচ্ছেন। কিন্তু নতুন ওই মানুষটির মুখে কোনো বিরক্তি নেই, একই রকম প্রশান্ত ভাব। এক ফাঁকে সুযোগ পেয়ে নির্মলদাকে জিজ্ঞেস করলাম। উনি কে?
নির্দশনা বললেন, ‘কী আশ্চার্য! উনাকে চেনেন না? সুচরিত চৌধুরী।’ নাম শুনে দারুণ পুলকিত হলাম। এভাবে এত কাছে তাঁকে দেখব, এমন এক বিশাল অনুষ্ঠানে তাঁর সহশিল্পী হিসেবে অংশ নিতে পারব, স্বপ্নেও ভাবিনি কখনো। সেদিন নয়, পরদিন যেচে আলাপ করেছিলাম এখানে, আপনাকে দেখলাম মাত্র কাল। কিন্তু আপনার বাঁশি শুনছি অনেক দিন থেকে।
তিনি সামান্য হেসে বললেন, কোথায়? রেডিওতে? বললাম, না। আপনার বাড়ির সামনে। প্রায় প্রতি রাতেই যখন আপনি রেওয়াজ করেন।
তিনি সাগ্রহে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত পছন্দ করেন?’ ভীষণ। আমরা দুজনেই।
তিনি তখন হেসে বললেন, ‘আমিও কিন্তু আপনার স্বামীর নাম শুনেছি অনেক। ভালো দন্ত চিকিৎসক। কিন্তু আমার দাঁতে কোনো দোষ নেই, তাই তাঁর সাথে পরিচয়টা হয়নি। একদিন আসুন না আমার বাসায়, বাঁশি শোনাবো।’
আরো পরে। ৫৭ সালের কথা। আপোয়ার (অল পাকিস্তান উম্যান এ্যাসোসিয়েশন) প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে সম্পূর্ণ নারী চরিত্রের একটি নাটক মঞ্চস্থ করা হবে। কারণ মেয়েরা কেউ পুরুষ সাজতে রাজি নয়। কিন্তু এমন নাটক কোথায় পাওয়া যাবে? সারা শহরের লাইব্রেরিগুলো ঘেঁটে কোথাও পাওয়া গেল না অমন নাটকের বই। একদিন সেক্রেটারি ফিরোজা বারী বললেন, ‘নিশ্চিত হোন পাওয়া গেছে। এক ভদ্রলোক আমার অনুরোধে শুধু মাত্র নারী চরিত্র দিয়ে নাটক লিখছেন, তিনি নাটকটি পরিচালনাও করবেন।’
নির্দিষ্ট দিনে নাটকের পা-ুলিপি নিয়ে যিনি এলেন, তাঁকে দেখে আমি অবাক। সেই বাঁশির যাদুকর সুচরিত চৌধুরী। বিস্ময়ে প্রশ্ন বেরিয়ে এলো, ‘আপনি লেখেন নাকি?’
সুচরিত বাবু স্মিত হাসলেন। মৃদু স্বরে বললেন, হ্যাঁ। পাশেই ছিলেন সাজেনা চৌধুরী (বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেত্রী)। বললেন, ‘তুমি বুঝি জানো না? উনি কেবল বাঁশিতেই নয়, সাহিত্যেও সিদ্ধহস্ত। উদয়নে পড়েনি সুরাইয়া চৌধুরীর গল্প? উনারই ছদ্ম নাম। শুধু চৌধুরীও উনি।’
আমি আরেকবার চমকালাম। এত প্রতিভা-দেখে মনেই হয় না। তাঁর রচিত সেই নাটক ‘সাতরঙ’ সাতটি নারী চরিত্রের বিন্যাস। সুচরিত বাবুর পরিচালনায় সেই নাটকের একটি চরিত্রে আমি এবং অন্য একটি চরিত্রের সাজেনা চৌধুরীও অভিনয় করেছিলেন।
১৯৬৪ সালে আমার সম্পাদনায় চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত হলো নিয়মিত মহিলা মাসিক পত্রিকা ‘বান্ধবী’। সুচরিত চৌধুরী তখন ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন আমাদের সাথে। আমার বাড়িতে ঘরোয়া সাহিত্য আসরে তিনি যোগ দেন। কয়েকটি কবিতাও লিখেছেন বান্ধবীতে।
‘উদয়ন’ পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেছে। সম্পাদক রুহুল আমিন নিজামী তখন চট্টগ্রাম ছেড়ে ঢাকায় ‘স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স’ নামে একটি প্রকাশনা ও পরিবেশনা সংস্থা গড়ে তুলেছেন। সুচরিত চৌধুরী ও বেলাল মোহাম্মদের মাধ্যমে রুহুল আমিন নিজামীর সাথেও পরিচিত হলাম। (বেলাল ভাই ছিলেন ‘বান্ধবী’র নেপথ্য পরিচালক ও উপদেষ্টা।) নিজামী তাঁর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমগ্র পাকিস্তানে ‘বান্ধবী’ পরিবেশনার দায়িত্ব নিলেন।
এভাবেই সুচরিতদা আমাদের কাছের মানুষ হয়ে গেলেন। তাঁর সেই গৃহ ‘নিভৃত নিলয়ে’ সাহিত্যের আড্ডায় গিয়েছি অনেকবার। তাঁর বিশিষ্ট বন্ধু মাহবুবুল আলম চৌধুরীর দেওয়ান বাজারের বাসভবনে কখনো, কখনো হাসনাত আবদুল হাই সাহেবের সরকারী বাংলোয় (তিনি তখন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক) অনুষ্ঠিত ঘরোয়া সাহিত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছি। একটা বিষয় লক্ষ করতাম যিনি সকল আড্ডার শিরোমণি, যাঁকে নিয়ে সবাই মেতে উঠতেন, সেই সুচরিত বাবুকে দেখতাম কথা বলছেন কম। যেটুকু বলছেন, তা নি¤œস্বরে যে, কান পেতে শুনতে হয়। হাসছেন তিনিও, তবে কখনোই উচ্চকণ্ঠে নয়। এটা ছিল তাঁর স্বভাবের বৈশিষ্ট্য। সুচরিত দার সাথে আরো ঘনিষ্ঠ হলাম স্বাধীনতাত্তোর চট্টগ্রাম রেডিওতে আমার চাকুরি জীবনে।
তিনি রেডিওর ক্যাজুয়েল আর্টিস্ট, বাঁশিতে ক্লাসিক্যাল বাজান। আমি স্টাফ আর্টিস্টÑস্ক্রিপ্ট রাইটার। প্রোগ্রাম করতে এলে রেকর্ডিং শেষে চলে আসতেন প্রায়ই আমার রুমে। কথা হতো রেডিওর অনুষ্ঠান নিয়ে। কখনো লেখালেখি নিয়ে। ইতিমধ্যে তার ‘আকাশে অনেক ঘুড়ি’সহ বেশ কয়েকটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে ঢাকা থেকে, তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারও পেয়েছেন।
আমারও কয়েকটি বই বেরিয়েছে। রেডিওতে প্রচার হয়েছে আমার লেখা কয়েকটি নাটক। সেই সব বই ও নাটকের চুলচেরা আলোচনা করি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তিনি নিয়মিত লিখতেন সংবাদ সাময়িকীর পাতায়। তাঁর লেখা ছাপা হলেই পড়ে ফেলি। দেখা হলে বলি সেই লেখা সম্পর্কে, তিনি খুশী হতেন। স্থানীয় পত্রিকায় তেমন লিখতেন না। কেন লেখেন না? প্রশ্ন করলে স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, স্থানীয় পত্রিকাগুলো লেখকের সম্মানী দেয় না, তাই লিখি না।’
বলেছিলাম, কিন্তু এখন তো দিচ্ছে।
তিনি বলেছিলেন, তা বার বার ধর্ণা ধরে নিজে গিয়ে চেয়ে আনতে হয়। ও আমার দ্বারা সম্ভব নয়।
তাঁর যেমন ছিল প্রখর আত্মসম্মান বোধ, তেমনি ছিলেন তিনি ভীষণ স্পর্শকাতর।
রেডিওতে একক উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের নির্ধারিত সময় ১৫ মিনিট। একবার সুচরিত দা বলে বসলেন, ‘বাঁশিতে ১৫ মিনিটে ক্লাসিক্যাল বাজানো সম্ভব নয়। ওতে গোঁজামিল দেয়া হয়। আমাকে কমপক্ষে ২০ মিনিট সময় দিতে হবে।’ সঙ্গীত বিভাগের প্রযোজক বললেন, তা সম্ভব নয় দাদা। অন্য সবাই তো ১৫ মিনিটে গাইছেন, বাজাচ্ছেন, আপত্তি করছেন না।
সুচরিতদা অপমানিত বোধ করলেন, রেগে টং হলেন। ‘আমি আপনাদের অনুগত দাস নই’ বলেই বাঁশি নিয়ে হন হন করে বেরিয়ে গেলেন। আর এলেন না। প্রতি মাসে তাঁর নামে অনুষ্ঠানের চুক্তিপত্র পেলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করতে লাগলেন।
নাজমুল আলম সাহেব যখন চট্টগ্রাম রেডিওর আঞ্চলিক পরিচালকÑতাঁর অনুরোধে সুচরিত চৌধুরী বেতার নাটক লিখতে শুরু করেন। তাঁর একটি নাটক ‘পার্কের কোণ থেকে’ প্রযোজনা করবার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। ঐ নাটকটি এর আগে সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন প্রযোজনা করেছিলেন। দ্বিতীয়বার প্রযোজনার দায়িত্ব পড়লো আমার ওপর। আমি সুচরিত দার ভয়ে তটস্থ ছিলাম। যদি তাঁর মনঃপূত : না হয়, আমাকেই নেবেন এক চোট। এটা ছিল তখন বেতারে আমার চতুর্থ নাটক প্রযোজনা। এর আগে আরো তিনটি নাটক প্রযোজনা করেছি। তবু ভয়ে ভয়ে ছিলাম। কারণ নাটকটি প্রতীকধর্মী হাসির নাটক। কিন্তু না। পরদিন সকালেই সুচরিত দা আমার বাসায় হাজির হয়ে আমাকে অবাক করে দিলেন। এমন উৎফুল্ল চিত্তে প্রশংসা করেছিলেন যে, আনন্দে আমি কিছুক্ষণ কথা বলতে পারিনি।
তিনি সংবাদ সাময়িকীর পাতায় একবার ধারাবাহিক লিখতে শুরু করলেন চট্টগ্রাম শহরে বিভিন্ন এলাকার নামকরণের নেপথ্য কাহিনী। এ কাহিনীগুলোর মধ্যে রয়েছে কিছু ইতিহাস। কিছু কিংবদন্তী।
সে সময় একদিন আঞ্চলিক পরিচালক সেলিমুদ্দিন আহমদের কক্ষে বসে কথা হচ্ছিল বেতার নাটকের পা-ুলিপি সংকটের বিষয় নিয়ে। সেলিমুদ্দিন সাহেব সুচরিতদাকে অনুরোধ করলেন রেডিওর জন্যে আবার কিছু নাটক লিখতে। সুচরিতদা বললেন, আমি এখন একটি উপন্যাস লেখা নিয়ে ব্যস্ত আছি, রেডিওর নাটক লেখা সম্ভব নয়। আমি বললাম, আপনার পক্ষে এখনই সম্ভব। কাহিনীর জন্যে ভাবতে হবে না, অনেকগুলো কাহিনী আপনার তৈরী করাই আছে, কেবল সংলাপ বসিয়ে যাবেন। সুচরিত দা জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন। বললাম, সংবাদের ঐ গল্পগুলোকেই বেতার নাটক তৈরী করে দিন না।
আমার এ প্রস্তাবে সেলিমুদ্দিন সাহেব সোৎসাহে বললেন, ‘ম্যাডাম উত্তম প্রস্তাব দিয়েছেন। দাদা, আপনার ওই কিংবদন্তী গল্পগুলোকেই নাট্যরূপ দেন তো সিরিজ নাটক হিসেবে প্রচার করবো।’
সুচরিত দা গম্ভীর মুখে বললেন, দেখি। সে সময় প্রতি শুক্রবার দুপুরে আধ ঘণ্টা ‘গল্প থেকে নাটক’ প্রচার করা হতো রেডিওতে, সুচরিতদা পরের মাস থেকে ‘ধ্বনি প্রতিধ্বনি’ শিরোনামে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার নাম ভিত্তিক বেতার নাটক লিখতে শুরু করলেন এবং তা প্রতি শুক্রবারে প্রচরিত হলো এক নাগাড়ে প্রায় ৪ মাস।
তাঁর পিতা শ্রী আশুতোষ চৌধুরী ছিলেন চট্টগ্রামের লোককাহিনী সংগ্রাহক ও গবেষক। সে সব কাহিনীর অনেকগুলোই তিনি সুরারোপ করে মঞ্চ করে সফল নৃত্যনাট্যে পরিণত করেছেন এবং একাধিকবার মঞ্চস্থ করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘মলকা বানু ও মনু মিঞা’, ‘আমিনা সোন্দরী’, ‘কাফন চোরা’, ‘নসর মালম’, ইত্যাদি।
সুচরিত চৌধুরী আমৃত্যু সঙ্গীত ও সাহিত্যের নিরলস শ্রম ব্যয় করেছেন তাঁর সেই সুন্দর গৃহ কোন ‘নিভৃত নিলয়’ এ বসে একান্ত নিবিড় নিরবে। লিখেছেন অসংখ্য গল্প, নাটক, গান, নিবন্ধ ও উপন্যাস। কিন্তু কোন অনুষ্ঠানেই তাঁকে সভাপতি প্রধান অতিথি বা বক্তা হয়ে মঞ্চে উঠতে দেখিনি। দেখেছি দর্শকের সারিতে নিশ্চুপ বসে থাকতে। মঞ্চে উঠার আমন্ত্রণ নিয়ে যাঁরাই তার কাছে গেছেন, তাদেরকেই তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। কেন এমন করতেন? এ প্রসঙ্গে তাঁকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেছিলেনÑ‘ওসব আমার ভালো লাগে না। মঞ্চে অতিথি-টতিথি হয়ে বক্তৃতা টক্তৃতা করতে গেলে সৃষ্টির প্রতি আগ্রহ কমে গিয়ে নিজের প্রতি অর্থাৎ ব্যক্তি প্রচারের দিকে আগ্রহ বেড়ে যায় বলেই আমার ধারণা।’
দেখা হলেই প্রশ্ন করতাম, দাদা, এখন কী লিখছেন? একদিন বললেন, ‘এখন গীতি নিবন্ধ লিখছি।’
গীতি নিবন্ধ কী রকম জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, আমার প্রতিটি গান কোন ভাবের ওপর রচিত তার একটি ব্যাখ্যা সহ গানের স্বরলিপি। শুনেছি বাংলা একাডেমি তাঁর সেই গীতি নিবন্ধ গ্রন্থটি বই মেলায় প্রকাশ করবে।
চিরবিদায়ের কিছুদিন আগে আমার দেখা হলো রেডিও অফিসে। বেশ কয়েকদিন পরে দেখা। কথা হলো দেশের রাজনীতি, সম্প্রদায় সম্প্রীতি, সন্ত্রাসসহ নানা প্রসঙ্গ নিয়ে। তার মধ্যে শারীরিকও ছিল। বলেছিলেন, ৬৪ বছর বয়স আমার পূর্ণ হতে চললো, ডায়বেটিস, ব্লাডপ্রেসার বা অন্য কোনো রোগই নেই আমার। কেবল চোখে ক্যাটারাক পড়েছিল, অপারেশন করে কনটাক্ট লেন্স লাগিয়েছি চোখে। এখন ভালো। আলাউদ্দিন ললিতকলা একাডেমির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আমার ‘আমিনা সোন্দরী’ নৃত্যনাট্যটি মঞ্চায়নের মহড়া নিয়ে বেশ ব্যস্ত আছি। চোখের কারণে কিছুদিন লেখালেখি থেকে বিরত ছিলাম। ‘আমিনা সোন্দরী’ মঞ্চায়ন শেষ হলেই আবার শুরু করবো লিখতে।
না, তিনি আর লেখা শুরু করতে পারলেন না। কোন হানাদার রোগ অলক্ষে এসে তাঁকে তুলে নিয়ে গেল। ৫ জানুয়ারি ১৯৬৪ সকাল ৯টায় সংবাদ পেলাম, তিনি নেই। তক্ষুণি ছুটে গেলাম মনে অবিশ্বাস নিয়ে ‘নিভৃত নিলয়’ এর সেই লেখা-শিল্পীকে দেখতে। দেখলাম, তিনি তাঁর নিত্য রাতের শয্যাতেই শুয়ে আছেন দু’চোখ বন্ধ করে। কী ভীষণ প্রশান্তি তাঁর সারা মুখে। যেন স্বপ্ন দেখছেন। এক ঘর মানুষ। কারো মুখেই কথা নেই, সকলেই বিস্ময়ে বিমূঢ়। শুনলাম, রোজকার মতো আজো সুচরিতদা প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছিলেন।
মীরা বৌদি তাঁর শয্যাপাশে বসেছিলেন চুপচাপ। আমি তাঁর পিঠে আলতো করে হাত রাখতেই বৌদি আমাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠলেন। তাঁর কপালের তেল মাখা শেষ সিঁদুর আমার সারা মুখেÑগালে মাখামাখি হয়ে গেল। যেন সবাইকে বুঝিয়ে দিল, আমাদের দু’জনার হৃদয়ের ক্ষরিত রক্তের রঙ লাল এবং আমরা দু’জন এই মুহূর্তে অভিন্ন, বেদনায় একাকার।
২১ জানুয়ারি ছিল সুচরিত চৌধুরীর ৬৪তম জন্মদিবস। মৃত্যুর মাত্র ১৫ দিন পরে এলো তাঁর জন্মের শুভ দিনটি। সম্ভবত আমার মতোই আর কেউ এর আগে জানতে পারেনি চট্টলার এই কৃতী সন্তানের জন্মের তারিখটি। মৃত্যুর পর ফুলকিতে প্রথমবার পালিত হলো তাঁর এই জন্মদিন। বক্তারা যখন তাঁর গুণগান গেয়ে বক্তৃতা করছিলেন, আমি তখন সেই সভার এক কোণে বসে নির্নিমেষ তাকিয়েছিলাম তাঁর ছবিটির দিকে। সহসাই যেন শুনতে পেলাম সুচরিতদা দারুণ অভিমানে বলছেন, ‘জীবনে যারে কভু দাওনি মালা, মরণে কেন তারে দিতে এলে ফুল?’ দেখলাম বলতে বলতে তিনি এই সভা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন ধীরে, দূরে কোথাও, বহু দূরে-অজানা কোন গহীন বনের ভিতর দিয়ে, নিবিড় নিভৃত অন্ধকারে অন্য কোনো এক নিলয়ে। এবং সেই সুদূর থেকেই ভেসে আসছে তাঁর সেই বাঁশির করুণ সুর বেহাগের কান্না হয়ে।