নিজস্ব প্রতিবেদক , ঢাকা অফিস

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিরোধী কুড়ি দলের জোটে জামায়াতে ইসলামীসহ মৌলবাদী দলগুলির অংশগ্রহণ নিয়ে এবার দো’টানায় পড়ল সদ্য ভোটে ছিটকে পড়া দেশের বৃহত্তম দল বিএনপি। জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সখ্যতা নিয়ে সম্প্রতি আপত্তি জানিয়ে এ প্রশ্নের জরুরি মীমাংসা চেয়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চলা অপর নির্বাচনী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।
জানা গেছে, ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ আহ্বায়ক ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বিএনপিকে জামায়াত ত্যাগের আলটিমেটাম দিয়েছেন। বলেছেন, তাদের (গণফোরাম) সঙ্গে রাজনীতির জোট করতে হলে জামায়াতে ইসলামীসহ মৌলবাদি দলের সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের তরফে এমন স্পষ্ট আলটিমেটাম দেওয়ার পরে বিএনপির সামনে এখন কঠিন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তারা জামায়াতে ইসলামী নাকি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট- কাদের সমর্থন-সহযোগিতা চাইবে, আর কাদের ত্যাগ করবে ? বিষয়টি সম্পর্কে জানতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়টি আমি এখনো দেখি নাই। আর এই সম্পর্কে কথা বলবেন বিএনপি মহাসচিব। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ফোন করা হলে তার মোবাইল ‘ফোন’ বন্ধ পাওয়া গেছে। তবে, বিএনপির এক সূত্র বলেছে, এবারের ভোটের সময় জামায়াতের ভুমিকায় তারা অসন্তুষ্ট। ভোটে জামায়াত সমর্থকেরা তেমন সক্রিয় ছিল না। তাই, সব মিলিয়ে আগামীদিনের রাজনৈতিক বোঝাপড়ায় জামায়াত নাকি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কাদের সঙ্গে ঐক্য গড়া হবে, তা এখনই চুড়ান্ত করার সময় আসেনি।
ঐক্যফ্রন্টের নেতা ও গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মন্টু গতকাল এক সাংবাদিক সম্মেলনে জানান, তারা বিষয়টি নিয়ে ভোটের আগেই বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। মির্জা ফখরুল তখন তাদের বলেছিল, জামায়াত হিসেবে নয়, ভোটে তাদের কয়েকজনকে ধানের শীষ প্রতীক দেওয়া হয়েছিল বিএনপির প্রার্থী হিসেবে। মন্টুর সাফ কথা- এখন ভোট নেই। তাই, তারা ভবিষ্যতের জন্য এ প্রশ্নের স্থায়ী মীমাংসা চাইছেন। এ বিষয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ও গণফরোম সভাপতি ড. কামাল হোসেন গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, আমরা অতীতে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে রাজনীতি করবো, তা চিন্তাও করিনি। ভবিষ্যতেও করতে চাই না। বিএনপিকে জামায়াত ছাড়তে বলবেন কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল হোসেন বলেন, এটি বলা যেতে পারে।
গত বছরের ১৩ অক্টোবর ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপি এবং কয়েকটি ছোট দল মিলিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে নতুন একটি রাজনৈতিক জোট গঠন করে। এই জোটের প্রার্থীরা গত ৩০ ডিসেম্বরের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে মোট ৮টি আসনে জয়লাভ করে। এরমধ্যে, বিএনপির ৬ জন এবং গণফোমের ২ জন প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন।
অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির জোটবদ্ধ রাজনীতি চলছে প্রায় দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে। এরমধ্যে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন ঠেকাতে কুড়ি দলের জোটের মধ্যে জামায়াত ছিল বিএনপির রাজপথের সহিংস আন্দোলনের অন্যতম সঙ্গী। সেই ২০১৪ সালের আন্দোলনের মিত্র হিসেবে ভূমিকার প্রতিদান হিসেবেই এবার নিবন্ধন না থাকার পরেও একাদশ জাতীয় সংসদের ভোটে জামায়াতে ইসলামীর ২২ জন নেতাকে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করার সুযোগ দিয়েছে বিএনপি। কিন্তু এবার ভোটেরদিন মাঝপথে বিএনপির সাথে আলোচনা না করেই জামায়াত নির্বাচন প্রত্যাখ্যান ও বয়কট করায়, বিএনপির অভ্যন্তরেও জামায়াত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ১৯৯৭ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিএনপির সাথে জামায়াতের সম্পর্ক সবচেয়ে ভালো ছিল। বিশেষ করে ২০০১ সালে জামায়াতের দুই নেতাকে খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দিয়ে দুইদলের ঐক্য ও সংহতিকে আরও পোক্ত করে গড়ে তুলে। তবে, ২০১০-১৫ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষ নেতার একের পর এক দ-ের ঘটনায়, বিশেষ করে কয়েকজন জামায়াত নেতার ফাঁসি দেওয়ার পর থেকে পাল্টাতে থাকে দৃশ্যপট। ওই সময় বিএনপিকে পাশে পায়নি জামায়াত। পরে বিএনপি আন্দোলনের ডাকে সমর্থন জানালেও রাজপথে সক্রিয় থাকেনি জামায়াতের উগ্র কর্মিরা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা আরও মনে করেন- এবার ভোটের আগে গণফোরামসহ কয়েকটি দল মিলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গড়ার পর থেকেই বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে। বিএনপিও কার্যত কুড়ি দলের জোটকে এড়িয়ে ভোটের আগে নতুন মোর্চার নেতাদের দিকেই ঝুঁকে পড়ে। এদিকে, নতুন মোর্চা গড়ার সুচনাতেই জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির সখ্যতার প্রশ্ন তুলে বেরিয়ে যায় বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ড. কামাল হোসেন বলেন, জামায়াতের সঙ্গে অতীতে যেটা হয়েছে, সেটি অনিচ্ছাকৃত ভুল। তারা যে ধানের শীষে জামায়াতের ২২ জনকে মনোনয়ন দিবে, তা আমাদের জানানো হয়নি। আমরাও জানতাম না।
জাতীয় নির্বাচনকে উদ্ধৃত করে গতকাল সাংবাদিক সম্মেলনে ড. কামাল হোসেন আরও বলেছেন, ‘দেশের মানুষের মধ্যে মৌলিক বিষয়ে কিন্তু ঐক্যমত্য আসেনি। একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের সংসদ গঠিত হোক, এটা নিয়ে কোন দ্বিমত নেই কিন্তু ৩০ তারিখে যা ঘটেছে সেটা তো আপনারা পত্র-পত্রিকায় পাচ্ছেন।’ দেশের স্বার্থে সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে সেটা এখনও নেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন ড. কামাল। বলেন, ‘তারা চাইলে দুই তিন মাস বা তার চেয়ে সময়ের মধ্যে একটা নির্বাচন করা যেতে পারে।’ এছাড়া আগামী ২৩ এবং ২৪ মার্চ ঢাকায় গণফোরামের জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান ড. কামাল হোসেন।

Share