বোমাংগ্রী উঃ উ চ প্রু চৌধুরী

রাজপুণ্যাহ, বোমাং সার্কেলের ঐতিহ্যবাহী বার্ষিক কর আদায় অনুষ্ঠান। ১৮৭৫ সালে নবম বোমাংগ্রী সাক হ্ন ঞো রাজপুণ্যাহ’র প্রবর্তন করেন। সেই থেকে বোমাং সার্কেল চিফ ধারাবাহিকভাবে রাজপুণ্যাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছেন। প্রতিবছর ডিসেম্বর বা জানুয়ারি মাসে রাজপুণ্যাহ অনুষ্ঠিত হওয়ার রেওয়াজ আছে। এই সময় পাহাড়ি পল্লীগুলোতে তেমন কোন কাজ থাকে না। জুমের ফসল ঘরে ওঠার পর তারা দীর্ঘ সময় বিশ্রামের সুযোগ পায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকে। সব মিলিয়ে এই সময়টাকে রাজপুণ্যাহর জন্য উপযুক্ত মনে করা হয়। রাজপুন্যাহ ঘোষণা করার পূর্বে সার্কেল চিফ রাজপরিবারের সদস্যদের নিয়ে পারিবারিক বৈঠকে তারিখ নির্ধারণ করেন। রাজপুণ্যাহ একটি সামাজিক উৎসব। দেশি-বিদেশি পর্যটকসহ বোমাং সার্কেলবাসীর কাছে রাজপুণ্যাহর গুরুত্ব অপরিসীম। জুমের ফসল ঘরে তোলার পর পাহাড়ি পল্লীর জনগণের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য, গৃহস্থালির মালামাল ক্রয়ের প্রয়োজন হয়। এছাড়া অনেকে কিছুটা বিনোদনও পছন্দ করেন। প্রজাদের এ সকল প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিবছর রাজপুণ্যাহর আয়োজন করা হয়। রাজপুণ্যাহ কর আদায়ের অনুষ্ঠান হলেও এ উপলক্ষ্যে তিনদিনের মেলা বসে। মেলায় সার্কাস, পুতুল নাচ,যাত্রা, বিচিত্রানুষ্ঠান, হাউজি, নাগরদোলা, গুটিখেলাসহ নানান রকমের আয়োজন থাকে। বাহারি স্বাদের জিনিস থাকে খাবার দোকান গুলোতে। দূর দূরান্ত থেকে আসা প্রজাগণ এই সকল আয়োজনে মুগ্ধ হন। তারা পরিবারের সকল সদস্যদের জন্য কেনাকাটা করার কথা ভুলেন না। রাজপুণ্যাহ’র বড় আকর্ষণ ট্র্যাংক। চট্টগ্রাম থেকে শতশত ট্রাকে করে টিনের তৈরি ট্র্যাংক বিক্রয়ের জন্য মেলায় আনা হয়। মেলার অধিকাংশ এলাকা জুড়ে থাকে ট্র্যাংকের দোকান। এখানে বলা বাহুল্য যে, বান্দরবানে ইঁদুরের উপদ্রব বেশি। প্রতিবছর ইঁদুর পাহাড়ি জনগণের ফসল নষ্ট করে। একই সাথে নষ্ট করে কাপড় চোপড় ও দলিলপত্র এবং টাকা পয়সা। ইঁদুরের আক্রমণ থেকে প্রয়োজনীয় সামগ্রি রক্ষা করতে পাহাড়ি পল্লীর মানুষের কাছে ট্র্যাংক বাক্সটি সিন্ধুকের মতোই দরকারি পণ্য হিসেবে গণ্য করা হয়। তাই ট্র্যাংক কেনার জন্য রাজপুণ্যাহ প্রজাদের কাছে আলাদাভাবে গুরুত্ব বহন করে।
১৯৪৭ সালের ১৩ মার্চ রবিবার ১৩তম বোমাংগ্রী উঃ ক্য জাই প্রু এর বাড়িতে জম্ম হয় আমার। তিনি ছিলেন আমার দাদ্।ু আমি রাজা বাহাদুরের দ্বিতীয় পুত্রের প্রথম সন্তান। নাতিদের মধ্যে আমি বড় হওয়ায় দাদু আমাকে বেশি আদর করতেন। ছোট বেলায় দাদুকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। আমি দাদুর সাথে একই বিছানায় থাকতাম। দাদুর অস্তিত্ব এখনো আমি অনুভব করি। ১৯৫২ সালে আমি ‘দাদুর স্কুল’ বোমাং স্কুলে ভর্তি হই। এখানে তৃতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণের পর আমাকে চট্টগ্রামের সেন্ট প্ল্যাসিডস্ স্কুলে পাঠানো হয়। তখন দাদুসহ পরিবারের সকল সদস্যের সান্নিধ্য থেকে দূরে চলে যাই। গ্রীষ্মের ছুটি ছাড়া বাড়িতে আসার সুযোগ থাকত না। বাড়িতে আসলে দাদুর সাথে ঘুমাতাম। আর গ্রীষ্মের ছুটি এসেই রাজপুণ্যাহ দেখার সুযোগ পেতাম। রাজপুণ্যাহ’র প্রস্তুতি ও আয়োজনকে ঘিরে আমাদের পরিবারের মধ্যে পক্ষকালব্যাপী আনন্দ উৎসব হতো। বোমাং সার্কেলের পুলিশ সদস্যরা সপ্তাহব্যাপী রাজাকে গার্ড অব অনার দেয়ার মহড়া করতেন। এই সময় পুলিশ সদস্যদের মার্চপাস্টের মহড়াও চলতো। রাজপুণ্যাহ’র প্রস্তুতি উপলক্ষ্যে দূরদূরান্ত থেকে প্রজাগণ দাদুর জন্য পিঠা, বিন্নিধানসহ নতুন ফসল নিয়ে আসতেন। এসব খাদ্য সামগ্রি আমাদের মাঝে নবান্নের উৎসব ছড়িয়ে দিতো। দাদুর কাছে ৯ সংখ্যাটি খুবই পছন্দের ছিলো। তাই প্রতি বছর ৯ ডিসেম্বর তিনি রাজপুণ্যাহর আয়োজন করতেন। রাজপুণ্যাহ’র দিনে দাদুর কিছু বাড়তি প্রস্তুতি থাকতো। রাজপুণ্যারপূর্বে সুবিধামত সময়ে পবিত্রতার জন্য রাজবাড়িতে মঙ্গলসূত্র পাঠ করা হতো।
রাজপুণ্যাহর দিনে রাজা বাহাদুর সকাল থেকেই রাজদরবারে যাবার প্রস্তুতি নিতেন। রাজকীয় পোশাকে সজ্জিত হবার পর পরিবারের সদস্যরা প্রথমে দাদুকে প্রণাম করতেন। এরপর ৫/৬টি বিউগলের সমন্বিত সুরে সকলকে রাজা বাহাদুরের আগমনী বার্তা জানানো হতো। সকাল ৯ টায় দাদু আমন্ত্রিত অতিথিদের নিয়ে রাজদরবারে উদ্দেশ্যে যাত্রা করতেন। এই সময় উজির নাজির, মন্ত্রী ও প্রতীকী সৈনিকরা রাজা বাহাদুরকে গার্ড অব অনার দিতো। ঢোল,ব্যান্ড এবং মারমাদের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে রাজা বাহাদুরকে রাজদরবার পর্যন্ত পৌঁছানো হতো। রাজা বাহাদুরের সম্মানে বহু তোরণ নির্মিত হতো এবং পবিত্র ও মঙ্গলের প্রতীক হিসেবে একজোড়া জলভরা কলসী একজোড়া কলাগাছ তোরণের পাশে লাগানো হতো। রাজদরবারে যাবার সময় রাস্তার দুইপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে প্রজাগণ রাজাকে দর্শন করতেন, ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভিবাদন জানাতেন।
রাজা বাহাদুরের আমন্ত্রণে রাজপুণ্যাহ অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার, রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকতেন। মং সার্কেল ও চাকমা সার্কেলের রাজার প্রতিনিধিগণও এ অনুষ্ঠানে মাঝে মাঝে যোগ দিতেন। রাজদরবারে অতিথিদের নিয়ে মেঝে (ফ্লোর) বসে রাজা বাহাদুর কর আদায় করতেন। রাজার আরামের জন্য দুই পাশে বালিশ দেয়া হতো। উজির, নাজিরসহ রাজ প্রশাসনের কর্মচারীগণ রাজদরবারে থাকতেন। রাজা বাহাদুর তাঁর ভাইকে পাশে বসাতেন। এই সময় হেডম্যানদের নেতৃত্বে কারবারীগণ রাজা বাহাদুরকে বার্ষিক কর প্রদান করতেন। কর হিসেবে রৌপ্য মুদ্রা প্রদান করা হতো। কাপড়ের বস্তায় এইসকল মুদ্রা সংগ্রহ করতেন রাজকর্মচারীরা। রৌপ্য মুদ্রার পাশাপাশি রাজা বাহাদুরকে একটি মোরগ, এক বোতল মদ ও এক বোতল ভাঙ (মদ সদৃশ্য) দেয়া হতো। অনেকে রাজা বাহাদুরকে সম্মান করে নজরানা ও বিভিন্ন উপঢৌকন দিতেন। কর আদায়ের সাথে সাথে চলতো ঐতিহ্যবাহী জ্যাই ও পাংখু নৃত্য। এছাড়া যাত্রা শিল্পীরা নৃত্য পরিবেশন করতো। সকাল ৯ টা থেকে টানা ৩ টা পর্যন্ত কর আদায় অনুষ্ঠান চলতো। রাজা বাহাদুর কর আদায় শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাজদরবারে উপস্থিত থাকতেন। রাজপুণ্যাহ উপলক্ষ্যে রাজবাড়ি সকলের দেখার জন্য উন্মুক্ত রাখা হতো। প্রজাগণ রাজ প্রসাদ দেখতে খুবই পছন্দ করতেন।
রাজদরবার থেকে বাড়িতে আসার সময়ও একইভাবে রাজা বাহাদুরকে গার্ড অব অনার দেয়া হতো। বাড়িতে আসার পর পরিবারের সদস্যরা আবারো রাজা বাহাদুরকে প্রণাম জানাতেন। এই সময় নাতি নাতনিরা মেলার খরচ দাবি করতো। রাজা বাহাদুর সবাইকে রৌপ্য মুদ্রা দিয়ে খুশি করতেন। আমিও এভাবে দাদুর কাছ থেকে রৌপ্য মুদ্রা পেতাম। দাদু রাজপরিবারের বয়োজ্যোষ্ঠ ব্যক্তিদের সম্মান সূচক অর্থ (খর্বোস) পাঠাতেন।
রাজপুণ্যার প্রথম দিন রাতে রাজবাড়িতে ডিনার পার্টির আয়োজন করা হতো। উন্নত মানের এই ডিনার পার্টিতে বিভাগীয় কমিশনার,ডিসি,এসপিসহ রাজপরিবারের সিনিয়র সদস্যরা উপস্থিত থাকতেন। ডিনার পার্টি শেষে রাজা বাহাদুর যাত্রা দেখতে যেতেন। নাতি নাতনিসহ রাজপরিবারের সদস্যরা এই সময় রাজা বাহাদুরের সাথে সংরক্ষিত আসনে বসে যাত্রা উপভোগ করতেন। দুর্গম গ্রামগুলো থেকে আসা প্রজাগণ সারা রাত যাত্রা দেখতেন। ঐসময় বান্দরবানে কোন আবাসিক হোটেল ছিলো না। অনেকে আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে থাকতেন। তবে বেশির ভাগ প্রজাই যাত্রা দেখে রাত কাটাতেন।
দুাদুর কাছ থেকে পাওয়া রৌপ্য মুদ্রা খরচের জন্য আমরা দিনের বেলায় মেলায় যেতাম। বাঁশি,বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্র, বেলুন, পুতুল কিনতাম। দিনের বেলায় রানীরাসহ রাজপরিবারের মহিলা সদস্যরাও গৃহস্থালির পছন্দের প্রয়োজনীয় মালামাল ক্রয় করতে মেলায় যেতেন। তাঁরা দা,বটি, এ্যালুমোনিয়াম ও পিতলের হাড়ি পাতিল, শীতবস্ত্রসহ বিভিন্ন দ্রব্যাদি ক্রয় করতেন।
আমার দাদু ১৩তম বোমাংগ্রী উঃ ক্য জাই প্রু ১৯৫৯ সালে ৬৩ বছর বয়সে মারা যান। মারা যাবার আগের রাতেও আমি দাদুর সাথে একই বিছানায় শুয়েছিলাম। সকাল ৯টায় বিছানা ছেড়ে বাথরুমে গিয়ে তিনি হঠাৎ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ডাক্তার এসে দাদুর মৃত্যুর বিষয়টি আমাদের নিশ্চিত করেন। আমরা বুঝতে পারি আমাদের সবাইকে ছেড়ে দাদু না ফেরার দেশে চলে গেছেন। দাদুর মৃত্যুর সংবাদটি আমিই বান্দরবান পাড়ায় আত্মীয় স্বজন ও প্রজাদের কাছে পৌঁছে দিই।
দাদুর মৃত্যুর পর ১৯৬০ সালে ১৪তম বোমাগ্রী হিসেবে মং শোয়ে প্রু চৌধুরী দায়িত্ব পান। ঢাকা থেকে টেলিগ্রামে বার্তা আসে তিনি রাজা হয়েছেন। ১৯৬১ সালে তিনি অভিষিক্ত হন। অভিষেক অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার উপস্থিত ছিলেন। বোমাংগ্রী মং শোয়ে প্রু চৌধুরীর দায়িত্ব নেয়ার সময় আমি ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র ছিলাম। তাঁর রাজত্ব কালে আমি বিএডিসি’র ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে শিক্ষা জীবন শেষ করেছি। বোমাংগ্রী মং শোয়ে প্রু চৌধুরীর ৩৬ বছর রাজত্বকালে আমি সর্বদা পাশেই ছিলাম। প্রতিটি রাজপুণ্যাহ আমি উপস্থিত হতাম। প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রতিটি কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতাম। এ আমলেও মেঝে (ফ্লোর) বসে কর আদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো। রাজদরবারে বিভাগীয় কমিশনার,জিওসি,উচ্চ পদস্থ সেনাকর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকতেন। বোমাংগ্রী মংশোয়ে প্রু চৌধুরী কিছুদিন অসুস্থতায় ভুগে ১৯৯৬ সালে পরলোক গমন করেন। মৃত্যুকালে আমি খুবই কাছে ছিলাম। আমার হাতে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এসময় পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও রাজা বাহাদুরের পাশে ছিলেন।
পরবর্তীতে বোমাংগ্রী উঃ অংশৈপ্রু চৌধুরীর রাজাশিপ নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয় আমি তা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছি। রাজপরিবারের বয়োজ্যোষ্ঠ ও সঠিক দাবীদার হিসেবে আমি উঃ অংশৈপ্রু চৌধুরীর পক্ষে আমার অবস্থান তুলে ধরেছি। তবে জটিলতা নিরসনে দুই বছর সময়কাল অতিবাহিত হয়। এই সময় আমার পিতা মিঃ চ থোয়াই প্রু (সিটি প্রু) অন্তবর্তীকালীন সময়ের জন্য খাজনা আদায়সহ রাজ প্রশাসনের দায়িত্ব পালন করছেন।
বোমাংগ্রী উঃ অংশৈ প্রু চৌধুরীর দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম রাজপুণ্যাহ উৎসবে আমি সক্রিয়ভাবে কাজ করেছি। অনুষ্ঠান আয়োজনসহ নানা বিষয়ে আমার পরামর্শ গ্রহণ করা হতো। রাজপূণ্যাহ অনুষ্ঠানে আমি স্বাগত ভাষণ দিতাম। বোমাংগ্রী অংশৈপ্রু চৌধুরী তাঁর বাড়ির আঙিনায় রাজপুণ্যাহর বা কর আদায় উৎসব করতেন। পরবর্তীতে তিনি রাজার মাঠে প্যান্ডেল তেরী করে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। বার্ধক্যজনিত কারণে রাজবাড়ি থেকে রাজদরবার যাবার সময় তিনি গাড়িতে চড়তেন। এই সময় উজির নাজিরসহ প্রতীকী সৈন্যরা তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করতো। বোমাংগ্রী অংশৈপ্রু চৌধুরীর রাজাপুণ্যাহ অনুষ্ঠানে চেয়ার থাকতো। কাঠের কারুকার্য খচিত বিশেষ রাজকীয় চেয়ারে বসে রাজা খাজনা আদায় করতেন। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিরাও চেয়ারে বসতেন। সরকারের মন্ত্রী,প্রতিমন্ত্রী, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান, রিজিয়ন কমান্ডার, জেলা প্রশাসক,পুলিশ সুপার ইউএনডিপির উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাগণ রাজদরবারে উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণ পেতেন। বোমাংগ্রী অংশৈপ্রু চৌধুরীর মৃত্যুর পর আমার চাচা উঃ ক্য সাইন প্রু চৌধুরীকে রাজা হিসেবে পরিবারের সমর্থন জানাই। বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউটে তিনি বোমাংগ্রী হিসেবে অভিষিক্ত হন। অনুষ্ঠানে রাজপরিবারের অন্যান্যদের সাথে আমিও উপস্থিত ছিলাম। বিভাগীয় কমিশনার নিয়ম অনুযায়ী তাঁর হাতে তলোয়ার হস্তান্তর করেন। বোমাংগ্রী ক্য সাইন প্রুর রাজপুণ্যাহ অনুষ্ঠানে রাজপরিবারের অন্যান্য সদস্যের মতো আমিও উপস্থিত ছিলাম। রাজপুণ্যাহ উপলক্ষ্যে পুরাতন রাজবাড়ি মাঠে ঐতিহ্যবাহী রাজদরবার হলের সামনে প্যান্ডেল তৈরি করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান,বাংলাদেশ সরকারের যুগ্ম সচিব, রিজিয়ন কমান্ডার, জেলা প্রশাসক,পুলিশ সুপার,ইউএনডিপির উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাগণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। আমন্ত্রিত অতিথিদের নিয়ে রাজা চেয়ারে বসে খাজনা আদায় করতেন। তবে তিনি বোমাং সার্কেলের রাজাদের মধ্যে সবচেয়ে কম আয়ু পাওয়া ব্যক্তি ছিলেন। ২০১৩ সালে তিনি মাত্র একবার রাজপুণ্যাহ আয়োজনের সুযোগ পেয়েছেন।
বোমাংগ্রী ক্য সাইন প্রু চৌধুরীর মৃত্যুর পর ২৪ এপ্রিল ২০১৩ আমি বোমাং সার্কেলের ১৭তম রাজা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করি। ২০১৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর তারিখ প্রথমবারে মতো আমি পুরাতন রাজবাড়ি মাঠে রাজপুণ্যাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। অনুষ্ঠানে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন এমপি,পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং এমপিসহ, রিজিয়ন কমান্ডার, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জনাব ক্যশৈহ্লা, জেলা প্রশাসক,পুলিশ সুপার, ইউএনডিপির উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। এ উপলক্ষ্যে তিনদিনের মেলা বসে।
রাজপুণ্যাহ অনুষ্ঠানটি সুপ্রাচীন। আমার পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য এবং কর আদায়ের ধারাবাহিতা রজায় রাখার জন্য আমিও উৎসব মূখরভাবে এ মিলনমেলার আয়োজন করে যাচ্ছি। পূর্বেকার সময়ের তুলনায় অনেক কিছুতে পরিবর্তন এসেছে। সুবিধা যেমনি বেড়েছে তেমনি কিছু কিছু ক্ষেত্রে অসুবিধা যে নেই তা বলছি না। তবে সব মিলিয়ে রাজপুণ্যাহ উৎসব বান্দরবানের একটি প্রাণবন্ত অনুষ্ঠান এতে কোন সন্দেহ নেই। রাজপুণ্যাহ ছাড়া এতো বড় মিলনমেলা আর দেখা যায় না। রাজপুণ্যাহ বান্দরবানের অর্থনীতির চাকাকে সচল করে। আমার দাদুর সময়ে বান্দরবানে আবাসিক হোটেল ছিল না। এখন সেই অবস্থা নেই। বান্দরবান এখন পর্যটন শহর। অনেক ভালো মানের আবাসিক হোটেল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এখানে। রাজপুণ্যাহ পর্যটকদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ। ভ্রমণ তালিকা থেকে কেউ রাজপুণ্যাহ উৎসবকে বাদ দিতে চান না।
প্রতিবছর রাজপুণ্যাহ অনুষ্ঠানে একজন পূর্ণ মাননীয় মন্ত্রী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে আমাদের শত বছরের ঐতিহ্য লালনে উৎসাহ যোগাবেন এটি রাজপরিবারের প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশা পূরণে আমার সক্রিয় ভ’মিকা অব্যাহত রাখতে চাই।
আমি রাজপুণ্যাহ উৎসবে আগত সকল অতিথিবৃন্দ,পর্যটক, দূর-দূরান্ত থেকে আগত হেডম্যান, কারবারী ও প্রজাসাধারণ, আমার প্রিয় বান্দরবানবাসী সকলকে স্বাগত জানাই। এ উৎসবের সার্বিক নিরাপত্তায় নিশ্চিত করার জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিটি সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। আপনাদের ভবিষ্যৎ সুন্দর হোক, মঙ্গল হোক,প্রতিটি ক্ষেত্রে সফলতা আপনাদের হাতে ধরা দিক মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে এ আর্শীবাদ করছি।