ট্রাফালগার স্কয়ার হল সেন্ট্রাল লন্ডন ওয়েস্টমিনিস্টার শহরের একটি পাবলিক স্কয়ার যা পূর্বে চিয়ারিং ক্রস নামে পরিচিত। ১৮০৫ সালের ২১ অক্টোবর ফ্রান্স ও স্পেনের সাথে নেপোলিয়নের যুদ্ধ ট্রাফালগার উপকূলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। যাকে ট্রাফালগার যুদ্ধও বলা হয়। এটি ১৩তম শতাব্দি থেকে একটি উল্লেখযোগ্য ল্যান্ডমার্ক ছিল। জর্জ চতুর্থ স্কয়ারটি বাকিংহাম প্লেসে স্থানান্তর করার পর অঞ্চলটি পূণর্নিমিত হয়েছিল। জর্জ এর মৃত্যুর পর স্কয়ারের অগ্রগতি খুব একটা ছিল না বললেই চলে।
হাইড পার্ক, লন্ডন- এটি সেন্ট্রাল লন্ডনের একটি প্রধান পার্ক। পার্কটি ৪টি রয়েল পার্কের মধ্যে বৃহত্তম, যা কেনসিংটন গার্ডেন এবং হাইড পার্কের মধ্যে কেনসিংটন প্রাসাদের প্রবেশদ্বার থেকে একটি চেইন গঠন করে। এটি বাকিংহাম প্রাসাদের প্রধান প্রবেশদ্বারের পূর্বে। ১৫৩৬ সালে হেনরি ঠওওও দ্বারা পার্কটি ওয়েস্টমিনিস্টার এ্যাবে থেকে নেমে আসে এবং এটি একটি শিকার ভূমি হিসাবে ব্যবহৃত হত।
এটি ১৬৩৭ সালে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয় এবং খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠে। বিশেষত মে দিবসের প্যারেডের জন্য। ১৮ তম শতাব্দির প্রথম দিকে রাণী ক্যারোলিনের নির্দেশে এটির বিশেষ উন্নতি ঘটে। ১৯ শতকের পর বক্তৃতা-সমাবেশ হাইড পার্কের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল। ২০ শতকের শেষভাগে পার্কটি বড় আকারের রক সংগীত কনসার্টের জন্য বেশ পরিচিত হয়ে উঠে।
২৪ এপ্রিল লন্ডন সিটি ট্যুরে বের হই। আমাদের গাইড ছিল খবরষধ, সাড়ে তিন মিলিয়ন লোকের দেশ লিথোনিয়ার অধিবাসী। খবরষধ মধ্যবয়স্কা, বেশ চটপটে। আজকের প্রোগামটা খুবই সমন্বয়হীতার মধ্যে ঘটতে যাচ্ছে। পথিমধ্যে আমাদের গাড়িটা বিকল হয়ে গেল- আমরা সরাসরি ব্রিটিশ রাণী এলিজাবেথ-এর বাসস্থান বাকিংহাম প্রাসাদের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। আমরা যখন গেলাম তখন রাণী ছিলেন না অর্থাৎ ব্রিটিশ পতাকা উড়ছে প্রাসাদের উপর। যদি রয়েল পতাকা শোভা পেত প্রাসাদের উপর তবে বোঝা যেত রাণী ভেতরে আছেন। ফুলে ফুলে সুশোভিত প্রাসাদের আঙ্গিনা। আমরা প্রাসাদের চারদিক ঘুর ঘুর করতে লাগলাম, কেউ কেউ সেল্ফিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। দামী মার্বেল পাথরে নির্মিত প্রাসাদটি একটি অনিন্দ্যসুন্দর স্থাপনা, যার কোনো জুড়ি নেই। আক্ষেপ এমন এক সময় এসেছি যখন ভেতরে যাওয়ার কোনো অনুমতি নেই, তবুও জীবনে তো একবার দেখলাম রাণীর রাজপ্রাসাদটি। এটি হয়তো বা স্মৃতির ভেতরে পড়ে থাকবে সারাদিন, সারাবেলা। এটি লন্ডনের প্রশাসনিক সদর দপ্তর, ওয়েস্টমিনিস্টার সিটিতে অবস্থিত। প্রাসাদটি রাষ্ট্রীয় এবং রাজকীয় অতিথিগণের কেন্দ্রস্থল হিসাবে বিবেচিত। এটি জাতীয় আনন্দ ও শোকের সময়ে ব্রিটিশ জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।
১৭৬১ সালে কিং জর্জ তৃতীয় কর্তৃক রাণী সার্লটের ব্যক্তিগত আবাস হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছিল এবং কুইজ হাউজ নামে বেশ পরিচিত হয়ে উঠে। বাকিংহাম প্রাসাদ ১৮৩৭ সালে রাণী ভিক্টোরিয়ার প্রবেশকালীন সময়ে ব্রিটিশ রাজপরিবারের একটি অনন্য বাসভবন হয়ে উঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান বোমা দ্বারা প্রাসাদকে ধংস করা হয়েছিল। প্রাসাদটিতে ৭৭৫টি কক্ষ রয়েছে এবং প্রাসাদের বাগানটি লন্ডনের বৃহত্তম বেসরকারী বাগান হিসাবে পরিচিত। রাষ্ট্রীয় কক্ষগুলি অফিসিয়াল এবং রাষ্ট্রীয় বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আগস্ট, সেপ্টেম্বর এবং শীত ও বসন্তকালে কিছুদিনের জন্য এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে।
রাণীর ৪টি প্রাসাদ রয়েছে, এর মধ্যে ২টি স্কটল্যান্ডে। ওখান থেকে আমাদের ডেলিগেটবৃন্দ রওয়ানা দেয় মাদাম তুসো এর উদ্দেশ্যে, যেটিকে বলা হয় মোমের জাদুঘর- এটি ছাড়াও লন্ডনের বাইরে অন্যান্য বড় শহরেও ছোট ছোট জাদুঘর রয়েছে। লন্ডনের এই মোমের জাদুঘরটি মোম ভাস্কর ম্যারি তুসোদ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা মাদাম তুসোদের হিসাবে অনন্য পরিচিত। এটি একটি প্রধান পর্যটক আকর্ষণ। বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক মানুষের ভাস্কর্য এখানে রয়েছে, যা পর্যটকদের করে বিমোহিত। সাথে জনপ্রিয় চলচ্চিত্রও প্রদর্শিত হয়।
ম্যারি তুসোদের জন্ম ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে। ১৭৬৮ সালে তাঁর মা সুইজারল্যান্ড-এর বার্নের চিকিৎসক, যিনি ফিলিপ কার্টিয়াসের সাথে কাজ করেছিলেন-মোম মডেলিং এ যিনি দক্ষ একজন চিকিৎসক ছিলেন। কার্টিয়াস তুসোদকে এই মোম মডেলিং শিখিয়েছিলেন। পরবর্তীতে কার্টিয়াস প্যারিসে চলে যান এবং ৬ বছর বয়সী তার ছোট্ট শিক্ষানবিসকে নিয়ে যান। ১৭৭৭ সালে তুসোদ ভাস্তায়ারের প্রথম মোমের ভাস্কর্য নির্মাণ করেছিলেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি ভার্সেস প্রাসাদে ফ্রান্সের ম্যাডাম এলিজাবেথ এর রাজা লুই ঢঠও এর শিল্প শিক্ষক হন। ফরাসী বিপ্লবের সময় তাকে তিন মাস কারাদন্ড দেয়া হয়েছিল কিন্তু একজন প্রভাবশালী বন্ধুর হস্তক্ষেপে তাকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল।
ম্যারি তুসোদ যেসব বিখ্যাত ব্যক্তিদের ভাস্কর্য নির্মাণ করেছিলেন তাঁদের নাম হল: জিন-জ্যাকস রুশউ এবং বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন। ১৭৯৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পর ডাক্তারের বিশাল মোম মডেল সংগ্রহ করেন এবং পরবর্তী ৩৩ বছর ইউরোপ ভ্রমণ করেন। ১৭৯৫ সালে তিনি ফ্রাঙ্কোসি তুসোদের সাথে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং শো’টি নতুন নাম অর্জন করেন- মাদাম তুসোদের। নেপোলিয়নের যুদ্ধের কারণে তিনি ফ্রান্সে ফিরতে পারছিলেন না, তাই তিনি গ্রেট ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ড জুড়ে তাঁর সংগ্রহে থাকা বিশাল সাম্র্যাজ্যের প্রদর্শনী করেন।
১৮৩৬ সালে বেকার স্ট্রিট বাজারটি তুসোদের প্রথম স্থায়ী বাড়ি হয়ে উঠেছিল। আমরা ডেলিগেটবৃন্দ মাদাম তুসোদের পৃথিবী জোড়া খ্যাতির শীর্ষে থাকা নায়ক- নায়িকাদের মোমের ভাস্কর্য পরিদর্শন করলাম। এতে রয়েছে ব্রিটিশ রাজপরিবার সদস্য, ব্রিটিশ নায়ক- নায়িকা, ব্রিটিশ রাণী সবারই ভাস্কর্য যেন নির্লিপ্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে আসা বিভিন্ন ভিনদেশী পর্যটক ছাড়াও আমাদের দেশের পর্যটকবৃন্দ ভাস্কর্যদের সাথে সেল্ফিতে মহাব্যস্ত হয়ে পড়লেন। পরে ইলেকট্রনিক রেলগাড়িতে পুরো জাদুঘর ঘুরে বেড়ালাম।
যাত্রা পথে আশপাশে এমন কিছু জীবন্ত ছবি দেখা গেছে যেগুলো মনে হয় এখনই ঘট্ছে, অদ্ভূত এক নস্টালজিয়ায় আমরা। দুপুরে বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট ‘কিচেন রেষ্টুরেন্ট’ -এ ভুরিভোজন।

লেখক: সভাপতি, রাউজান ক্লাব জুনিয়র কনসালটেন্ট (ইএনটি), জেনারেল হাসপাতাল, রাঙ্গামাটি ফৎড়সধৎভধৎড়ড়শ@মসধরষ.পড়স

Share