সুব্রত বড়–য়া রনি

এবারে আমাদের কয়েকটি দর্শক-শ্রোতা নন্দিত গান দিয়ে শুরু করিÑ‘নদী এসে পথ সাগরে মিশে যেতে চায়’, ‘মুখরিত জীবনের চলার বাঁকে,’ ‘ফরেস্ট হিলের এক দুপুরে’, ‘কলেজের করিডোরে দেখেছি’, ‘মনে করো’, ‘কান্দে ক্যানে মন’, ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’ এসব গান আমি বা আমাদের পুরনো যারা এক সময় ‘সোলস-এ ছিলামÑতাদের জন্য অনেক নস্টালজিক। গানগুলোর পেছনে অনেক স্মৃতি উঁকি দিয়ে যায়।
যে গান শোনেন না, সে ভালোও বাসতে পারে না। ভালোবেসে যুদ্ধে যাওয়ার এক রক্তাক্ত ইতিহাস বাঙালি রচনা করে একাত্তরে। স্বাধীনতা পরবর্তী তারুণ্যের অবক্ষয়ের ক্রান্তিলগ্নে ‘সুরেলা’র জন্ম। সময়টা ১৯৭২। নতুন নতুন স্বপ্নে বিভোর কয়েকজন তরুণ কোন এক সন্ধ্যায় তৎকালীন বিখ্যাত ব্যান্ড ‘লাইটেনিংস’ এর পরিবেশনা দেখতে দেখতে নিজেদের মাঝে আবিষ্কার করে সুরের মাদকতা। এই অনুভবের অনুপ্রেরণায় সায়েদ স্বপ্ন দেখতে শুরু করে একটি সঙ্গীত দল গড়া যায় কিনা। সায়েদ পূর্ব পরিচিত বন্ধু লুলু ও আমাকে তার পরিকল্পনার কথা জানায়। শুরুতে আমি, লুলু ও সায়েদ কিছু এ্যাকোস্টিক বাদ্যযন্ত্র দিয়ে শুধুমাত্র যন্ত্রসঙ্গীত অনুশীলন করতে থাকি। সেই থেকে শুরু হয় আমাদের পথ চলা। ‘সুরেলা’ নামে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যক মাহবুব-উল-আলম এই নামকরণ করার জন্য প্রস্তাব দেন। পরবর্তীতে ১৯৭৪-এ ‘সুরেলা’ নামটি পরবর্তিত হয়ে ‘সোলস্’ নামে যাত্রা শুরু করে। সোলস্ শুরুতে কণ্ঠ সঙ্গীতের চেয়ে পাশ্চাত্য যন্ত্রসঙ্গীত চর্চায় মনোনিবেশ করলেও ধীরে ধীরে পাশ্চাত্যের সাথে দেশীয় সুরের সংমিশ্রণে নিজস্ব একটি সঙ্গীত ধারার সৃষ্টি করেছে। এর পরে যুক্ত হয় তপন চৌধুরী ও আহমেদ নেওয়াজ।
১৯৭৪-এ ‘সোলস্’ এর জন্য ইলেকট্রনিক বাদ্যযন্ত্র আমদানী করা হয় প্রখ্যাত সাংবাদিক মইনুল আলম ও ওয়াদুলুল ইসলামের সহযোগিতায়। তখন আমরা এইসব বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলাম না। সেই সময় আমাদের অগ্রজ তসলিম ভাই (দৈনিক পূর্বকোণ সম্পাদক স্থপতি তসলিম উদ্দিন চৌধুরী) যথেষ্ট সহযোগিতা করেন। তিনি গভীর রাত পর্যন্ত নতুন বাদ্যযন্ত্রগুলো কিভাবে সংযোগ এবং বাজাতে হয়, তা দেখিয়েছিলেন। সেই সময়ে তসলিম ভাইয়ের কাছে আমরা যা শিখেছিলাম তা কখনো ভোলার নয়। মনে পড়ে ১৯৭৬-এ তসলিম ভাই আয়োজন করেছিলো ইটঊঞ-এর একটা ক্লাস রুমে ‘সোলস্’ এর পরিবেশনা।
নানা প্রতিকূলতা ও সহযোগিতার মাধ্যমে আজকের ‘সোলস্’। মাঝে মাঝে পেছনে ফিরে তাকালেই মনে পড়ে স্মৃতিময় অনেক ঘটন-অঘটন। ১৯৭৫-এ নকীব খান দলে যোগ দেয়। সে বাজাতো কী বোর্ড। মূলত নকীব দলে যোগ দেওয়ার পর ‘সোলস্’ তার নিজস্ব সুরে এবং কথায় গান কম্পোজ করতে শুরু করে। এবং পরে আরো অনেকে দলে যোগ দেয়। এনায়েত, রুডি, লবেঞ্জো, তাজু, শাহেদ। এদের মধ্যে শাহে গত বছর আমাদের ছেড়ে চলে যায়। রউফ চৌধুরী আমাদের দলে ইংরেজি গান পরিবেশন করতো। সেও দশ বছর আগে না ফেরার দেশে চলে গেছে।
১৯৭৬-এঢাকার একটি সংগঠন সমগ্র বাংলাদেশের ব্যান্ডদলগুলোকে নিয়ে পপ সঙ্গীতে প্রতিযোগতিার আয়োজন করে। ঐ প্রতিযোগিতায় ‘সোলস্’ আমন্ত্রিত হয়েছিল। আমাদের পারফরমেন্স প্রশংসিত ও শ্রেষ্ঠ ব্যান্ড দল হিসেবে নির্বাচিত হয়। অন্যদিকে, শ্রেষ্ঠ অর্গান বাদক নকীব খান ও শ্রেষ্ঠ গায়ক হিসেবে তাজুল ইসলাম পুরস্কৃত হয়। এই সময়ে ‘সোলস’ প্রথম বাংলাদেশ টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করে। পরে শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ‘সোলস’ আমন্ত্রিত সঙ্গীত দল হিসেবে অংশগ্রহণ করে। ঢাকার প্রতিযোগিতা থেকে শুরু করে ইটঊঞ-এ অনুষ্ঠান চলাকালীন সময়ে তসলিম উদ্দীন চৌধুরী সবসময় আমাদের সাথে থেকে নানারকম উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছিলেন। একটা পর্যায়ে আমরা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হই, এসময় আর্থিক সংকটের মধ্যেও পড়তে হয়। তখন আমাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তবিবুল আলম, প্রয়াত সুখেন্দ বিকাশ বড়–য়া ও বর্তমান দৈনিক আজাদী সম্পাদক এমএ মালেক। তাদের সহযোগিতা পেয়েছি বলেই সংকট কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলাম।
‘সোলস্’-এর বয়স এখন ৪২ বছর। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন সঙ্গীত দল এতো দীর্ঘ সময় টিকে থাকেনি। জন্মলগ্ন থেকেই প্রচেষ্টা ছিলো বলেই সম্ভবত ‘সোলস্’ এর গান বা পরিবেশনা এখনো শ্রুতিমধুর ও সুন্দর। কিছু ভালো কাজকরা এবং তা সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা এক কথা নয়। সৃজনশীলতা এবং বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ দুটোকেই লালন করতে হয়েছে একই সময়ে। তার ভালো খারাপ দুটো দিকই ছিল। যার ফলে জনপ্রিয়তার সাথে সাথে ‘সোলস্’ পেয়েছে সমালোচকদের সপ্রশংস মন্তব্য।
সমাজবিপ্লব ছাড়া সংস্কৃতি কিংবা সঙ্গীতে উৎকর্ষ সাধন বেশ কষ্টকর। এই উদ্দেশ্যের কিঞ্চিৎ প্রতিফলন ঘটেছে তাদের ১২টি অ্যালবাম প্রকাশনার মাধ্যমে।
এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় ‘সোলস্’-এ অনেকে এসেছেন অনেকে আবার নিজের প্রয়োজনে চলেও গেছেন কিন্তু ‘সোলস্’ তার দাশ্বিক ঐশ্বর্য নিয়ে টিকে আছে। এক সময়ে এই দলে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বা গান পরিবেশন করতো এদের অনেকেই এখন বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতে নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে পরিচিত করেছে। আইয়ূব বাচ্চু, নাসিম আলী, শাহনাজ পিলু, তপন চৌধুরী। তাছাড়াও দরে কাজ করেছে মো. আলী, র‌্যালী, সুহাস, রউফ চৌধুরী, আজাদ, জুয়েল, তানিম, তাজুল ইমাম আরো অনেকে।
‘সোলস্’ এর এই যাবৎ ১২টি এ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম এ্যালবাম প্রকাশিত হয় ১৯৮১ সালে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে ‘সোলস্’ এর যেসব গান জনপ্রিয় হয়েছিল তার সবকটি গান এই এ্যালবামেই ছিল। প্রথম এ্যালবামটির কভার ডিজাইন করেছিলেন দৈনিক পূর্বকোণের বর্তমান নির্বাহী সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. ম. রমিজ উদ্দিন চৌধুরী।
‘সোলস্’ বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতে গত ৪২ বছরে কি করেছে তা যদি মূল্যায়ন করা হয় তবে ভালো-মন্দ দুটোই বলা যাবেÑতবে ভালোর পরিমাণটা একটু বেশী হবে বৈকি। পূর্বকোণের ৩১ বছরে আমাদের শুভেচ্ছা।