হুমায়ুন কবির কিরণ, জাকারিয়া চৌধুরী

‘যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ’Ñপ্রবাদটিকে কি সবসময়ের জন্য সঙ্গী করা যায়? কারণ এর উল্টোটাওতো হতে পারে। পারে, তবে বাংলাদেশের সঙ্গীত এর ব্যতিক্রম। সবাই আশা করে, গতকালটি যেমনই গেলো যাক, সামনের দিনটি যেন আরও ভালো যায়। বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের শুরুটা যেমনই হোক এগিয়ে চলাটা কিন্তু দারুণ। বাংলাদেশের ইতিহাসে ব্যান্ড মিউজিশিয়ানরা এমন কিছু চমক উপহার দিয়েছেন যা আজও সঙ্গীত পিপাসুদের মনের খোরাক মিটিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষতা সত্ত্বেও টাইম মেশিন কিন্তু আজও বহুদূরের স্বপ্ন। যদি টাইম মেশিন সত্যিই থাকতো, যদি জীবনের গল্পকে রিওয়াইন্ড করা যেতো, তবে সবাই সুখের অতীতকে বোধ হয় বর্তমানে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতেন।
একটা সময় ব্যান্ড এলবামের জোয়ার ছিল, আর আজ? কোথায় হারালো সেই দিন, আক্ষেপ আর আক্ষেপ। মো. আলমগীর চৌধুরী সেই আক্ষেপটাকে আরও বাড়িয়ে দিলেন। চট্টগ্রামের অন্যতম ব্যান্ড সাসটেইন-এর এই লিডার বলেন, ডাউনলোড প্রবণতা আমাদের সঙ্গীত শিল্পকে দিনের পর দিন ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে। এখনও সময় আছে, সরকার কিছুটা আন্তরিক হলে ব্যান্ড অঙ্গন আবারো হারানো দিনে ফিরে যাবে। তিনি সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান, অনলাইনে যারাই গান নিয়ে হাজির হচ্ছে তাদের যদি সঠিক পন্থায় নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হয় তবে আগের মতোই শ্রোতারা নিত্য নতুন ব্যান্ড এলবাম পাবেন। একটি গান সৃষ্টিতে একজন মিউজিশিয়ান বা একটি দলের অক্লান্ত পরিশ্রম থাকে, থাকে সাধনা এবং লগ্নী করা অর্থও। যিনি একটি গান অনেক সাধনার পর, অর্থ ব্যয় করে উপহার দিলেন তার গানই আপনি শুনবেন বিনে পয়সায় ডাউনলোড করে! এ ধারাতো দিনের পর দিন চলতে পারে না। বাস্তবতা হলো, এটাই চলছে আর আমরা দিনের পর দিন হারিয়ে ফেলছি ভালো গান, ভালো ব্যান্ড ও শিল্পী।
সেই যে ট্রানজিস্টারের যুগ, ছোট্ট একটা যন্ত্রকে সঙ্গী করে বিশ্ব জানার চেষ্টা, বিনোদন আস্বাদের চেষ্টা। সেই ট্রানজিস্টারই শুধু অতীতের গর্বে হারায়নি, হারিয়েছে রেকর্ড-এর যুগ। যারা সঙ্গীত প্রিয় তাদের কাছে ফিতা ক্যাসেটের স্মৃতি এখনো টাটকা। তবে অডিও মিডিয়ার ফিতা যুগ পেরিয়ে সিডি-যুগটাও আজ অতীত প্রায়। তবে ফিতাযুগে যেভাবে অডিও এলবাম প্রকাশিত হতো আজ সে সবই স্বপ্ন, এখনও গানের এলবাম বের হয়, তবে প্রাণটা কোথায়। মনে আছে প্রতি উৎসবে ব্যান্ড এলবামসহ অনেক এলবাম বের হতো। গান পিপাসুরা বছরের উৎসবের সময়টার জন্য অপেক্ষায় থাকতেন। কিন্তু এক পাইরেসি, নকলের চেষ্টা, বাজারে এলবাম বের হওয়ার সাথে সাথে অনলাইনে বিনাপয়সায় ডাউনলোড করার প্রবণতা অডিও শিল্পের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। যে কারণে আজও এলবাম বের হয়, কিন্তু শ্রোতাদের মনের ক্ষুধা মেটে না। কারণ পাইরেসির কারণে শ্রোতাপ্রিয় শিল্পীরা যে অন্যপথে হাঁটছেন। অদ্ভুত এক আঁধার আজ তরুণ মনে, জীবনের প্রতিটি ক্ষণে। কোথাও জীবনের স্বপ্ন নেই। আছে কেবল জীবনকে সাফল্যে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধার পরিকল্পনা। এমন পরিস্থিতি ঘোচাতে প্রয়োজন উত্তাল কোন সুর, বাদ্যময় কোন গান, যা আবারও তরুণদের স্বপ্নচারী করবে গেয়ে উঠতে জীবনের জয়গান। সঙ্গীত শিল্পীরা এই প্রয়োজন মিটিয়ে আসছেন দীর্ঘকাল ধরে। কখনো হার্ড বিটের গান, কখনো সফট বিট আবার কখনো শুধু যন্ত্র সঙ্গীত তরুণ মনের পিপাসা মেটাচ্ছে। তবে গান কি শুধু তরুণদের জন্য? মোটেই নয়, গানের কোন বয়স নেই, সবাই গান ভালোবাসেন, শুনতে পছন্দ করেন।
সকল শিল্পের প্রাণ সঙ্গীত, যা শিল্পের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। সুরের কোন সীমানা নেই, ভাষা নেই, কাল নেই। সুর সকলকে বিমোহিত করে। তবে এ সুরের ছন্দ-লয়-তালের তারতম্যে গড়ে ওঠে একেকজনের ভালো ও মন্দ লাগা। সম্ভবত এ কারণেই গানের এত প্রকৃতি ও ধারা। এই ধারার মাঝে তরুণদের খুবই প্রিয় ব্যান্ড গানের ধারাটি। মঞ্চে কোন শিল্পীর ড্রাম বাজানো, কিংবা গীটার হাতে বিশেষ কোন কাজ অনেকের মাঝে ভালো লাগার আবেশ ছড়িয়ে দেয়। সাথে সুরেলা কন্ঠের শিল্পীর গান হলেতো কথাই নেই, সবাই লুফে নেয়। প্রয়াত আযম খান ঠিক এ কাজটিই করেছিলেন। কথা নেই বার্তা নেই, কোথা থেকে আধুনিক সব যন্ত্র নিয়ে সুরের ছন্দে বিভোর করেছিলেন তিনি সকলকে। ‘উচ্চারণ’ ব্যান্ড নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে সঙ্গীতপ্রিয় তরুণ-তরুণীর কাছে ‘গুরু’ বলে পরিচিত আযম খান বাংলাদেশের সঙ্গীতের ধারাকেই পাল্টে ফেলেছিলেন। অনেকে তখন নাক সিঁটকালেও আযম খানের দেখানো পথে হেঁটেছে অনেকেই। যে কারণে আজ বাংলাদেশের ব্যন্ড সঙ্গীত অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কোন অংশে পিছিয়ে নেই চট্টগ্রামও। বর্তমানে বাংলাদেশে অনেক নামী ব্যান্ড বা শিল্পী আছেন যাদের শুরু এই চট্টগ্রামে। এই নামের শুরুতেই বলতে হয় সোলস ব্যান্ডের কথা। সোলস’র মতো একসাথে অনেক তারকা শিল্পীর জন্ম এদেশের আর কোনও ব্যান্ডই দিতে পারেনি।
স্বাধীনতার আগে ও পরে ঢাকায় বেশ ক’টি ব্যান্ডের জন্ম হলেও চট্টগ্রামে ১৯৭২ সালে নতুন স্বপ্নে বিভোর কিছু তরুণ শুরু করেছিলো ‘সুরেলা’ নামে একটি দল। অনেকের মতে চট্টগ্রামে প্রথম ব্যান্ড এই সুরেলা।
সেই সময় এর নেতৃত্ব ছিলেন সাহেদ-উল-আলম। ১৯৭৪ সালে ‘সুরেলা’ নাম পরিবর্তিত হয়ে ‘সোলস রাখা হয়। সাজেদ, লুলু ও রণি বড়–য়া হলেন এই ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। শুরুতে পাশ্চাত্যের ইংরেজি গান নির্ভর দল থাকলেও, ধীরে ধীরে তার থেকে বেরিয়ে আসে তারা। ক্রমশ মৌলিক গানের দিকে ঝোঁক বাড়ে তাদের। ফলও পেতে দেরি হয়নি। প্রতিষ্ঠার ক’বছর পর ‘সোলস’-এ যোগ দেন আজকের প্রখ্যাত শিল্পী তপন চৌধুরী ও আহমেদ নেওয়াজ। এরপর যোগ দেন নকীব খান। নকীব খান ‘সোলস’ এ যোগ দেওয়ার পর নিজেদের সুর ও কথায় গান কম্পোজ করা শুরু হয়। এই ব্যান্ডটি অল্প দিনের মধ্যে পাশ্চত্যের সঙ্গে দেশীয় সুরের সংমিশ্রণে নিজস্ব এক সংগীত ধারা সৃষ্টি করে। নিজস্ব কম্পোজিশন ছাড়াও ‘সোলস’ সেই সময় বাংলা চিরায়ত গান, ইংরেজি, লালন এবং ভাওয়াইয়া গান পরিবেশন করতো। ধীরে ধীরে এই ব্যান্ড হয়ে ওঠে বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যান্ড। উপহার দেয় মেধাবী কিছু শিল্পী আর অবিস্মরণীয় কিছু গান। যা বহমান আছে আজও। আজ এই সোলস ব্যান্ডের অন্যতম দুই সদস্য হলেন পার্থ বড়–য়া ও নাসিম আলী খান।
এখানে বলে রাখা ভালো, স্বাধীনতার আগে পরে শুরুর দিকে ‘ব্যান্ড সংগীত’ শব্দটি সাধারণের কাছে পরিচিত ছিল না। তখন সবাই এই ধারাটিকে পপগান বা পপ-সংগীত হিসেবেই জানতো। মূলত ষাটের দশক থেকে চট্টগ্রামে পপগানের চর্চা শুরু হয়। অনেকের মতে চট্টগ্রামের প্রথম ব্যান্ডটি হলো লাইটনিংস। তবে কেউ কেউ বলেন, লাইটনিংস নয়, চট্টগ্রামে প্রথম ব্যান্ড হলো জিংগা শিল্পগোষ্ঠী। এ প্রসঙ্গে কথা হয় বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনের অন্যতম এবং চট্টগ্রামের ব্যান্ড সঙ্গীতের পথিকৃৎ জ্যাকব ডায়াসের সাথে। তিনি বলেন, সবার প্রথমে আসে জিংগা পরে লাইটনিংস।
সঙ্গীতবোদ্ধা ও ইতিহাস রচয়িতাদের মতে ‘জিংগা’ একটি পারিবারিক ঘরানার ব্যান্ড। ১৯৬৬ সালে আসে লাইটনিংস। ফরিদ রশীদ, নিও মেন্ডেস, নোয়েল মেন্ডেস গড়ে তুলেছিলেন লাইটনিংস ব্যান্ডটি। বুচি ও শাকিল পরে যোগ দেন। লাইটনিংস ইংরেজি গান আর জিঙ্গা মূলত বাংলা গান পরিবেশন করত। স্বাধীনতার পর বালার্ক পরবর্তীতে সোলস, স্পাইডার, রিদম ৭৭, আরো বেশ কয়েকটি ব্যান্ড সরাসরি স্টেজ পারফরমেন্স ও বিটিভিতে অনুষ্ঠান করেন। স্বাধীনতার পূর্বে চট্টগ্রামে লাইটনিংস আধুনিক বাদ্যযন্ত্র নিয়ে পাশ্চাত্য ঢং-এ নামকরা কিছু ইংরেজি গান নিয়ে আসেন শ্রোতাদের সামনে এবং লাইটনিংস’র সব সদস্য অসম্ভব দক্ষতার সাথে পাশ্চাত্য যন্ত্রপাতি রপ্ত করতে সক্ষম হন। জ্যাকব ডায়াস বলেন, স্বাধীনতার আগে কোন স্টেজ শো ছিল না, সবই ছিল ঘরোয়া। স্টেজ শো আসে মূলত স্বাধীনতার পর এবং প্রথম স্টেজ শো করে আজকের সোলস।
আগেই বলা হয়েছে সোলসের কথা-এদেরও বলা যায় চট্টগ্রামের প্রথম ‘প্রকৃত ব্যান্ড’ (শুরুটা হয় সুরেলা দিয়ে)। তবে বাংলাদেশের প্রথম ব্যান্ড কোনটি তা নিয়ে দ্বিমত আছে। কারও কারও মতে, ‘আন্ডার গ্রাউন্ড পিস লাভারস’ স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম ব্যান্ড। স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম ব্যান্ড বিতর্কের এ ব্যান্ডটির উদ্যোক্তা ওমর খালেদ রুমী। স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম ব্যান্ডের স্বীকৃতি না পেলেও প্রথম কনসার্ট আয়োজন করে আন্ডার গ্রাউন্ড পিস লাভারস। ১৯৭২ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশনে ব্যান্ডটি প্রথম টিকিট কনসার্ট করে।
চট্টগ্রামে কবে কোথায় প্রথম কনসার্টটি হয়েছিল সে সম্পর্কে পরিষ্কার কোন ধারণা না পেলেও জিংগা ও লাইটনিংসই যে শুরু করে সেটা নিশ্চিত। বলা যায় চট্টগ্রামর ব্যান্ড সঙ্গীতের পথা চলা শুরু এই দু’টি ব্যান্ডের হাত ধরেই। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আরো কয়েকটি ব্যান্ডের জন্ম হয়। এর মধ্যে দ্যা মন্ডলস্’ ‘ব্লু হারমনি’ ও বালার্ক এর নাম উল্লেখযোগ্য। জ্যাকব ডায়াস এর নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করা ব্যান্ড ‘স্পাইডার’ও সেই সময় তরুণ মনে ঝড় তুলেছিল। এখানে বলে রাখা ভালো সোলসের বাইরে একবারেই চাটগাঁইয়া কোন ব্যান্ড হিসাবে প্রথম এলবাম বের করে এই স্পাইডার, সময়টা ছিল ১৯৮৬ সাল।
স্বাধীনতার পরে সোলস বাংলাদেশে ব্যান্ড মিউজিকের জগতে বিপ্লব নিয়ে আসে এবং নকীব খান (বর্তমান রেনেসাঁ) কি-বোর্ডে বাংলাদেশে অন্যতম স্থান দখল করেন। পরবর্তীতে সোলসের সদস্য বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে নতুন নতুন ব্যান্ড গড়ে তোলে। বর্তমান লিজেন্ড আইয়ুব বাচ্চু (এলআরবি) দক্ষতার সাথে প্রথম সারির ব্যান্ড হিসাবে শীর্ষস্থান দখল করে আছেন। রেনেসাঁর নকীব খান ও পিলু খান এই সহোদর অসম্ভব সফলতার সাথে ‘রেনেসাঁ’ ব্যান্ড নিয়ে বাংলাদেশে মেলোডি ধারার গান দিয়ে শ্রোতাদের মন জয় করেছেন। চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া ‘ফিলিংস’ পরবর্তীতে ‘নগর বাউল’ জেমস সারাদেশে তথা ভারতবর্ষে সাড়া জাগায়। সোলসের তপন চৌধুরী অত্যন্ত সুরেলা কণ্ঠে গান গেয়ে ব্যান্ড জগতে চির স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন। ব্যান্ড ছেড়েছেন তিনি বহু আগে কিন্তু আজও তপন চৌধুরীর কণ্ঠ অসম্ভব শ্রোতাপ্রিয়। চট্টগ্রামে ব্যান্ড সংগীতে যাদের অবদান রয়েছে তাদেরও মধ্যে রয়েছেনÑতপন চৌধুরী, কুমার বিশ্বজিৎ, নকীব খান, আইয়ুব বাচ্চু, আহমেদ নেওয়াজ, সুব্রত বড়ুয়া রনি, মোহাম্মদ আলী, পার্থ বড়ুয়া, নাসিম আলী খান, সেলিম জাহান, মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন, জেকব ডায়াস, মো. গিয়াস উদ্দিন, এসআই টুটুল, পিবলু খান, নোয়েল মেন্ডেস, মুজিবুল আলম খান জাহিদ, শাহীন, জাহেদ, এরশাদ, জুয়েল, সুজন, আসাদ, জাবেদ, আকাশ, মিজান, সেলিম, আমিন, নেসার, শিমুল, রাজীব, মাহাবুব, তসলিম, বদরুল হাসান টিটু, আসাদ, সুমন চৌধুরী প্রমুখ।
এদের মধ্যে উল্লখযোগ্য এলআরবি, সোলস, রেনেসাঁ, নগর বাউল। আইয়ুব বাচ্চু ও নাসিম আলী খান সোলস-এ যোগ দেওয়ার পর ইংরেজি গান পরিবেশনায় একটা আমূল পরিবর্তন আসে। আইয়ুব বাচ্চু নতুন নতুন অনেক গান কম্পোজ করেছিলেন যা এখনও ‘সোলস’ ভক্তদের আপ্লুত করে। পরবর্তীতে ১৯৯৩’তে আজকের পার্থ বড়–য়া ‘সোলস’ এ যোগ দেন। তাদের নিজস্ব সৃজনশীলতা আলোকিত করেছে চট্টগ্রামের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে। ১৯৭৫-এর পর চট্টগ্রামে আত্মপ্রকাশ করে আরো কিছু ব্যান্ড। এর মধ্যে ফিলিংস, রানার সেভেন্টি ফাইভ, রিদম সেভেন্টি সেভেন, জ্যামিং, নাট ক্র্যাকার্স, রিসেন্ট রোল উল্লেখযোগ্য। আশি ও নব্বই দশকে চট্টগ্রামের ব্যান্ড সংগীতে নতুন এক জোয়ার আসে। ম্যাসেজ, জেনারেশন, ব্লু হরনেট, রিদম, রেইনবো, স্পার্ক, রুটস, ব্লুবার্ডস, সাসটেইন, ডিউড্রপস, সফট টাচ, রিভার্ব, ইন চিটাগাং, এ-৭৭, রিভার্ব, নভেম্বর ইলেভেন ইত্যাদি। বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে সমসাময়িক জনপ্রিয় শিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ, তপন চৌধুরী, নকীব খান, আইয়ুব বাচ্চু, পার্থ বড়–য়া, জেমস, এদের প্রত্যেকেরই উত্থান চট্টগ্রামের ব্যান্ড থেকেই।
সঙ্গীতবোদ্ধাদের কাছে জ্যাকব ডায়াস অত্যন্ত পরিচিত মুখ। গুণী এই শিল্পী শুধু চট্টগ্রামই নয় বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনকে অনেক সমৃদ্ধ করেছেন। ১৯৬৫ সালে তাঁর মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে বেসুরো শিল্পী গোষ্ঠী। নামে বেসুরো হলেও দলটির সমসাময়িক গান শ্রোতাদের মাঝে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। এর দু’বছর পর জ্যাকব ডায়াস গঠন করেন অ্যাপোলো অর্কেস্ট্রা। স্বাধীনতা-উত্তরকালের স্পাইডার পরে পরিচিতি পায় দেশজুড়ে। ১৯৬৭ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত সঙ্গীত পরিচালক ও সুরকার হিসেবে প্রচুর কাজ করেছেন জ্যাকব ডায়াস। চট্টগ্রামে তিনিই প্রথম আধুনিক ইনস্ট্রুমেন্ট ব্যবহার করেন। ১৯৬৬ সালে আনা ফার্পিজা বি-বোর্ড, তোশিবা ড্রামস, রেইনল্ড গিটার কৌতূহলের বিষয় ছিল সঙ্গীতানুরাগীদের কাছে। চট্টগ্রামের প্রথম রেকর্ডিং স্টুডিওটিও প্রতিষ্ঠা পায় তারই হাতে। লালখানবাজারে ১৯৮৭ সালে গড়া টু-ট্র্যাকের সেই স্টুডিওতে প্রচুর গান রেকর্ডিং হতো শুরুতে। যদিও বছর তিনেক ছিল তার বয়স। এ সময়ের জনপ্রিয় শিল্পীদের অনেকেই জ্যাকব ডায়াসের হাতে গড়া। শেফালী ঘোষ, শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব, শাক্যমিত্র বড়–য়া, প্রবাল চৌধুরী, তপন চৌধুরী, নকীব খান, কুমার বিশ্বজিৎ, জেমস, পার্থ বড়–য়া, আবদুল মান্নান রানা, সৈকত দাশ, নোয়েল ডি সিলভা, সাইফুদ্দিন মাহমুদ খানসহ অনেকেই পেয়েছেন তার সাহচর্য। বলা হয়ে থাকে, চট্টগ্রামে এমন কোনো ব্যান্ড নেই যেখানে জ্যাকবের শিষ্য নেই।
১৯৮৭ সালের দিকে মেয়েদের নিয়ে একটি ব্যান্ড গঠনের কথা ভাবেন তিনি। তার ক’জন ছাত্রী এবং কলেজপড়–য়া ক’জনকে নিয়ে ১৯৯০ সালের ১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলায় ‘বিজয় মঞ্চে’ সফল এক আয়োজন অবশেষে জন্ম দেয় ব্লু-বার্ডসের। এটিই চট্টগ্রামে মেয়েদের প্রথম ব্যান্ড।
চট্টগ্রামে অনেকগুলো ব্যান্ড ছিল এবং বর্তমানেও আছে। তবে কোন সংগঠন ছিল না। ২০০৯ সালের ২০ ডিসেম্বর ৮৪টি ব্যান্ডকে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল চট্টগ্রাম মিউজিক্যাল ব্যান্ড এসোসিয়েশন (সিএমবিএ)। এর মধ্যে অবশ্য প্রতিটি ব্যান্ড স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল না। বর্তমানে এই সিএমবিএ’র সদস্য প্রায় দুই’শতাধিক ব্যান্ড। নামে থাকলেও অধিকাংশ ব্যান্ডই কিন্তু হারিয়ে গেছে। কিছু কিছু ব্যান্ড চেষ্টা করছেন তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে। চট্টগ্রামের উল্লেখযোগ্য ব্যান্ডগুলো হলোÑএ-৯৯ ব্লু-হর্নেট, অরণ্য, আর্তনাদ, অন্তিম, অন্বেষণ, আমুস, এ্যামিথিউর, বিন্দু, ব্লাক হার্ট, বর্ণ, ব্লাক ওয়ারিয়র্স, ব্লু বার্ডস, ব্লাক সিন, বিস্বর্গ, বনসাই, কেকটাস, কেসকাড, ড্রীমস, দ্রাঘিমা, দিশারী, দ্বিতীয় পৃষ্ঠা, ডিবাইন, ডেজার্ট, ইস্কপ, আর্থ, এনার্জি সোল, ফেরারী, ফেইথ, প্রিডম, জিপসী, হেভেন, হার্ট রিলেশান, ইন চিটাগাং, জোবিয়াল, এলএসবি, লাইনার্স, মিলেনিয়াম, মুখোশ, মেনগ্রোব, নেক্সাস, নভেম্বর-১১, অব ট্রাক, অসময়, প্লেজার রক, প্রান্তর, রিভার্ব, রিসেন্ট, রোজেস, স্পাইডার, স্পার্ক, সিক্রোসেন্ট, স্টীলার, সাসটেইন, ষড়ঋতু, সোলডার্স, স্বপ্ন, স্ট্রীম, সোয়েভ, সরগম, স্পার্ক, স্যাডো, স্কাই টাচ, সীমান্তহীন, রুটস, রাইজিং ফোর্স, রেইনড্রপস, রিয়ার, রেইন, রেইন ম্যাকার, রেসিটাল, রেবিলিয়াস, ট্রিও, ট্রাংগেল, তৃষ্ণার্ত, তেপান্তর, টানট্রিক, তিরন্দাজ, টিউন, উইংস, ওয়্যারিওর, উইলস, ওয়্যারফেয়ার, ওয়াইআরবি, ফিউচার, নাটাই, বন্দর ইত্যাদি।
চট্টগ্রামের ব্যান্ড সঙ্গীতের একাল সেকাল নিয়ে কথা হয় নেক্সাস ব্যান্ডের ম্যানেজার ও সিএমবিএ-এর প্রচার সম্পাদক মো. আমিনের সাথে। তিনি একবাক্যে চট্টগ্রাম-এর ব্যান্ড সঙ্গীতের চলমান ধারায় তার হতাশা প্রকাশ করেন। মো. আমিন বলেন, পুরো বাংলাদেশের মধ্যে চট্টগ্রাম হলো ব্যান্ড সঙ্গীতের সূতিকাগার। এখানে অনেক প্রতিভাবান মিউজিশিয়ান ছিলেন, আছেন। কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ক্রমেই মলিন হয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রামের ব্যান্ড। তারপরও কিছু কিছু ব্যান্ড তাদের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তিনি মিডিয়ার ঔদাসিন্য এবং প্রতিষ্ঠিত অনেক সিনিয়রের সহযোগিতার অভাবকেও চট্টগ্রামের ব্যান্ড’র অগ্রযাত্রাকে পিছিয়ে রেখেছে বলে মনে করেন। মো. আমিন বলেন, ঢাকার ব্যান্ডগুলো সহজেই নিজেদের প্রকাশ করার মতো প্লাটফরম পায়। বিভিন্ন মিডিয়ায় তারা লাইভ কনসার্ট করার সুযোগ পায়। কিন্তু চট্টগ্রামের ব্যান্ডগুলো সেই সুযোগ পায় একেবারেই কম। তাছাড়া, ঢাকায় গিয়ে কোন মিডিয়ায় লাইভ কনসার্ট করাও সবসময় সম্ভবপর হয়না। চট্টগ্রামে এমন কোন ভিজ্যুয়াল মিডিয়া হলে এবং তারা নতুন নতুন ব্যান্ডকে নিজেদের ‘প্রকাশের’ সুযোগ দিলে চট্টগ্রামের ব্যান্ড সঙ্গীত কতটা সমৃদ্ধ সেটার প্রমাণ মিলবে। এলবাম প্রকাশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেখুন অনেক ব্যান্ডই আছে যারা এলবাম প্রকাশ করতে চায়। কিন্তু পৃষ্ঠপোষকরা এই খাতে কোন অর্থলগ্নী করতে চান না। যার কারণে, খরচ সাপেক্ষ হওয়ায় অনেকেই তাদের গানকে শ্রোতাদের কাছে নিয়ে যেতে পারছেন না। এছাড়া সংগীতচর্চার পাশাপাশি পড়াশোনা ও চাকরি সামলাতে হয় অনেক মিউজিশিয়ানকে। আছে পরিবারের চাপও। অধিকাংশ ব্যান্ডের সদস্য ছাত্র, কেউ কেউ চাকরি ও ব্যবসায় যুক্ত। শুধু ব্যান্ডের রোজগার দিয়ে চলা সম্ভব নয়। নির্দিষ্ট রোজগারের রাস্তাটা তাই খোলা রাখতেই হয়। যে কারণে ব্যান্ড মানে আজ অনেকটা ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর’ ব্যবস্থা করা!
অনলাইনে ডাউনলোড করার প্রবণতা ব্যান্ড মিউজিকের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের সর্বত্র শিল্পীরা এ নিয়ে সরকারের হস্তক্ষেপ চাইলেও অগ্রগতির চিত্র সামান্যই। যে কারণে আজ কোন এলবাম বাজারে এলে মুহূর্তের মাঝেই বিনা পয়সায় অনেকে পুরো এলবাম ডাউনলোড করে নেন। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন, যে ব্যান্ড এলবাম বাজারে ছেড়েছে তারা। এ বিষয়ে সাসটেইন-এর মো. আলমগীর চৌধুরী যথার্থই বলেছেন, ‘দেখুন কিছুদিন আগেও চট্টগ্রাম শহরে অনেক অডিও প্রতিষ্ঠান ছিল, আর আজ..? ডাউনলোড করার মানসিকতার কারণে ব্যবসায়ীরা এই অডিও ব্যবসা ছেড়ে অন্য ব্যবসায় ঝুঁকছেন। এর খেসারত দিচ্ছে ব্যান্ড শিল্পীরা সাথে শ্রোতারাও। সবাই বলছেন সরকারের ত্বরিত হস্তক্ষেপই পারে বিনা পয়সায় ডাউনলোড করার প্রবণতা রুখতে। যা কিনা দেশের সঙ্গীতাঙ্গনের প্রাণ জিইয়ে রাখতে সময়ের দাবি।’
এই মোষ তাড়াতে গিয়েই, শত প্রতিকুলতার মাঝেও চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি ব্যান্ড তাদের গানগুলোকে ফিতা আকারে ক্যাসেটে কিংবা কমপ্যাক্ট ডিস্কে নিয়ে এসেছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্পার্ক, স্টিলার, সাসটেইন। এরা বেশ কয়েকটি এলবাম নিয়ে শ্রোতাদের কাছে এসেছে। প্রত্যেকটি এলবামই তরুণদের মনে জায়গা করে নিয়েছিল। কিন্তু সেই ধারা থমকে গেছে। ২০০৯ সালে বাজারে আসা সাইসটেইনের ‘রহস্য’ই চট্টগ্রামে সর্বশেষ এলবাম বলে জানা যায়। তবে মতান্তরে ‘রিসেন্ট’ নামের একটি ব্যান্ড এলবাম প্রকাশ করেছিল ২০১৫ সালে বলে জানা যায়।
এর মধ্যে ব্যান্ড সঙ্গীতপ্রিয়দের জন্য ভালো খবর হলো ১৯ জুলাই, ২০১২ সালে যাত্রা শুরু করা ‘নাটাই’ আসছে এলবাম নিয়ে। অচিরেই তাদের গানের এলবাম বাজারে আসবে বলে জানা গেছে। এ লক্ষ্যে তারা স্টেজ শো’র পাশাপাশি নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন। তাছাড়া সাসটেইন-এর মো. আলমগীর চৌধুরী জানান, আসছে রোজার সময়ই তারা তাদের পরবর্তী এলবাম উপহার দেবেন শ্রোতাদের। তাদের সবক’টি গানই চূড়ান্ত, এখন শুধু শ্রোতাদের হাতে তুলে দেওয়ার অপেক্ষা।
‘দলছুট’ ব্যান্ডের ভোকাল ও গিটারিস্ট জনপ্রিয় শিল্পী বাপ্পা মজুমদার প্রায়ই নতুনদের ব্যান্ড সঙ্গীতে আসাটাকে স্বাগত জানান। আবার ক্ষেত্র বিশেষে তিনি তাদের অনেকের অনুশীলন ও চটজলদি তারকা হওয়ার চেষ্টার মানসিকতার সমালোচনা করেন। এটা অনেকেই করেন। কারণ আজকের পার্থ বড়–য়া, আইয়ুব বাচ্চু, হামিন ও শাফিন আহমেদ, জেমস’রা অনেক বাধার পাহাড় ডিঙ্গিয়েই গানের জগতে নিজেদের আলাদা করে তুলেছেন। চট্টগ্রামের কথাই ধরুণ, সাসটেইন, নাটাই, বন্দর কিংবা নেক্সাস ব্যান্ডগুলো একদিনেই আজকের অবস্থানে আসেনি। ব্যান্ড সদস্যদের অক্লান্ত প্ররিশ্রম, ভালো কিছু করার মানসিকতা এদেও সাফল্যের অন্যতম সূত্র। সেই সূত্র ধরে আজও অনেকে সামনে ছোটার চেষ্টা করছেন। আবার নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে, সফটওয়্যার ব্যবহার করে কেউ কেউ এলবাম বের করছেন। ফলাফলÑযারা নিজেদের সঁপে দিয়েছেন গানে তারা সফল হচ্ছেন আর অন্যরা হারিয়ে যাচ্ছেন দ্রুতই। যে কারণে বাপ্পা মজুমদার বারবার বলেন, ‘আপনারা গান করুন, বেশি বেশি গান করুন তবে দয়া করে অটো টিউন ব্যবহার করবেন না।’ কণ্ঠকে পরিশিলিত না করে যারা মিউজিকে আসার চেষ্টা করেন তারাই অটো-টিউন ব্যবহার করেন বেশি। আবার প্রযুক্তির নতুন এই ধারার মাধ্যমে নতুন কিছু উপহার দিতেই অনেক নামিদামি শিল্পীও সফটও্যয়ার ব্যবহার করেন। এতে করে সত্যিকারে গানের যে আস্বাদ তা থেকে শ্রোতারা বঞ্চিত হচ্ছেন।
মো. আমিনের ভাষায় চট্টগ্রাম মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি অনেক সমৃদ্ধ। এখানে প্রতিভাবান মিউজিশিয়ানের কোন অভাব নেই। তবে ব্যান্ড সঙ্গীতকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সবার আগে বন্ধ করতে হবে পাইরেসি। এরপরও প্রযুক্তির অসৎ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। সর্বোপরি মিডিয়া ও পৃষ্ঠপোষকদের এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে ২০০০ সালের পর গানের জগতে যে পালাবদল তা একদিন দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হবে। রেকর্ড, ফিতা ক্যাসেট এরপর কমপ্যাক্ট ডিস্ক, স্মৃতির পাতায়Ñতারপর..?