নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » দেশের অগ্রযাত্রার পাথেয় হোক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা

দেশের অগ্রযাত্রার পাথেয় হোক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা

সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে দেশ ও জাতির অগ্রযাত্রায় ঘটে নানা রূপান্তর বাংলাদেশ নানা সূচকে বিশে^র মডেল হয়ে আজ নি¤œমধ্য আয়ের স্তরে পেরিয়ে উচ্চমধ্য আয়ের রাষ্ট্রে পরিণত হতে চলেছে। মূলত এখনকার মতোই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অক্ষুণœ থাকলে বাঙালি জাতি জগৎসভায় গৌরবের স্থান লাভ করবে।
কিছুকাল আগে ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যা- সায়েন্সেস ইউআইটিএস এর দ্বিতীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এসেছিলেন মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী সুনামধন্য ড. মাহাথির মোহাম্মদ। সাংবাদিক সমাজের সাথে সেদিনকার আলাপচারিতায় ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে দেশ ও সমাজের উন্নয়নে রাজনীতবিদদের অনুসরণীয় দায়-দায়িত্ব নিয়ে তিনি নানা আলাপচারিতা করেছিলেন। সেই আলাপে ড. মাহাথির মোহাম্মদ যা বলেছিলেন তা আমাদের রাজনীতিবিদদের নিশ্চয়ই আত্মসমালোচনা ও উপলব্ধিতে ভাবনার যোগান দিয়েছে বলে আশা করছি।
ড. মাহাথির মোহাম্মদের বক্তব্যের সারবস্তু ছিলো, “গণতান্ত্রিক পদ্ধতির নির্বাচনে একটি দল হারবে, আরেকটি দল জিতবে। এই নীতিতে বিশ^াস করলে অর্থাৎ গণতন্ত্রী হয়েও যদি কেউ সংসদ বয়কট করে বা নির্বাচনী ফল প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে সেখানে জাতি জয় লাভ করে না। জাতীয় নির্বাচনে একটি দল জিতলে, অন্যদলকে পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে জর্জ বুশের জয়লাভ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তারপরও সেখানে জাতির জয়লাভের প্রয়োজনে সেটা মেনে নেওয়া হয়েছিলো শেষ পর্যন্ত।
আসলে, বিশৃঙ্খলা কোনো শুভ ফলাফল আনে না। মনে রাখতে হবে, কোনো দেশের উন্নতির জন্য স্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রয়োজন। রাজপথে বিক্ষোভ ও ধ্বংসাত্মক কর্মকা- চালিয়ে কোনো সরকারকে সরানো হলে অতঃপর যারা ক্ষমতায় যাবে তাদের ক্ষেত্রেও একই পরিণতি হবে। সুতরাং নির্বাচনে যারা পরাজিত হয় তাদের ধৈর্য ধরতে হবে, অপেক্ষা করতে হবে পরবর্তী নির্বাচনের জন্য। অনেক উন্নত দেশেও কখনও কখনও মোট ভোটারের মাত্র ২৫ ভাগ ভোটাধিকার প্রয়োগ করে। তার মধ্যে ১৫ ভাগ ভোট পেয়েও সরকার গঠন করতে দেখা যায়। সে অবস্থায়ও জনরায় পেতে ব্যর্থ রাজনৈতিক দলগুলোকে পরবর্তী নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
জাতীয় ইস্যুতে ধর্মঘট তথা স্ট্রাইক হতেই পারে। প্রয়োজন মনে করলে জনগণ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে তাতে অংশ নেবে। কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত ধর্মঘট কাম্য নয়। তবে, জাতীয় প্রয়োজনে যৌক্তিক (জাস্টিফাইড) ধর্মঘট ডাকলে সেটা ভিন্ন কথা। একটি দেশের উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। কারণ, এর উপরই বিদেশী বিনিয়োগ নির্ভর করে। বিদেশী বিনিয়োগ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই সংশ্লিষ্ট দেশের উন্নয়ন হবে। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোরই দায়িত্ব স্থিতিশীলতা বজায় রেখে বিদেশী বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া। মাহাথির মোহাম্মদের অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ উল্লিখিত পর্যবেক্ষণ আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য প্রযোজ্য।
বাংলাদেশের মানুষ কঠিন সঙ্কটের মাঝে জীবনযাপন করছে দীর্ঘকাল। দেশের স্বাধীনতার চার দশকেও বেশি কাল পেরিয়ে এসে এখনও তাকে শত্রু-মিত্র চেনার প্রয়াস চালিয়ে যেতে হচ্ছে। কে তার শত্রু, কে তার মিত্র? কার সাথে অবস্থান নিলে এখানকার হাজার বছরের বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ স্বাভাবিক ধারায় হবে, সংস্কৃতি কৃষ্টি ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয় স্বকীয় মহিমায় মহীয়ান হবে? বিগত চার দশকে রাজনৈতিক উত্থান-পতনের দিনগুলোতে বাঙালির আত্মানুসন্ধানের এমন প্রচেষ্টা কী ভাবে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্রে হয়েছে, তা আমার ফেলে আসা অতীতের ইতিহাসের প্রতি চোখ ফেললেই দেখতে পাই। এক একটি সঙ্কটের মুহূর্ত এসেছে বাঙলার সাধারণ মানুষের সামনে। আবার, সেই সঙ্কটকে মোকাবেলার জন্য এক একটি চেতনাসমৃদ্ধ প্রজন্মের উত্থান এ জাতি প্রত্যক্ষ করেছে। দীপ্তি ছড়ানো প্রতিবাদী এসব প্রজন্মের জন্ম হয়েছে আমাদের অস্থির সমাজের ভেতর থেকেই। এখন এ জাতি নির্মাণে পথ ধরেই চলছে নব-নেতৃত্বের পরিচালনায়। আমরা কি আগামী দিনগুলোতে এই গতিধারা ধ্বংস করে দেবো? এটি একটি মহা দুঃস্বপ্ন জাগানো প্রশ্ন।
জাতিসত্তার চিরন্তন বিকাশের শক্তির ধারাকে আত্মস্থ করেই আমাদের নবীন প্রজন্ম সর্বদাই প্রতিক্রিয়াশীল চক্রকে পরাভূত করে এগিয়ে গেছে। এটাই ইতিহাসের সত্যিকারের চিত্র আশ^াসের বার্তা। এটাই এই জাতির অন্তর্নিহিত শক্তি। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার পথে এই শক্তিই আমাদের পাথেয়।

Share