শৈবাল চৌধূরী

লোকশিল্প প্রকৃতিদত্ত একটা বিষয়। এই শিল্পের শিল্পীরাও মাটির শাঁসে মূলে গন্ধে বর্ণে গড়ে ওঠেন সহজাতভাবে। সাবলীলতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা তাঁদের সৃষ্টিক্ষমতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যৎকিঞ্চিত শিক্ষিত হয়েও এঁরা হয়ে ওঠেন শিক্ষাপরিণত। স্বশিক্ষা, সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, স্বয়ংক্রিয়ভাবে সে অভিজ্ঞতার আত্মস্থকরণ ও সহজিয়া প্রকাশের গুণে অনেক সময় এঁদের অনেকে পরিণত হন মহাশিল্পীতে। বিনয়বাঁশী জলদাস তেমনই একজন ক্ষণজন্মা মহাশিল্পী। কিন্তু প্রান্তিক শ্রেণীগোষ্ঠীতে ও বিত্তহীন পরিবেশে জন্মের কারণে সহজাতভাবে বিকশিত হয়েও পাদপ্রদীপের আলোয় ততটুকু আসতে পারেননি যতটুকু তাঁর প্রাপ্য ছিল।
বাংলার আদি ও নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র ঢোল। ঢোলের সঙ্গে বিনয়বাঁশীর প্রেম ও পরিচয় আজন্ম। তাঁর বাবা ঢোলবাদক ছিলেন বলেই স্বভাবত শিল্প ও শিল্পীর কাছে তিনি আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েছেন যুগপৎ। এ কারণে পারিবারিক পেশা মৎস্য শিকারের চেয়ে বেশি মনোযোগ ছিল তাঁর ঢোলবাদনে। কৃতবিদ্য এ শিল্পীর গুরু মূলত দুজন; পিতা উপেন্দ্রলাল ও ঢোলবাদক ত্রিপুরাচরণ। এঁদের কাছে প্রাথমিক শিক্ষার পর তিনি নির্মাণ করেন নিজস্ব বাদনশৈলী তাঁর সহজাত সৃষ্টিকৌশলে নিয়ত পরীক্ষাÑনিরীক্ষার মধ্য দিয়ে। ঢোলের বোলের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন পশুপাখির ডাক, ঝড়বৃষ্টি মেঘের নানা রকম শব্দ, নৌকার দাঁড় বাওয়ার শব্দছন্দ, যানবাহনের শব্দ ইত্যাদি মজাদারভাবে পরিবেশন করতেন অভিনব দেহভঙ্গিমায়। কিছু তালও তৈরি করেছিলেন, তেমনিভাবে মুখে মুখে পদ রচনায় সহজাত দক্ষতা ছিল তাঁর। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং অনুগত কোনো সহকারীর অভাবে কিছুই ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। বাদনশৈলীর কিছু উত্তরাধিকার রেখে গেছেন পুত্র বাবুল এবং পৌত্র কৃষ্ণমোহন ও বিধানের মধ্য দিয়ে।
বিনয়বাঁশীর জন্ম ১৯১১ সালের ১ অক্টোবর চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পূর্বগোমদ-ীর ছন্দারিয়ার ধীবর পল্লীতে। পিতা উপন্দ্রেলাল জলদাস ও মাতা স্বরবালা দেবীর তিনি জ্যেষ্ঠপুত্র। বিনয়বাঁশির শিক্ষা তিনবার বাল্যশিক্ষা সমাপ্তকরণ। চরম দারিদ্র্যের কারণে তা যেমন এগুতে পারেনি, তেমনি শৈশবেই তাকে যুক্ত হতে হয় সম্প্রদায়গত পেশা মৎস্যশিকারে। একই সাথে ঢোলবাদনেও নিয়মিত থাকেন।
ঢোলের প্রতি অদম্য আসক্তির কারণে বিনয়বাঁশী ঢোলশিল্পী বা ঢুলী হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যান কৈশোরেই। প্রথমে যোগ দেন শাকপুরার দেবেন্দ্রবাবুর যাত্রাদলে। ঢোল বাদনের পাশাপাশি সেখানে অন্যযন্ত্রও বাজাতেন। পাশাপাশি অভিনয় করতেন নর্তকী ও ছোটখাট চরিত্রে। একই সময় তিনি যুক্ত হন কবিয়াল রমেশ শীলের দলে। এরপর অবিচ্ছিন্ন পঁয়ত্রিশ বছর কাটিয়েছেন রমেশ শীলের প্রধান বায়েন ও দোহারের ভূমিকায়। এসময়েই পরিপক্ব হয়ে ওঠে বিনয়বাঁশীর বাদন। রমেশ শীলের সাহচর্যে থাকাকালীন সময়ে তিনি কবিয়াল ফণী বড়–য়া ও রাইগোপাল দাশের সান্নিধ্যে আসেন। এই তিন কবিয়ালের রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতা তাঁর মধ্যেও সঞ্চারিত হয়। তিনি পরিণত হন সমাজসচেতন এক শিল্পীতে। বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন ও সংগঠনে ক্রমশ যুক্ত হতে থাকেন তিনি। ১৯৬৯ ও ৭০ এর উত্তাল সময়ে বিনয়বাঁশীর ঢোলের উদাত্ত বোল উজ্জীবিত করেছে সাধারণ মানুষকে। কবিগান নিয়ে তিনি ফণী বড়–য়া ও রাইগোপাল দাশের সাথে ঘুরে বেড়িয়েছেন বাংলার পথে প্রান্তরে। স্বাধীনতাত্তোর সময়ে সুচরিত চৌধুরী ও মিলন চৌধুরী তাঁকে সংযুক্ত করেন গ্রুপ থিয়েটার চর্চায়।
এরও পূর্বে তিনি যুক্ত ছিলেন উদয় শংকরের দলে। সে সময় ভারতীয় গণনাট্য সংঘেও মাঝে মধ্যে বাজিয়েছেন। মায়ের তীব্র অসুস্থতার কারণে তাঁকে সে সময় ফিরে আসতে হয় ছন্দারিয়ার পৈতৃক ভিটেয়। নয়তো ইতিহাস হতো অন্যরকম। এখানে এসে তিনি যুক্ত হন প্রান্তিকের সঙ্গে। পরে উদীচী ও অঙ্গন নাট্যদলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সংযুক্ত ছিলেন।
যৌবনে কমরেড বঙ্কিম সেনের হাতে রমেশ শীলের মতো তাঁরও হাতেখড়ি হয় মার্কসবাদী রাজনীতিতে। শিল্পচর্চার সমান্তরালে রাজনৈতিক চর্চাও চলেছে যুগপৎভাবে। অংশ নেন গণজাগরণমূলক অনেক অনুষ্ঠানে। কলকাতার মোহাম্মদ আলী পার্কের বঙ্গীয় সংস্কৃতি সম্মেলন, ঢাকার কার্জন হলের সংস্কৃতি সম্মেলন, কাগমারী সম্মেলন, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার নিখিল বঙ্গ সম্মেলন এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
ঢোলবাদনে বিনয়বাঁশী উদ্ভাবন করেছিলেন স্বতন্ত্র শৈলী। বাদনরীতির আঙ্গিক অভিনবত্বে ঢোলবাদনকে পরিণত করেছিলেন শ্রুতিমধুর ও দৃষ্টিনন্দন এক উপভোগ্য শিল্পে। দৃষ্টিনান্দনিকতার মূল উপাদান তাঁর অপরূপ নৃত্যভঙ্গিমা। তাঁর উদ্ভাসিত বাদনশৈলীর একটি ছিল ‘ব্ন্দৃ ঢোলবাদন’। এ বৃন্দবাদনে তিনি চল্লিশটি ঢোল ও ঢুলির নেতৃত্ব দিতেন।
পূর্বোক্ত তিন প্রধান কবিয়াল ছাড়াও তিনি বাজিয়েছেন অন্নদা নট্ট, যামিনী পাল, নিরঞ্জন সরকার, রামচন্দ্র দাস, মোহনবাঁশী প্রমুখ খ্যাতিমান কবিয়ালদের প্রধান বায়েন হিসাবে। জয়ঢাক, ডগর, মৃদঙ্গ, তবলা প্রভৃতি তালবাদ্যযন্ত্র ছাড়াও সানাই, বাঁশি, বেহালা, সারিন্দা ও দোতরা বাদনে বিনয়বাঁশীর সমান দক্ষতা থাকলেও ঢোলবাদক পরিচিতির আড়ালে সেসব পরিচিতি ঢাকা পড়ে গেছে। শুধু কবিগানে নয়, তরুণ বয়স থেকেই তিনি অংশ নিতেন ঘেঁটুর দলে, পালা কীর্তন, নামকীর্তন, ঢপকীর্তন, শরিয়তিÑ মারফতি এবং গাজীর গানে। লোককবি বা লোকগান রচয়িতা হিসেবেও তিনি তাঁর যোগ্যতা, দক্ষতা ও প্রতিভা প্রমাণ করেন দু’শতাধিক গান রচনা ও সুরারোপের মাধ্যমে। শ্যামাচরণ বামাচরনের যাত্রাদলে যোগদানের মধ্য দিয়ে শৈশবে যাঁর শিল্পীজীবনের সূচনা সেই বিনয়বাঁশী জলদাস বৃহত্তর বাংলার প্রবাদতুল্য ঢোলবাদক ক্ষীরোদ নট্ট, উমাচরণ, রমেশচন্দ্র এঁদের সার্থক উত্তরসূরী। তবে মৌলিক শৈলী আর সৃষ্টিমুখরতায় তিনি অতিক্রম করে গেছেন তাঁর অতীত ও সমকাল। কিন্তু মূল্যায়িত হননি যথাযথভাবে।
আমি যখন ১৯৯৯ সালে তাঁকে নিয়ে প্রামাণ্যচলচ্চিত্র নির্মাণ করি তখন জীবনের প্রান্তরেখায় তিনি পৌঁছে গেছেন। ছন্দারিয়ার নিভৃত জেলেপল্লীতে জীবনের শেষ দিনগুলো অতিবাহিত করছেন দারিদ্র্য আর রোগব্যাধির সাথে আত্মীয়তায়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে জরাগ্রস্ত নন। একটু দুর্বল হলেও অশক্ত নন। তাঁর শালপ্রাংশু দেহটি তখনো ঋজু। ৮৮ বছর বয়েসেও তিনি যেভাবে ছবিতে কাজ করেছেন, বাজিয়েছেন, অভিজ্ঞতার বর্ণনা করেছেন, নেচেছেন তা রীতিমত চমকপ্রদ এবং বিনয়বাঁশী জলদাসের পক্ষেই একমাত্র তা সম্ভব।
২০০২ সালের ৫ এপ্রিল তাঁর প্রয়াণ পরিণত বয়সে হলেও যথাযথ পরিচর্যা ও চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব হয়নি দারিদ্র্যের কারণে। যাঁদের জন্যে তিনি আজীবন কাজ করে গেছেন আমরা কেউই এগিয়ে আসিনি তাঁর একটু সুখে, স্বাচ্ছন্দ্যে, সহযোগিতায়। ২০০২ সালে যখন তাঁকে একুশে পদক দেয়া হয়, তখন তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন ওয়ার্ডে শেষ শয্যায় অচেতন। গড়পড়তা সাধারণ চিকিৎসা চলছিল অনেক অযতেœ-অবহেলায়। তার স্ত্রী সুরবালা দেবী একুশে পদক গ্রহণ করেন। মৃত্যুর পরেও এই ক্ষণজন্মা শিল্পী রীতিমত অবহেলিতই থেকে গেছেন। ২০০২ সালে তাঁর জন্যে কোন নাগরিক স্মরণসভা যেমন হয়নি, তেমনি ২০১১ সালে উদযাপিত হয়নি জন্মশতবর্ষ, ছোট একটি স্মরণানুষ্ঠান ছাড়া।