নিজাম সিদ্দিকী

শহরের যান ও জনজটের তেমন ঘনঘটা নেই এখানে। থেকে থেকেই দু একটি গাড়ি, রিকশা ছুটে যাচ্ছে। পথচারীর আনাগোনাও হাতেগোণা। সড়কের পাশে লতাপাতায় জড়াজড়ি করা একটি বাড়ি। বাড়ির দোতলায় ওঠার দুটি পথ রয়েছে। একটি ভবনের লাগোয়া পাকা সিঁড়ি। আর অপরটি স্টিলের পাতের কৃত্রিম সিঁড়ি। একেবেঁকে ওপরে উঠে গেছে।
একতলার একটি কক্ষের দেয়াল জুড়ে থরে থরে সাজানো আলোকচিত্র। বড় একটি টেবিলের চারপাশে অনেকগুলো চেয়ার পাতা রয়েছে। অপর কক্ষটিতে ক্যামেরার প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি রাখা হয়েছে।
পাকা সিঁড়ি দিয়ে দোতলার দরজা ঠেলে ভেতরের ঢুকতেই চোখ আটকে গেলো। রিকশার হুডে (ছাউনি) ব্যবহৃত রঙ-বেরঙের প্লাস্টিক মোড়ানো অভ্যর্থনা টেবিল। এর মুখোমুখি খোলামেলা একটি মিনি ক্যাফে। এর একপাশে রিকশা গদির আদলে (বসার জায়গা) লম্বা লম্বা টুল এবং টেবিল বিছানো। অপর পাশে রয়েছে কয়েকটি সাদামাটা টেবিল চেয়ার। সেখানে জনা পাঁচেক তরুণ আয়েশি ভঙ্গীতে বসে খাওয়া দাওয়া আর আড্ডায় মশগুল। তাদের সামনে স্বচ্ছ কাচের বাইরে দেখা যাচ্ছে সবুজ গাছগাছালিতে ঢাকা একটি পাহাড়ি ভূমি। কক্ষের ওপরের অংশে চারপাশের দেওয়াল সাজানো হয়েছে সরু করে কাটা রিকশার হুডের প্লাস্টিকের ঝালর দিয়ে। রান্না ঘর, ওয়াশ রূমের সামনে সাটানো রয়েছে রিকশা চিত্র (রিকশার পেছনে যেভাবে নায়ক-নায়িকা বড় বড় মুখের ছবি আঁকা থাকে)। মাথার ওপরে গাছের ভারি পাল্লায় ঝুলানো রয়েছে হারিকেন আকৃতির একগুচ্ছ বাতি।
ক্যাফের পাশের কক্ষটিতে রয়েছে কসফারেন্স হলের সজ্জা। লম্বা টেবিলের এপাশ-ওপাশে চেয়ার বসানো। দেওয়ালে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন আলোকচিত্র। চেয়ার-টেবিল গুটিয়ে নিয়ে মাঝে মাঝে মেঝেতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সাহিত্য আড্ডা, আবৃত্তি, নৃত্যানুষ্ঠান, প্রকাশনা অনুষ্ঠান, আলোচনার পাশাপাশি চলে চিত্র প্রদর্শনী, গুণীজন সংবর্ধনা, শিল্পকর্ম প্রদর্শনীসহ নানা আয়োজন।
শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি, সাংবাদিক, শিল্পবোদ্ধা তরুণ-তরুণী অনেকেরই পদচারণায় মুখর থাকে নগরের সার্সন রোডের এই বাড়িটি। এর নিরিবিলি মনোরম পরিবেশ তাঁদের কাছে টানে। অবসরের সময়টুকু তাঁরা এখানেই ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন। সময় পেলেই ছুটে আসেন এখানে। কখনো পরিবার পরিজন নিয়ে। কখনো বন্ধুদের সম্মিলনে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘হাটখোলা’।
ফটোব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা আলোকচিত্রী শোয়েব ফারুকীর বড় বোনের বাড়ি। এর নিচতলায় তাঁর ফটোগ্রাফিক স্টুডিও এবং প্রশিক্ষণকেন্দ্র। এটিকে কালচারাল কমপ্লেক্স হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়েই এগিয়েছেন বলে জানান। গ্রামীণ হাটের মতোই এখানে প্রকৃতির অবারিত উদারতায় শিল্পী-সাহিত্যিকদের মুখরিত আনোগোনা, আড্ডা, খাওয়াদাওয়া, সাংস্কৃতিক আয়োজনকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এর সাজ সজ্জায়ও গ্রামীণ আবহ বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন।
যেভাবে হাটখোলার শুরু
হাটখোলার গড়ার প্রস্তাব দিয়েছেন কবি-সাংবাদিক ইউসুফ মুহাম্মদ। প্রথমে নগরের চকবাজার এলাকায় এটি গড়ে তোলার কথা হয়। পরে আলোকচিত্রী শোয়েব ফারুকী সার্সন রোডে তাঁর ফটোব্যাংক আর্ট গ্যালারিকে ঘিরেই এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোর গড়ার ইতিবাচক দিক তুলে ধরেন। আর এতে একমত হয়েই তাঁদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন।
‘নো দাই আর্ট’ অর্থাৎ ‘শিল্পকে জানো’-এ স্লোগান নিয়ে চালু হয় হাটখোলা। এর নামকরণ করেছেন প্রকৌশলী সলিমুল্লাহ।
শুরু থেকেই হাটখোলার সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করে আসছেন কবি ইউসুফ মুহাম্মদ। আর সভাপতি ছিলেন শোয়েব ফারুকী। এ বছরের শুরুতে সভাপতির দায়িত্বে পরিবর্তন এসেছে। নতুন সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন শ ম বখতিয়ার। শোয়েব ফারুকী হাটখোলার সার্বিক তদারকিতে রয়েছেন । হাটখোলার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এর ৩৫ জন কনট্রিবিউটিং মেম্বার (দাতা সদস্য)।
২০১৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর হাটখোলার জন্ম। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্পী রফিকুন্নবী। অতিথি হিসেবে ছিলেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের পরিচালক রুবানা নাহিদ, কবি-সাংবাদিক আবুল মোমেন ও শিল্পকলা একাডেমির সাবেক পরিচালক প্রয়াত সুবীর চৌধুরী।
মুগ্ধতার নানা কথা
এখানে যারাই এসেছেন তারাই মুগ্ধ হয়েছেন বলে জানা যায়। হাটখোলার প্রশংসা করেছেন নোবেলজয়ী ড. ইউনূস। এখানে তাঁর উপস্থিতি হয়েছে আলোচনা অনুষ্ঠান। তিনি হাটখোলা নামটি যেমন পছন্দ করেছেন তেমনি এর অবস্থান এবং গঠনশৈলী থেকেও মুগ্ধ হয়েছেন।
চীনের ১০ সদস্যের একটি আলোকচিত্রী (ফটোগ্রাফার) দল এ বছরের জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে চট্টগ্রামে আসেন। তারা হাটখোলায় এসে এখানকার মনোরম আয়োজন থেকে অভিভূত হয়ে পড়েন। তাই পর পর দু’বার এসে ঘুরে যান বলে জানা যায়।
হাটখোলায় যা পাওয়া যায়
কিছু বিশুদ্ধ ও ভালো জিনিস খাওয়ানোর ইচ্ছে থেকেই এখানে রাখা হয়েছে ঘানিভাঙা তেল, পাটালি গুড়, গাওয়া ঘি, ঢেকি ছাটা চাল, খাঁটি মধু প্রভৃতি। রয়েছে একতারা, বাঁশি, দোতারার মতো কারুপণ্যের সম্ভার।
অভ্যর্থনা টেবিলের সামনের দেওয়ালে সাজানো বুক শেলফে রয়েছে শিল্প-সাহিত্যের ক্ষুদা মেটানোর মতো বেশ কিছু বই, সঙ্গে গুটি কতক সিডিও।
হাটখোলার খাবারদাবার
এখানে সুলভে বিভিন্ন মুখরোচক খাবার পরিবেশন করা হয়। এ প্রসঙ্গে শোয়েব ফারুকী বলেন, ‘আমরা এখনো ভর্তুকি দিয়ে খাবার পরিবেশন করছি।’
হাটখোলার খাবারের আয়োজনে রয়েছে বাংলা, ইন্ডিয়ান, থাই, চাইনিজ, স্পেনিশ, ম্যাক্সিকান, ডেজার্ট প্রভৃতি। সঙ্গে রয়েছে জুস, চা, কফিসহ বিভিন্ন সফট ড্রিংক।
শায়র গিফট শপ
দোতলায় ভেতরের সিঁড়ি গলিয়ে এক ধাপ নিচে নামলে হাতের বামে চেয়ার-টেবিল, কম্পিউটার, প্রিন্টার আর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিয়ে সাজানো একটি অফিস কক্ষ দেখা যাবে। সেখান থেকে সামনের দিকে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলেই চোখে পড়বে কাঁচের বেস্টনী দেয়া একটি ঘর। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘শায়র গিফট শপ’। ভেতরে রয়েছে রঙ-বেরঙের রকমারি গিফট সামগ্রী।
খোলার সময়
সবার জন্য উন্মুক্ত হাটখোলা। সকাল ১১ টা থেকে রাত ১১ টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে চালু থাকে। সপ্তাহের প্রতিদিনই খোলা, কোনো বন্ধ নেই।