নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » নোতুন মন্ত্রিসভা : প্রধানমন্ত্রীর কৌশলী আস্থার সংসার

নোতুন মন্ত্রিসভা : প্রধানমন্ত্রীর কৌশলী আস্থার সংসার

একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিজেদের অবস্থানে এখন সুসংহত। অতীতের নির্বাচনগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকলেও এবারের নির্বাচন নিয়ে আগের মতো একই ধরনের অভিযোগ তোলা যাচ্ছে না। যদিও, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপিসহ বিরোধী পক্ষীয় দলজোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ এনে কর্মসূচী ঘোষণা করেছেন। তারা নির্বাচন কমিশনের কাছে, বিগত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলের সঠিক অনুলিপি চেয়েছেন। তাঁদের বিশ^াস, এই অনুলিপি পেলে তা আদালতে উপস্থাপন করে তাঁরা প্রমাণ করতে পারবেন যে, ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশে প্রকৃত অর্থে গ্রহণযোগ্য কোনো নির্বাচনই হয় নি। গণতন্ত্রের অভিযাত্রা অটুট ও গতিময় রাখতে প্রার্থিত অনুলিপি প্রাপ্তির সকল ব্যবস্থা হওয়া আবশ্যক বলেই মনে করি।
বাস্তবতার চিত্রটি হলো, জনগণের কাছে যে বিশ^াসটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে, তা হলো, দৃশ্যত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট-এর ছাতার নিচে অবস্থান নিয়েও বিএনপি ও জামায়াত ইসলামী দল কার্যত নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দাঁড়াতেই পারে নি। ফলাফল দেখেই বোঝা যায়, জনগণ – বিশেষ করে এবারের নবীন ভোটারদের বিশাল অংশটি তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। তাছাড়া, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট প্রথমদিকে জনগণের মাঝে কিছুটা কৌতূহল জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হলেও, ক্রমশ তাদের কথা আর কাজের মধ্যে বৈপরীত্যের টানা-পড়েন দেশবাসীর সামনে যে ছবি প্রকাশ করে গেছে তাতে ভোটারবৃন্দের বিশাল অংশ আস্থা স্থাপনের জন্য ভরসা করতে পারে নি। জামায়াতের সাথে বিএনপির সংশ্লিষ্টতা এবং তাদেরকে সাথে নিয়ে নির্বাচন করা-না-করার মধ্যে যে ধাঁধা ঐক্যফ্রন্ট সৃষ্টি করেছিল, তাতে এ দেশের প্রকৃত ইতিহাসজ্ঞান সমৃদ্ধ জনগোষ্ঠী বলতে গেলে ঐক্যফ্রন্টের এ ধরনের দোলাচলে দ্বিধায় ভুগেছে। তাছাড়া, নব গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে জিতে গেলে সরকার গঠন ও দেশ পরিচালনার ভার কার হাতে অর্পিত হবে – এমন প্রশ্ন ও শঙ্কা নিয়েও দেশবাসীর মনে দুর্ভাবনার জন্ম হয়েছিলো।
মহাজোটের সাংসদবৃন্দ ও জাতীয় পার্টির বিজয়ী সদস্যরা শপথ গ্রহণ করলেও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও তার জোট-মিত্র বিএনপির করমেয় বিজয়ী সাংসদবৃন্দ এখনও শপথ নেন নি। দেশবাসী তাদের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের প্রতীক্ষায় রয়েছে। দেশবাসীর মনে শঙ্কাও রয়েছে। দেশকে রাজনীতিবিদরা কোন্দিকে নিয়ে যেতে চান তা পরিষ্কার হলেই বোঝা যাবে, সংঘাত নাকি শান্তির পথ দেশ ও জনগণের জন্য অপেক্ষা করছে। আপাতত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কাছ থেকে যে কর্মসূচী এসেছে, তাতে মনে হচ্ছে, নির্বাচনের মাঠে ভরাডুবির কারণ অনুসন্ধান করে বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাঁরা হয়তো-বা রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়াতে চাচ্ছেন। এই ধারণা যদি যথার্থ হয়, তবে রাজনীতির আকাশে সম্ভবত দুর্যোগের কোনো কালোমেঘের আবির্ভাব ঘটবে না। জনগণও চায় যে, গণতান্ত্রিকভাবে সকলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে এদেশের রাজনীতিতে সহনশীলতার যে আবহটি রচিত হয়েছে, তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য জনগণের রায়কে সম্মান করে চলাই আগামীদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য উত্তম হবে।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাথে একীভূত হয়ে বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণ দেশের মানুষ পছন্দ করেছে। এখন ঐক্যফ্রন্টের উচিত হবে, যে সব এলাকার জনগণ ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থীদের ভোট দিয়ে কথিত-সঙ্কটময় পরিস্থিতিতেও বিজয়ী করেছেন তাকে সম্মান জানানো। অর্থাৎ শপথ নিয়ে সংসদ সদস্যের সক্রিয় দায়িত্ব পালন করে বিরোধীদলের ভূমিকা শক্তিশালী করে তোলা। ঐক্যফ্রন্ট আপাতত নির্বাচনী ট্রাইবুনালে মামলা, জাতীয় সংলাপ অনুষ্ঠান ও ভোটে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সফর ইত্যাদি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তাদের এই কর্মসূচীর মাধ্যমে তারা হয়তো এমন মতামত প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন, ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টের ধারণা মতো, তথাকথিত সরকারী মদতপুষ্ট সন্ত্রাসী বাহিনীর কর্মকা-ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে জনগণ ভোট দিতে পারেন নি। মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অতএব, বহুলকথিত সেই পুরানা দাবি, নির্দলীয় সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের অধীনে একটি পুনর্নিবাচনের আয়োজন তাঁরা চান। গণতন্ত্রের দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় এই চাওয়াটা তাঁরা চাইতে পারেন। তবে, দেশবাসী পুনর্নিবাচন চায় কি-না সেটিই সর্বাগ্রে বিবেচনার বিষয়।
কথা হলো, বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি বিশ^ব্যাপী স্বীকৃতি পেয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকালীন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল ওঠে নি। নির্বাচন পরবর্তীকালে দেশের সব শ্রেণী ও পেশার মানুষ, দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষকবৃন্দ এবং বিশে^র বিভিন্ন দেশ তথা চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত ও আরও অন্যান্য দেশ এবারের নির্বাচনকে অভিনন্দিত করেছে। এই অবস্থায় নির্বাচন নিয়ে অসন্তুষ্ট পক্ষ যতই অভিযোগের কথামালা বলতে চান, গণতান্ত্রিক পথেই তার সমাধান চাইতে হবে যুক্তিসম্মত ভাবেই। বিশ^বাসী এখন তাকিয়ে আছে একঝাঁক নবীন মন্ত্রীদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশকে কোন্ পথে কোন্ উচ্চতায় নিয়ে যেতে চান। কৌশলের পথই রাজনীতিতে প্রধান বিবেচ্য হয়ে ওঠে, যখন তা জনকল্যাণের ও জনগণের মুক্তচিন্তা প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হয়। নোতুন মন্ত্রীসভা সেই অভিযানে সফল হবে – এটাই জনগণ আশা করে।

Share