নীড়পাতা » জেলা-উপজেলা-গ্রাম » ভারতে ধরপাকড়, রোহিঙ্গারা সীমান্ত ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশে

নিরাপদ গন্তব্যস্থান যেন বাংলাদেশ

ভারতে ধরপাকড়, রোহিঙ্গারা সীমান্ত ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশে

কায়সার হামিদ মানিক, উখিয়া

ভারত থেকে বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গারা। ভারতে ধর পাকড় করাসহ নানা কঠোরতায় এখন নিরাপত্তাহীনতার মুখে রোহিঙ্গারা। সেখানে থাকা রোহিঙ্গাদের অনেকে গোপনে সীমান্ত ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে। গত ৫ দিনে উখিয়ার কুতুপালংয়ে ভারত থেকে পালিয়ে আসা ৭৪ জন রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। অন্যদিকে সৌদিআরব থেকে ১৩ জনের একটি রোহিঙ্গার দলকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছে, যারা এখনো কক্সবাজারের কোন আশ্রয় শিবিরে আসেনি। মালয়েশিয়া, দুবাই, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকেও রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসছে। মূলত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী সকল রোহিঙ্গাদের নিরাপদ গন্তব্য স্থল এখন যেন বাংলাদেশ। একাধিক বিদেশি গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহ¯পতিবার ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ৫ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারের নিকট হন্তান্তর করেছে। ভারতের মণীপুর সীমান্ত দিয়ে একই পরিবারের মো. আয়াজ, রিয়াজ আলী, আহমদ হোছাইন, তৈয়বা খাতুন ও আজিদা বেগমকে মিয়ানমার ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। ২০১৪ সালে রাখাইন থেকে ভারতে অনুপ্রবেশকালে তারা আটক হয়ে আসামের তেজপুর জেলে বন্দী ছিল। ঐ জেলে আরো ১০ জন রোহিঙ্গা এখনো বন্দী রয়েছে। গত অক্টোবরে ৭ জনের রোহিঙ্গার প্রথম দলটিকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মিয়ানমারের নিকট হস্তাান্তর করেছিল। তাদের কি অবস্থা তা জানা যায়নি।
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এখনো রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার মত অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়নি উল্লেখ করে রোহিঙ্গাদের জোর করে ফেরত না পাঠানোর অনুরোধ সত্ত্বেও ভারত দ্বিতীয় দফায় ৫ জন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার ফেরত পাঠাল। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার তালিকাভুক্ত ১৮ হাজার, অনিবন্ধিত আরো ২২ হাজারসহ ৪০ হাজারের মত রোহিঙ্গা ভারতের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করছে। জাতিসংঘ এসব অসহায় রোহিঙ্গাদের মানবিক সাহায্য সহযোগিতা প্রদানের সুযোগ চাইলেও ভারত তাতে রাজি হচ্ছে না বলে জানা গেছে।
ভারত থেকে রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো, ধর পাকড় করা, আয় রোজগারসহ নানা সমস্যায় পড়া শত শত রোহিঙ্গা দালালের মাধ্যমে গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে বলে জানা গেছে। গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা এ ধরনের (গত শনিবার থেকে মঙ্গলবার ) ৭৪ জন রোহিঙ্গাকে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং আশ্রয় শিবিরে (ট্রানজিট ক্যাম্পে) আশ্রয় দেওয়া হয়েছে বলে কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির ইনচার্জ ও সহকারী কমিশনার মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন। এসব রোহিঙ্গাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু বলে তিনি জানান। এরা ভারতের জম্মু, কাশ্মীর, দিল্লী, ফরিদাবাদসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পালিয়ে আসছে বলে খবর পাওয়া গেছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় স্থল কুতুপালং ট্রানজিট ক্যাম্পে কঠোর কড়াকড়ি থাকায় আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
খবর নিয়ে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার হযরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে সৌদিআরব কর্তৃপক্ষ ১৩ জন রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছে। এসব রোহিঙ্গাদের প্রায় সকলে ৫/৭ বছর যাবৎ সৌদিআরবের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করে আসছিল। সম্প্রতি সৌদি সরকার ঐসব রোহিঙ্গাদের অবস্থানের মেয়াদ বা ভিসা ও আকামার মেয়াদ শেষ হওয়ায় তাদের আটক করে ডিটেনশন কেন্দ্রে রেখেছিল। যদিও এরা মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গা হলেও তারা বিভিন্ন সময় দালালের মাধ্যমে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে সৌদিআরবসহ বিভিন্ন দেশে অভিবাসিত হয়েছিল। এ ধরনের আরো কয়েক শতাধিক রোহিঙ্গা সৌদিআরবের জেদ্দার বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে বাংলাদেশে আসার অপেক্ষায় রয়েছে বলে রোহিঙ্গারা জানিয়েছে। এ ছাড়াও মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে অবস্থান করায় অনেক রোহিঙ্গা আটক অবস্থায় সে দেশের জেলে রয়েছে। এদেরও অনেকে দালালের মাধ্যমে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ভাগিয়ে নিয়ে বাংলাদেশে তাদের আত্মীয় স্বজনের নিকট চলে আসছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, অষ্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে তাদের আত্মীয় স্বজনদের নিকট বাংলাদেশে ফেরত আসছে। এসব দেশ থেকে ফেরত আসা রোহিঙ্গাদের একটি অংশ কক্সবাজার, বান্দরবান ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় তাদের আত্মীয় স্বজনদের কাছে গিয়েও আশ্রয় নিচ্ছে বলে তারা জানান।
কুতুপালং এলাকার স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা মো. নুরুল হক খান বলেন, এমনিতে অতিরিক্ত রোহিঙ্গার ভারে উখিয়া ও টেকনাফের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। তার ওপর এখনো মিয়ানমার, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ বন্ধ হয়নি।
উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী উদ্বেগ প্রকাশ করে জন নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় এনে এ ব্যাপারে সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান।

Share