সাইফুল আলম

চট্টগ্রাম মহানগরীতে রপ্তানি, পচনশীল পণ্য ও খাদ্যপণ্যবাহী যানবাহন ছাড়া সকল ধরণের ভারী যানবাহন চলাচল ১২ ঘণ্টার জন্য নিষিদ্ধ করেছিল মহানগর পুলিশ কর্তৃপক্ষ। নিষেধাজ্ঞার এই সিদ্ধান্ত কাগজে-কলমে বিগত পাঁচ বছরের অধিক সময় ধরে নগরীতে বহাল রয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নগরীর রাস্তায় সকাল আটটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকার কথা। রপ্তানি পণ্যবাহী যানবাহনকে অবশ্য এই সুবিধা পেতে সংশ্লিষ্ট এসোসিয়েশন ও পুলিশ কর্তৃপক্ষ থেকে অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু, নগরবাসীর জন্য দুর্ভাগ্যের হলো, যানবাহন নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের এই পদক্ষেপ কখনোই পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। সাম্প্রতিক সময়েতো নয়ই। বরং দিনের বেলায় ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও দীর্ঘ লরিগুলো এমনভাবে চলাচল করে যে বোঝারই উপায় নেই, এই শহরে ভারী যানবাহন চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
অনেকই ক্ষোভপ্রকাশ করে বলেন, প্রশাসনের প্রশ্রয়েই দিনে-দুপুরে নগরীতে ভারী যানবাহন চলাচল করে। এর পেছনে যা-ই থাকুক, যানজট কমানোর উদ্দেশ্যে দিনের বেলায় এসব যানবাহন চলাচল বন্ধের যে পদক্ষেপ একদিন নেয়া হয়েছিল, সেটিতো হয়ইনি, উল্টো চালকেরা বেপরোয়া হয়ে গেছে। নগরীর রাস্তাগুলোতে বেঘোরে প্রাণ দিতে হচ্ছে পথচারীদের। গত দেড় বছরে নগরীর বিভিন্ন রাস্তায় অন্ততপক্ষে ১৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন ভারী যানবাহনের চাপায় বা ধাক্কায়। গতকাল একদিনেই নগরীতে পৃথক দুর্ঘটনায় এক কলেজ ছাত্রীসহ দুজন নিহত হয়েছেন। এরমধ্যে গতকাল সকাল ১০টার দিকে কাভার্ডভ্যান চাপায় সোমা বড়–য়া নামে সিটি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক পড়–য়া এক তরুণী মারা যান। এছাড়া রাত ৯টায় চান্দগাঁও কালুরঘাট ভারী শিল্প এলাকার বাদামতলি মোড়ে একটি সিমেন্ট কোম্পানির ট্রাকের ধাক্কায় এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন।
আগের দিন (১৫ জানুয়ারি) নগরীর দেওয়ানহাট এলাকায় একটি গাড়ির ধাক্কায় অজ্ঞাত পরিচয় এক বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন। তার আনুমানিক বয়স ৭০ বছর। চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি ভোরে চট্টগ্রাম ইপিজেড মোড়ে লরী চাপায় সিএনজিট্যক্সির দুই যাত্রী নিহত হন।
এর আগে গত বছর (২০১৮ সাল) ২৬ এপ্রিল কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায় রিয়া বড়–য়া নামে চট্টগ্রাম মহিলা কলেজের সমাজ বিজ্ঞানের চতুর্থ বর্ষের অনার্সে পড়–য়া শিক্ষার্থীর ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালের ২৯ এপ্রিল দুপুর একটায় নগরীর ফিরিঙ্গিবাজার এলাকায় ট্রাকের চাপায় অভি রিভেরো (৬০) নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। এ সময় ওই ব্যক্তি রাস্তা পারাপার হচ্ছিলেন।
২০১৭ সালের ১৮ আগস্ট ভোরে নগরীর আকবর শাহ থানাধীন শহীদ লেন এলাকায় ট্রাকচাপায় তিন মোটরসাইকেল আরোহী কামরুল ইসলাম (২৭), মো. নিজাম (৩২) ও মো. রেজাউল (৩০) ঘটনাস্থলে নিহত হন। তারও আগে ২০১৭ সালের ১৩ আগস্ট সকাল পৌণে ১০টার দিকে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের অদূরে ভাঙা রাস্তায় লরি উল্টে ট্যাক্সি আরোহী জসিম সিকদার (৩৮), ওবায়েদ ওবায়দুর (৩০) ও মোশারফ হোসেন মাসুম (৪১)-র ওপর পড়ে। সেখানেই দু’জন মারা যান। পরে হাসপাতালে মারা যান আরও একজন।
লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ভারী যানবাহনের চাপা কিংবা ধাক্কায় অনাকাক্সিক্ষত মর্মান্তিক মৃত্যুর আলোচ্য এসব ঘটনার বেশিরভাগই ঘটেছে দিনের বেলায়। যখন এসব গাড়ি চলাচলেরই কথা না।
বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে অভিযোগ করে বলা হয়েছে, ছাড়ের আওতায় থাকা ভারী যানবাহনের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অবৈধ গাড়ি নগরীর রাস্তায় চলাচল করে থাকে। প্রশাসনের চোখের সামনে দিয়ে এসব ভারী যানবাহন কীভাবে চলাচলের সুযোগ পায়, সেটি কারো বোধগম্য নয়।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব গুরুতর অভিযোগ তুলে বলেছেন, নগরীতে যতো ট্রাক-কাভার্ডভ্যান চলাচল করে তার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ যানবাহনের কোন বৈধ কাগজপত্র নেই। এমনকি চালকদের কমপক্ষে অর্ধেকের লাইসেন্সও অবৈধ।
যাত্রী স্বার্থ সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়োজিত একাধিক সংগঠনের কর্মকর্তারা বলেন, অলংকার থেকে কদমতলী হয়ে মাদারবাড়ি, আইস ফ্যাক্টরি রোড, এ কে খান রোড থেকে জিইসি হয়ে বহদ্দারহাট, দুই নম্বর গেট থেকে অক্সিজেন এমনকি মুরাদপুর থেকে অক্সিজেন, টাইগারপাস থেকে নিউমার্কেট হয়ে কোতোয়ালীমুখী রাস্তায় দিনের বেলায় অবাধে ভারী যানবাহন চলাচল করে। এসব গাড়ির অধিকাংশই ছাড়ের আওতায় পড়ে না। ভারী যানবাহনগুলো কীভাবে নগরজুড়ে ঘুরে বেড়ায় তা বোধগম্য নয়।
যাত্রী স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির নেতা ইফতেখার ফয়সাল বলেন, ‘জরুরি’ আখ্যা দিয়ে কিছু গাড়িকে চলাচলের ক্ষেত্রে ছাড় দেয়ায় অন্যরাও সেই সুযোগ নিচ্ছে। রহস্যজনক কারণে প্রশাসনও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে নিশ্চুপ থাকছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, লৌহজাত পণ্যবাহী লরিগুলো দিনের বেলায় বিনা বাধায় নগরীরর রাস্তা চষে বেড়াচ্ছে। এগুলোতে পচনশীল কিংবা রপ্তানির পর্যায়ে পড়ে না।
ইফতেখার ফয়সাল আরও বলেন, শুধু ভারী যানবাহন নয়, নগরীতে বড় আকারের আন্তঃজেলা বাসগুলোও পথচারী- নাগরিকদের জন্য বিড়ম্বনা তৈরি করছে। রাস্তায় যানজটের জন্যও এই বাসগুলো দায়ী। বিশেষ করে গরীব উল্লাহ শাহ মাজার রোড হয়ে এ কে খানমুখি ওআর নিজাম রোডের উপর আন্তঃজেলা বাসের চাপ দিনের বেলায় লেগেই থাকে। অথচ শহরের কাউন্টার থেকে ছোট আকারের বাসে করে যাত্রীদের শহরের বাইরে নিয়ে গিয়ে বড় বাসে তুলে দেয়ার কথা। আর যেসব গাড়ি দক্ষিণ কিংবা উত্তর চট্টগ্রাম ও কাপ্তাই থেকে শহরের উপর দিয়ে ঢাকা কিংবা আন্তঃজেলায় যায় সেসব গাড়ি শহরে থামারই কথা নয়। কিন্তু প্রশাসনের বেঁধে দেয়া দীর্ঘদিনের নিয়ম ট্রাফিক পুলিশ প্রায়শ অবজ্ঞা করে চলেছে। আন্তঃজেলা বাস চালকেরা তাই সুযোগটি ভালভাবেই নিচ্ছেন।
নাগরিক সমাজ ও যাত্রীস্বার্থ সংরক্ষণের সঙ্গে সম্পৃক্তরা বলেন, ভারী যানবাহন চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানোয় একেকটি মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার পর প্রশাসন সোচ্চার হন। কয়েকদিন কেটে গেলে তাদের তৎপরতা ফের থেমে যায়। দিনের বেলায় (সকাল আটটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত) সব ধরণের ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ করে নাগরিকদের জানের নিরাপত্তা বিধান প্রশাসনের একমাত্র দায়িত্ব হওয়া উচিত। আর কতো মৃত্যু হলে নগরীতে বন্ধ হবে ভারী যানবাহন চলাচল, এটাই শোকাতুর নাগরিকদের প্রশ্ন।

Share
  • 942
    Shares