সৌমিত্র চক্রবর্তী , সীতাকু-

সীতাকু–সন্দ্বীপ সার্কেলের এডিশনাল এসপি শম্পা রানী সাহা। চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি তিনি যোগ দেন এ পদে। প্রায় এগার মাস তিনি এখানে চাকরি করছেন। কিন্তু বরাবরের মতই সাহসিকতা ও দক্ষতার সাক্ষর রেখে বেশ কয়েকটি বড় সফলতা অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুরুষদের মতো নারীরাও সমান দক্ষ। যা সর্বত্র প্রশংসিত হয়েছে।
আলোচিত এ পুলিশ অফিসারের বাড়ি নরসিংদী সদর উপজেলায়। ওই এলাকার নির্মল চন্দ্র সাহা ও হিমাংশু বালা সাহার দুই ছেলে-মেয়ের মধ্যে বড় তিনি। তার দুঃসাহসিক অভিযানের বিষয়ে এডিশনাল এসপি শম্পা রানী বলেন, ছোটবেলা থেকেই এরকম কোন চাকরির কথা মাথায় রেখেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম আমি। প্রথম প্রেরণা আমার মা। তিনি বলতেন এমনভাবে তৈরি হও যাতে দেশের কোন একটি গর্বিত বাহিনীর সদস্য হতে পারো। বাবা বলতেন শুধু নিজের জন্য না, যেন সমাজের অন্য নারীদেরও সেবা করতে পার সেভাবেই প্রস্তুতি নাও। মূলতঃ তাদের এ ইচ্ছা ও স্বপ্ন পূরণ করতে সেভাবেই প্রস্তুতি নিতে থাকি। নিজ এলাকা নরসিংদী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও মহিলা কলেজ শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে পড়াশুনা শেষ করেন। এরপর ২৮তম বিসিএস পরীক্ষায় পাস করে ২০১০ সালে এএসপি হিসেবে চাকরি পান তিনি। প্রথম যোগ দেন ঢাকা জেলা পুলিশে। তারপর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে চাকরি ও ইউএন মিশন শেষ করেন। সবখানেই দক্ষতার সাথে কাজ করায় ২০১৬ সালে এএসপি থেকে এডিশনাল এসপি হিসেবে পদোন্নতি পান। পরে দেড় বছর বান্দরবান সদর সার্কেলের দায়িত্ব পালন শেষে চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি যোগ দেন সীতাকু-ে। এখানে সীতাকু–সন্দ্বীপ সার্কেলের এডিশনাল এসপি হিসেবে কাজ করছেন। শম্পা রানী সাহা আরো বলেন, আসলে একমাত্র পুলিশের চাকরিতেই সাধারণ মানুষকে সরাসরি সহযোগিতা করার সুযোগ রয়েছে। আমি পেশাটি সেবার হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছি। যখন কোন অসহায় নারী-পুরুষ সাহায্যের জন্য আসেন দিন শেষে তাদের মুখে হাসি ফোটাতে পারলে এক অন্যরকম অনুভূতি হয়। সে সময় মনে হয় এজন্য পুলিশের চাকরি দরকার। এডিশনাল এসপি শম্পা রানী বিবাহিত। একটিমাত্র পুত্রসন্তানের জননী তিনি। তার স্বামীও সরকারি চাকরিজীবী। তিনি স্ত্রীকে সবসময় উৎসাহিত করেন। চাকরিজীবনে নিজের অন্যতম সফলতার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে চাকরিরত অবস্থায় চাঞ্চল্যকর ডক্টর ইভা হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন ও আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি বাস্তবায়ন, বান্দরবানে পাচারকারীদের হাত থেকে ১৪ জন কিশোরীকে উদ্ধার করে মা-বাবার হাতে তুলে দেয়া, সীতাকু-ের ত্রিপুরা পাড়ায় দুই কিশোরীর হত্যাকা-ে জড়িতদের দ্রুততম সময়ে গ্রেপ্তার, সর্বশেষ গত ২৫ অক্টোবর সন্দ্বীপে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও সরঞ্জামসহ কুখ্যাত দুই সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারসহ আরো অনেক সফলতা কর্মক্ষেত্রে প্রেরণা জোগাচ্ছে। তিনি জানান, প্রত্যেকটি স্টেশনে চাকরিতে সেখানকার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, সহকর্মী পুলিশ সদস্যদের আন্তরিক সহযোগিতা পেয়েছেন বলেই এসব সম্ভব হয়েছে। সর্বশেষ অভিযানেও চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার নূরে আলম মিনার দিক নির্দেশনা ও সার্বিক সহযোগিতা ছিল। এ কারণেই সফলতা এসেছে। এভাবেই ভবিষ্যতেও তার চারপাশের অবহেলিত নারী ও অসহায় মানুষের সেবা করতে চান বলে জানান এ সাহসী নারী পুলিশ সদস্য। এদিকে এডিশনাল এসপি শম্পা রানী সাহার সেবার এসব কথা যে শুধুই কথার কথা নয়, তা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত। সীতাকু- থেকে ২০ কি.মি. দুর্গম বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে দায়িত্ব পালনে যেতে হয় সন্দ্বীপেও। কিন্তু বিগত ৯ মাসে তিনি ঝড়-তুফান উপেক্ষা করেও পেশাগত দায়িত্ব পালনে এ দুই উপজেলার সর্বত্র ছুটে গেছেন সাহসিকতার সাথে। এ পর্যন্ত কোথাও তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ উঠেনি। বরং শম্পা রানীই যেন অনেকেরই শেষ ভরসার স্থলে পরিণত হয়েছে। এ বিষয়টি স্বীকার করেন এলাকার সব মানুষ। সীতাকু- ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. বেলাল হোসেন বলেন, এডিশনাল এসপি শম্পা রানী সাহা এখানে অত্যন্ত সততা ও দক্ষতার সাথে কাজ করছেন। একজন নারী হয়েও তিনি পুরুষদের চেয়েও বেশি দ্রুততায় ঘটনাস্থলে ছুটে যান।
যেকোন অপরাধ দমন কিংবা সামাজিক গঠনমূলক অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি সবাইকে প্রেরণা দিচ্ছে।
একইভাবে জনপ্রতিনিধিদের কাছেও তিনি প্রশংসিত। সীতাকু- উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এস. এম আল মামুন বলেন, যেখানেই ঘটনা সেখানেই তিনি উপস্থিত হয়ে যান দ্রুত। কাজের প্রতি নিষ্ঠা না থাকলে এমনটা সম্ভব না। একজন নারী কর্মক্ষেত্রে কোন অংশে পুরুষের চেয়ে কম নয় তার অন্যতম দৃষ্টান্ত এডিশনাল এসপি শম্পা রানী সাহা। সীতাকু-ে অল্প সময়ে প্রশংসিত হয়েছেন তিনি।
সীতাকু-ের এমপি আলহাজ দিদারুল আলম বলেন, শম্পা রানী সাহা পুলিশের একজন চৌকস অফিসার। তিনি অতি অল্পসময়ে তার দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন কাজের মাধ্যমে। মানুষ হিসেবেও তিনি খুবই ভালো মনের। এ কারণে সাধারণ মানুষ তার কাছে গিয়ে নিজেদের কথা বলতে পারছেন। এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে তিনি কর্মক্ষেত্রে আরো অনেক দূর যেতে পারবেন।

Share
  • 8
    Shares