নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » বাংলাদেশের গণতন্ত্র ঃ নির্বাচন, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি নাওজিশ মাহমুদ

বাংলাদেশের গণতন্ত্র ঃ নির্বাচন, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি নাওজিশ মাহমুদ

৩০ ডিসেম্বর, ২০১৮ খৃস্টাব্দে বাংলাদেশে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন হয়ে গেল। আওয়ামী লীগসহ মহাজোট একচেটিয়া জয়লাভ করেছে। বিরোধী দল (যা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে পরিচিত) প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী মাটির সাথে মিশে গিয়েছে। মাত্র স্বতন্ত্রসহ ১১টি আসন পেয়েছে। আওয়ামী লীগের সাথে আসন সমঝোতায় জাতীয় পার্টি ২২ আসনে এবং আওয়ামী লীগ জোট ২৬৬ আসনে নির্বাচিত হয়েছে। একটি আসনে প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত রয়েছে। এ ফল ছিল প্রত্যাশিত। আমাদের দেশে নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা পরাজিত হয় না। এটা ৫৪ সালে একবার হয়েছিল। আর কখনও হয়নি। ক্ষমতাসীনরা বিরোধী দলকে কতটুকু ছাড় দিবে এটার উপর নির্ভর করে নির্বাচনের কতটুকু জনগণ অংশগ্রহণের ভিত্তিতে ফলাফল নির্ধারিত হবে এবং কতটুকু ক্ষমতাসীনরা প্রভাব বিস্তার করবে। এর ফলে আমাদের দেশের শাসন ক্ষমতা বার বার নিয়মতান্ত্রিক পথের বদলে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে হস্তান্তর হয়েছে। সামরিক শাসনও এ কারণে আসার সুযোগ পেয়েছে। সামরিক শাসন বন্ধ করার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার চালু করে চেষ্টা করা হয়েছিল। ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া বেসামারিকীকরণ করা যায় কীনা? তখন আমাদের বিচার বিভাগকে রাজনৈতিককরণের প্রচেষ্টা শুরু হয়। ফলে, আমাদের আম এবং ছালা দুটোই যাওয়ার উপক্রম হয়। আবার রাজনৈতিক দলের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রক্রিয়ায় দেশ ফিরে যায়। হয়তো এই প্রক্রিয়া রাতারাতি সফলতা পাবে না। আমরা প্রত্যাশা করি, ধীরে ধীরে রাজনৈতিক দলের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন আমাদের দেশেও চালু হয়ে যাবে। জনগণ নির্বিঘেœ ভোট দিতে পারবে। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার শতভাগ প্রতিফলন হবে।
খোদ একজন নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, নির্বাচন সকল দলের অংশগ্রহণমূলক হয়েছে কিন্তু জনগণের অংশগ্রহণ ছিল না। এবার সরকারের সদিচ্ছায় নিবন্ধিত প্রায় সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায় নি। সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ ছিল তাও পুরাপুরি বলা যায় না। অনেক অনিবন্ধিত দলকে নির্বাচেন অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়েছে। তবে সরকারী দলের সমান সুযোগ যেমন দেয়া হয় নি। তেমনি নির্বাচনী প্রচারণায় পুলিশের হয়রানী গ্রেফতার সমানে চলেছে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বক্তব্য, কারো বিরুদ্ধে, যদি, মামলা থাকে তা হলে আমরা কি করবো? নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পূর্বে কাদের বিরুদ্ধে মামলা আছে, কারা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করতে পারবে না, তা নিশ্চিত করা উচিত ছিল । সেটাও করা হয় নি। নির্বাচন কমিশনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আইনশৃক্সক্ষলা বাহিনী মামলাার আসামীদের ছাড় দেয় নি। নির্বাচন কমিশন তাঁর কর্তৃত¦ প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের আচরণ দেখে মনে হয়েছে তারা চাকুরী করছে। এটা যে একটি মহান সাংবিধানিক দায়িত্ব , এটা ভুলে গিয়েছে। কমিশনের প্রধান কাজ, ভোটারদের নিরাপদে অবাধে ভোট দেয়ার, ভোটারদের নিরাপত্তা এবং সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণে যাতে কোন ব্যত্যয় না ঘটে তা নিশ্চিত করা। অথচ, সোশাল মিডিয়াতে দেখা গিয়েছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে ভোট প্রদান, আগে থেকে সিল মেরে রাখা এবং এক একাধিক ব্যক্তির অনেকগুলি ভোট দেয়ার ঘটনা ঘটেছে।
নির্বাচন কমিশন এই ব্যাপারে কোন ভূমিকা রাখে নি। ঐ সকল কেন্দ্রে পুনরায় ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা করার সুযোগ ছিল বা যদি প্রচারণা মিথ্যা হয় তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া যেত। ভোট প্রদানের হার কোথাও কোথাও ৮০% থেকে ৯০% পড়েছে। কোথাও ভোট পড়ার হার মোট ভোটারের চয়ে বেশী হয়েছে। ভোটের লাইন এবং ভোট কেন্দ্রের অবস্থা দেখে মনে হয়নি, এতো ভোট পড়তে পারে। আমাদের যে সকল তরুণরা এবার প্রথম ভোটার হয়েছে, অনেকে এবার ভোট দিতে পারে নি। হয় ভোটের নাম্বার পায় নি বা ভোট কেন্দ্র যেতে পারে নি। অনেকে যাওয়ার পর খবর পেয়েছে ভোট দেয়া হয়ে গিয়েছে। তাই, নির্বাচন কমিশনের দক্ষতা নিয়েই এবার প্রশ্ন উঠার যথেষ্ট কারণ আছে। তবে প্রাণহানীর দিক থেকে এবং শান্তি শৃক্সক্ষলার দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এই কৃতিত্ব নির্বাচন কমিশন দাবী করতেই পারে।
সবচেয়ে কষ্ট লেগেছে ভোটের যে অনিয়ম হয়েছে, তা হয়েছে আমাদের শিক্ষক সমাজের হাত দিয়ে। অধিকাংশ কেন্দ্রের প্রিসাইডং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডং অফিসার পুলিং অফিসার আমাদের স্কুল এবং কলেজের শিক্ষক। তাঁদের হাত দিয়ে এই নির্বাচনের অনিয়মটা হয়েছে। শিক্ষক একটি মহৎ পেশা । আমাদের ছাত্ররা তাঁদের কাছ থেকে নৈতিকতা শিখবে । চরিত্র গঠন করবে। তারাই যদি আজকে একটি দেশের শাসক নির্বাচনের অনিয়মের সাথে জড়িত হয়ে পড়ে তা হলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার নৈতিকতা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
এই নির্বাচনে বিরোধী দল ক্ষমতাসীনদের চেয়ে গণতান্ত্রিক এটা যেমন প্রমাণ করতে পারে নি, তেমনি যুদ্ধাপরাধী শক্তির সাথে বিরোধী দলের আঁতাত পুরা নির্বাচন ব্যবস্থাকে প্রভাবান্বিত করেছে। আমাদের জনসাধারণের কাছে, আমাদের তরুণ সমাজের কাছে গণতন্ত্র লড়াইয়ের তুলনায় অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াইকে প্রাধান্য দিয়েছে। ফলে, ক্ষমতাসীনরা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি নির্মূল করতে গিয়ে জনগণের এই মৌন সম্মতির পুরা সুযোগ কাজে লাগিয়েছে।
সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে অভ্যুদয়ের পর সংবিধান রচিত হলেও তা এ দেশের জনগণের সুষ্ঠ নির্বাচনের পরিবেশ এবং নিশ্চয়তা কোনটাই দিতে পারে নি। কারণ, আমাদের রাজনীতিবিদরাও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি আত্মস্থ করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের জনপ্রশাসন এবং আইনশৃক্সক্ষলা বাহিনী ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল, সরকার এবং রাষ্ট্র এই তিনটার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে সক্ষম হয় নি। ফলে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, সরকারে প্রতি আনুগত্য এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের হস্তক্ষেপ কোনটাকে প্রাধান্য দিবে এই ব্যাপরে সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে পারে নি। এই না পারার ব্যর্থতার কারণ আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থাপনা ব্রিটিশ-পাকিস্তান আমল থেকে একটি উপনিবেশ শক্তির তাঁবেদারী ব্যবস্থাাপনা হিসেবে কাজ করেছে। যা ছিল দেশ বিরোধী। গণবিরোধী। এর পূর্বে নবাবী আমলে ছিল স্বৈরাচার প্রশাসন, যার প্রধান কাজ ছিল ষড়যন্ত্র এবং হত্যার মাধ্যমে শাসক বদলানো। এর পূর্বে মোঘল আমলেও মোঘল স¤্রাট তথা দিল্লী প্রশাসনের তাঁবেদারী করা। এর পূর্বে ২০০ বছর ধরে বাংলায় যে স্বাধীন সুলতানাত ছিল সেখানেও স্বৈরাচার, ষড়যন্ত্র এবং হত্যার মাধ্যমে শাসক বদল হতো। ফলে, হাজার বছর ধরে জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করে যে শাসন ব্যবস্থা চালু হয়েছে , তা থেকে আমাদের শতভাগ উত্তরণ এতো সহজ কাজ নয়। আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার চরিত্র বা আচরণ হাজার বছরের উত্তারাধিকার সূত্রে বহন করা একটি সংষ্কৃতি রাতারতি বদলে ফেলা কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়।
আজকের যুগে পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে হয়তো সমন্বয় করে কিছুটা জনমুখীপ্রবণতা দেখা দিবে। কিন্তু তাঁর মূল প্রবণতা থাকবে হাজার বছরের উত্তারধিকার সুত্রে বহন করা স্বৈারাচার, ষড়যন্ত্র এবং আধিপত্যকামী মানসিকতা। ফলে, আমাদের রাষ্ট্র-ব্যবস্থাপনাকে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ধারণ করার এবং রাষ্ট্র, সরকার এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করার মত দক্ষতা অর্জন, সেই সাথে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া স্বাধীন দেশের সংস্কৃতি বিকশিত করার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক উদ্যোগ বা সাংস্কৃতিক বিপ্লব। স্বাধীনতার এতো বছর পরেও এমন কোন উদ্যোগ বাংলাদেশে এখনও পরিলক্ষিত হয় নি। একজন রাষ্ট্রনায়কেরর উত্থান ঘটে নি, যিনি আমাদের রাষ্ট্র-ব্যবস্থাপনাকে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির রক্ষাকবচ হিসেবে রূপান্তর করবেন।
আমরা বার বার বলি সংসদীয় গণতন্ত্রে গণতন্ত্র চর্চার কেন্দ্র হচ্ছে জাতীয় সংসদ ( পার্লামেন্ট) এবং রাজনৈতিক দল। আমাদের রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এখনও চালু হয় নি। কারণ, রাজনৈতিক দলের নেতারা দলের সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হয় না। রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন তৃণমূল কর্মীদের ভোটে নির্ধারিত হয় না। নেতাদের সমালোচনা করলে রাজনৈতিক দলে থাকা যায় না। দলের ভিতর সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার কোন পরিবেশ নেই। অথচ, এই রাজনৈতিক দলসমূহ নির্বাচন কমিশনের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে ক্ষমতাসীনদের কাছে গণতন্ত্র প্রত্যাশা করে, সুষ্ঠু নির্বাচন প্রত্যাশা করে, অবাধ ভোটের সুযোগ দাবী করে। ক্ষমতায় গেলেও তারা পূর্বের ক্ষমতাসীনদের মত আচরণ করে। এটা হলো আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আর, দুর্নীতি এবং রাতারতি অর্থ উপার্জানের কথা নাইবা বললাম। এবার সরকারী এবং বিরোধীদলের মনোনয়ন আবেদন করার জন্য যে অর্থ ধার্য করেছে তা টেন্ডারপত্র বিক্রয় বলে মনে হয়েছে। এই মনোনয়নের আবদেন পত্র বিক্রয়ে কে কত টাকা আয় করেছে তার প্রতিযোগিতা দেখা গিয়েছে। তথাকথিত বাম দলগুলিও এই টেন্ডার (মনোনয়ন) বাণিজ্য থেকে মুক্ত হতে পারে নি। মনোনয়ন নিতে কার কত খরচ হয়েছে তা প্রকাশ পায় নি। ফলে, রাজনীতি চলে গিয়েছে ব্যবসায়ীদের হাতে। রাজনীতিবিদদের হাতে রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে না পারলে সুষ্ঠু নির্বাচন আমরা কেন চাইবো ? কার জন্য চাইবো?
গণতন্ত্র মানে শুধু নির্বাচন নয়। অনেক কিছুর সম্মিলনের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়। তার মধ্যে প্রথমত মত প্রকাশের স্বাধীনতা, দ্বিতীয়ত সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা, তৃতীয়ত আইনের শাসন, চতুর্থত ধর্ম পালনের স্বাধীনতা, পঞ্চমত শাসক শ্রেণীর সমালোচনার অধিকার, শাসকশ্রেণী নির্বাচনে ভোট প্রদানের অধিকার। সভা করার অধিকার প্রভৃতি। তাই, শুধু নির্বাচন দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে বিচার করা যায় না। একটি স্বাধীন দেশের জনগণের সংস্কৃতির মানই নির্ধারণ করে দেয় ঐ দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ, গণতান্ত্রিক অধিকার, সেই সাথে অন্যান্য মৌলিক অধিকার। আমরা সুষ্ঠু ভোট প্রদান এবং গ্রহণের সংস্কৃতি এখনও অর্জন করতে পারি নি। ফলে, আমাদের দেশের নির্বাচন নিয়ে পূর্বোল্লিখিত অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ চলতে থাকবে, যতক্ষণ না পর্যন্ত অন্যদের সমালোচনার পূর্বে নিজেরা এ সকল কাজ থেকে বিরত থাকবো। এখান থেকে বের হয়ে আসতে হলে রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা চালু করা যেমন অপরিহার্য, তেমনি প্রত্যেক নাগরিকের নিজেদেরকেই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি আত্মস্থ করার জন্য প্রচেষ্টা চালাতে হবে। কারণ, ব্যক্তির সমষ্টি হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্র। এটা শুধু ক্ষমতাসীনদের দায়িত্ব নয়, এই দায়িত্ব বিরোধীদলের, আমাদের এবং সকলের।

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।

Share