সাইফুল আলম ও ইমাম হোসাইন রাজু

সমাজে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের জন্য কিছু করার চিন্তা থেকেই আমরা ছয় জন মিলে ২০১৫ সালের ১৩ নভেম্বর ৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোরশেদ আলমের সাথে আলাপ করি। তিনি আমাদের কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত হয়ে সংঘবদ্ধ হয়ে কাজ করার তাগিদ দেন এবং একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ার পরামর্শ দেন। এরপর থেকেই ‘বিজয় কেতন’ নামের সংগঠন গড়ে আমরা কার্যক্রম শুরু করি। সেই থেকে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সাথে নিয়ে আজও কাজ করে যাচ্ছি। বুধবার দৈনিক পূর্বকোণের সাপ্তাহিক নিয়মিত আয়োজন ‘পরিবর্তনের কারিগর’ অনুষ্ঠানে এসে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘বিজয় কেতন’ প্রতিষ্ঠার গল্প এভাবেই তুলে ধরেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রিয়া দাশ চায়না। সম্পূর্ণ নারী নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা ও ৮ নম্বর শুলকবহর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. মোরশেদ আলম, উপদেষ্টা এম এ হাশেম, সদস্য মেহেরুন্নেসা জেসী, আফজালুল বিনতে মতিন ও আকলিমা আক্তার পূর্বকোণ স্টুডিওতে উপস্থিত ছিলেন।
পূর্বকোণ : এ ধরনের সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবার কাজ করার অনুপ্রেরণা কখন থেকে এবং কীভাবে পেলেন?
মোরশেদ আলম : একজন মানুষ হিসেবে আমি যেটা মনে করি তা হল, মানুষ বেঁচে থাকে মানুষের মাঝে। এ পৃথিবীতে এসেছি অল্প সময়ের জন্য। তাই মানুষের জন্য কিছু করতে পারাটাই হবে আমাদের জীবনের সার্থকতা। আর আমি ছোটবেলা থেকেই এ ধরনের সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। এখনও আছি। যার মধ্যে বিজয়ের কেতন অন্যতম। এই সংগঠনের মাধ্যমে মানুষের জন্য কিছু করতে চেষ্টা করছি।
পূর্বকোণ : সংগঠনের নামকরণ ‘বিজয় কেতন’ কেন হলো ?
মোরশেদ আলম : বিজয় মানে জয় আর কেতন মানে পতাকা। আমাদের দেশে এখনও নারীরা অনেক পিছিয়ে। আমরা হয়তো নারীদের কিছু কিছু বিজয়ের গল্প শুনি। কিন্তু আমরা সামগ্রিকভাবে যদি চিন্তা করি তাহলে বলতে হবে নারীরা এখনও অনেকটা পিছিয়ে। এ কারণেই আমাদের সংগঠনের নাম বিজয়ের কেতন রাখা হয়েছে। যাতে পিছিয়ে পড়া নারীরা বিজয়ের পতাকা ছিনিয়ে আনতে পারে।
পূর্বকোণ : কিভাবে এই সংগঠনের সাথে জড়িত হলেন ?
আকলিমা আক্তার : আমার এক বন্ধুর মাধ্যমে মোরশেদ ভাইয়ের সঙ্গে পরিচিত হই। তখন তিনি বলেন, তোমরাতো অনেক সংগঠনে কাজ করো, এটাও একটু দেখো। এরপর এর কাজকর্ম দেখে আমি নিজেও অনুপ্রাণিত হলাম। কেননা আমি অনেকগুলো সামাজিক সংগঠনে কাজ করেছি। কিন্তু এই সংগঠনের কার্যক্রম সত্যি অসাধারণ। যার কারণে আমিও সংগঠনের সাথে যুক্ত হই।
পূর্বকোণ : বিজয় কেতনের কার্যক্রমগুলো কী ?
আকলিমা আক্তার : সংগঠনের যাত্রার শুরু থেকেই আমরা অনেকগুলো কাজ করেছি। তার মধ্যে ব্যতিক্রমধর্মী কাজ হলো- প্রতিবছর ভালোবাসা দিবসে পথশিশুদের সাথে সময় কাটানো, তাদের সকলের জন্য লাল ড্রেস উপহার দিই এবং সাংস্কৃতিক নানা কর্মকা- ও খাওয়া-দাওয়ার মাধ্যমে দিনটি উদযাপন করি। এ পর্যন্ত অসহায় শীতার্ত দুইশ মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করেছি। এছাড়া মা দিবসে সংগ্রামী মায়েদের নিয়ে তাদের সাথে সময় কাটানো এবং তাদের সহযোগিতা করা। এর মধ্যে সংগ্রামী সফল চার মাকে এ বছর সম্মাননা দেয়া হয়েছে। জাতীয় দিবসের গুরুত্ব তুলে ধরাসহ বিভিন্ন ইভেন্টের আয়োজন, শারীরিক প্রতিবন্ধীদের মাঝে হুইলচেয়ার বিতরণ, পিছিয়ে পড়া ৬০ জন নারীর মাঝে সেলাই মেশিন বিতরণ, দুস্থ মানুষের সেবায় ফ্রি হেলথ ক্যাম্পেইন, বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম, রিকশা চালকদের মাঝে রেইনকোট বিতরণ, ঈদবস্ত্র বিতরণ, নারীদের সচেতনতার জন্য ফ্রি ক্যাম্পেইন ও চেকআপসহ অপারেশনের ব্যবস্থা করা, নির্যাতিত নারী, শিশু এবং বাল্যবিবাহ রোধ ও যৌতুক বিরোধী বিভিন্ন কার্যক্রম করেছি।
পূর্বকোণ : সংগঠনের সাথে কীভাবে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন, মনে আছে? সংগঠনে আপনার কাজ কি?
রিয়া দাশ চায়না : আমরা কয়েকজন মিলে ভেবেছিলাম, সমাজে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কিছু করার এবং তাদের পাশে দাঁড়ানোর। এ বিষয় নিয়ে মোরশেদ ভাইয়ের সঙ্গে আলোচনা করি। তিনিও উৎসাহ এবং পরামর্শ দেন। তারপর মাত্র ছয় জন নারী একত্রিত হয়ে ২০১৫ সালের ১৩ নভেম্বর সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে আমাদের ৫০ জন সক্রিয় নারী সদস্য আছে। যাদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী। বাকীরা গৃহিনী কিংবা পেশাজীবী। তবে উপদেষ্টাম-লীতে কয়েকজন পুরুষ সদস্য রয়েছে।
পূর্বকোণ : আপনি শিক্ষকতায় আছেন। এ ধরনের সংগঠনে কেন যুক্ত হলেন?
এম এ হাশেম : যখন পেশাগত জীবনে প্রবেশ করি তখন মনে হল- নিজেকে সমাজ পরিবর্তনের সাথে যুক্ত করা দরকার। পরে ছোটবেলার বন্ধু মোরশেদের সঙ্গে আলাপকালে ২০১৬ সালে ভালোবাসা দিবসে আমাকে আমন্ত্রণ করে। সেখানে পথশিশুদের নিয়ে যে আয়োজন করা হয়েছে তা আমাকে আকর্ষণ করে। এরপর থেকেই আমি এ সংগঠনের সাথে যুক্ত হই। তাদের জনহিতকর অনেক কার্যক্রম নিয়মিতভাবে হচ্ছে। যেগুলোর সুবাদে সমাজে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে আমার বিশ^াস।
পূর্বকোণ : নানা ধরণের সামাজিক কাজ করার পাশাপাশি আপনি ইদানিং দেখছি ন্যায্যমূল্যে ভোগ্যপণ্য বিক্রি করার উদ্যোগ নিয়েছেন, এটা করার কারণ কী?
মোরশেদ আলম : যারা নিত্যপণ্য সঠিক দামে পায় না তাদেরকে ন্যায্যমূল্যে পণ্যটি পৌঁছে দিতেই আসলে এ ব্যবস্থা করেছি। আমার ওয়ার্ডের মানুষ তাদের সেবার জন্য আমাকে নির্বাচন করেছে তাই আমিও তাদের জন্য কিছু করতে চাই। এক সপ্তাহ আগে নতুন করে আরেকটি উদ্যোগ নিয়েছি। তিনটি ট্রাকে করে শুলকবহর ওয়ার্ডে শীতকালীন সবজি ভর্তুকি মূল্যে (অর্থাৎ প্রতিকেজি ১০টাকা) বিক্রির পদক্ষেপ নিয়েছি। এলাকাবাসীর কাছ থেকে বেশ সাড়া পেয়েছি ।
পূর্বকোণ : বিজয় কেতন’র লক্ষ্য সম্পর্কে কিছু বলুন?
আফজালুল বিনতে মতিন : সমাজের পিছিয়ে পড়া সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের সামনে এগিয়ে নেয়া, পিছিয়ে পড়া নারী যারা তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না তাদের বাধা দূর করাসহ পিছিয়ে পড়াদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে দেশকে সমৃদ্ধশীল করে গড়ে তোলাই বিজয় কেতন’র লক্ষ্য।
পূর্বকোণ : বিজয় কেতনের স্কুল কীভাবে পরিচালনা করা হয় ? স্কুল পরিচালনায় তহবিল কোথা থেকে আসে?
এম এ হাশেম : আমাদের সদস্যরাই মূলত সময় ভাগ করে স্কুল পরিচালনা করে থাকেন। বর্তমানে স্কুলে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত ৩০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের সকল খরচ আপাতত আমরাই বহন করি।
পূর্বকোণ : বিজয় কেতন’র ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী ?
মেহেরুন নেসা জেসি : যারা মেধাবী কিন্তু দরিদ্র তাদের জন্য শিক্ষা বৃত্তির ব্যবস্থা করা, আমাদের স্কুলটি বৃহৎ পরিসরে নিয়ে যাওয়া এবং একটি স্থায়ী ঠিকানায় স্কুলটি তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পূর্বকোণ : বিজয়ের কেতন’র কার্যক্রম কি শুধু চট্টগ্রামে সীমাবদ্ধ থাকবে নাকি দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া হবে?
মোরশেদ আলম : ইতোমধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা করছি। খুব শিগগিরই সংগঠনটির কার্যক্রম সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে চাই। এভাবেই একদিন ‘বিজয় কেতন’ দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে।
পূর্বকোণ : সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের খাবারের বিষয়টি সম্পর্কে একটু বলুন?
মোরশেদ আলম : শিশুদের কষ্ট দেখে আমরা অনেকেই ফেসবুকে নানান পোস্ট দেই। কিন্তু আমাদের আশপাশে যেসব শিশু খেতে না পেয়ে ডাস্টবিন থেকে খাবার কুড়িয়ে খায় তাদের পাশ কেটে আমরা চলে গেলেও একবারও তাদের জিজ্ঞেস করি না। যারা অনাহারে থাকে, কষ্টে থাকে আমরা তাদের পাশে দাঁড়াই না। তাই আমি এসব জনগোষ্ঠীর জন্য কিছু করতে চেয়েছি। আমি আমার ওয়ার্ডের রেস্টুরেন্ট মালিকদের সঙ্গে কথা বলেছি। সকলেই আমার আহবানে সাড়া দিয়ে দুস্থদের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রতিটি রেস্টুরেন্ট মালিক যদি একজন কিংবা দুইজন শিশুর খাবারের দায়িত্ব নেন তাহলে আমরা কমপক্ষে একশ শিশুর খাবারের ব্যবস্থা করতে পারব। আমরা আগামী সপ্তাহ থেকে এটা শুরু করবো। এ ব্যাপারে আমার একটি স্বপ্ন আছে। সেটা হলো- আমার এই পরিকল্পনা যদি সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে অনেক ক্ষুধার্ত মানুষ উপকৃত হবেন। যেমন, সারাদেশে এক লাখ রেস্তোরাঁ মালিক যদি গড়ে দুই জন করে দুস্থ ও অক্ষম মানুষের আহারের ব্যবস্থা করেন তাহলে দুই লাখ অভুক্ত ব্যক্তির খাবারের চিন্তা করতে হয় না।
যোগাযোগের ঠিকানা: বিজয় কেতন, বিজয় কেতন বিদ্যানিকেতন, তুলাতলী (চট্টগ্রাম সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পেছনে)। মোবাইল : ০১৮১২-০৭৯৭৬৬
ফেসবুক গ্রুপ : বিজয় কেতন

Share
  • 277
    Shares