মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

দেশে চালের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। এরইমধ্যে কৃষকের গোলায় ওঠেছে আমন ধান। সংকট না থাকার পরও চালের দাম বস্তাপ্রতি দুই থেকে তিনশ টাকা বেড়েছে। মিল মালিকদের কারসাজিতে অকারণে চালের দাম বেড়েছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। তবে চালের দাম বাড়লেও সুফল কিন্তু পাচ্ছেন না কৃষক। গত বছরের জুন মাসে চালের আমদানি শুল্কহার পুনর্বহালের কারণে চালের দাম বাড়ানো হয়েছিল। সেই সময়ে বস্তাপ্রতি আড়াইশ টাকা পর্যন্ত বেড়েছিল। চাতাল মালিক, আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী সি-িকেট কারসাজি করে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়িয়েছিলেন বলেও অভিযোগ ওঠেছিল। খাদ্য বিভাগ জানায়, গত বছরে শুল্কমুক্ত কোটায় দেশে প্রচুর চাল আমদানি করা হয়। সরকারি ও বেসরকারিভাবে এসব চাল আমদানি করা হয়েছিল। এছাড়াও গত বছর বোরো মৌসুমে সরকার চাহিদামতো ধান-চাল সংগ্রহ করে। সরকারিভাবে চালের মজুদও ভালো। এই অবস্থা বর্তমানে চালের দাম বাড়ানো অযৌক্তিক।
খাদ্য বিভাগ জানায়, চট্টগ্রামের বর্তমানে সরকারি গুদামে চাল মজুদ রয়েছে এক লাখ ২৪৬ মে.টন। গত বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত মজুদ ছিল ৬৩ হাজার ৮৪৪ মে. টন। চট্টগ্রাম জেলা খাদ্য বিভাগের পরিদর্শক (কারিগরি) দোলন দেব জানান, ‘দেশে পর্যাপ্ত চাল মজুদ রয়েছে। এছাড়াও নতুন ধান বাজারে এসেছে। এসময় চালের দাম বাড়ানো অযৌক্তিক। হয়তো নির্বাচনকে ঘিরে পরিবহন সংকটের অজুহাতে দাম বাড়ানো হয়েছে।’ প্রতিবছর সরকারের ধান ও চাল সংগ্রহ কর্মসূচিকে ঘিরে চালের দাম বাড়ানো রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। এসময় মিল মালিকদের কাছ থেকে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে খাদ্য বিভাগ। বোরো ও আমন মৌসুমে সরকার সংগ্রহ কর্মসূচি শুরু করে। সরকারকে ধান-চাল দেওয়ার অজুহাতে এসময় বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অহেতুক চালের দাম বাড়ানো হয়। পাহাড়তলী চাল ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি আলহাজ মো. জাফর আলম পূর্বকোণকে বলেন, চাল মিল মালিক ও আমদানিকারকেরা কারসাজি করে অহেতুকভাবে চালের দাম বাড়িয়েছে। দেশে পর্যাপ্ত চাল মজুদ রয়েছে এবং নতুন চাল বাজারে আসতে শুরু করেছে। এই সময়ে চালের দাম বাড়ানোর কোনো কারণ নেই। তিনি আরও বলেন, সরকারি গুদামে ধান-চাল বিক্রির অজুহাতে মিল মালিকেরা বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। সংকট দেখিয়ে ইচ্ছেকৃতভাবে দাম বাড়িয়ে দেয়।
চট্টগ্রামের চালের বড় পাইকারি বাজার চাক্তাই ও পাহাড়তলী বাজারে দেখা যায়, বেতি আতপ বিক্রি হচ্ছে মানভেদে বস্তাপ্রতি ১৭-১৮শ টাকা। গত ডিসেম্বরে তা ১৫-১৬শ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল। দেশি সিদ্ধ ১৪শ টাকা থেকে বেড়ে ১৮ শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। থাইল্যা- থেকে আমদানি করা সিদ্ধ চাল ১৫শ টাকা থেকে বেড়ে ১৬২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তবে নতুন চালের দাম বাড়েনি। পুরোনো চালের দাম বেড়েছে। পাইকারি বাজারে ভারতীয় আমদানি করা সিদ্ধ চাল কেজি ২৫ টাকা থেকে বেড়ে ২৮-৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বোরো আতপ ২৭-২৮ টাকা ও চিকন আতপ ৩৫-৩৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সিদ্ধ চাল মানভেদে ২৯-৩০ টাকা, ৩৭-৩৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আতপ ও সিদ্ধ চাল কেজিপ্রতি প্রায় তিন টাকা করে বেড়েছে। চাক্তাই শাহজালাল রাইস মিলের মালিক ও পাইকারি ব্যবসায়ী জহিরুল হক মজুমদার বলেন, মজুদ কমে আসায় পুরোনো চালের দাম কিছুটা বেড়েছে। নতুন চালের দাম বাড়েনি। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছর বাজেটের পর চাল আমদানিতে ২৮ শতাংশ শুল্ক পুনর্বহালের পর চালের দাম বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু দেশে সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রচুর চাল মজুদ ছিল। চালের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে সরকার খাদ্যবান্ধব ও ১০ টাকা দরে চাল বিক্রি কর্মসূচি চালু করে। দেশে অতিরিক্ত চাল আমদানি ও সরকারি কর্মসূচি চালুর পর পরবর্তীতে চালের দাম কমে গিয়েছিল। প্রায় ৫ মাস ধরে চালের দাম অনেকটা স্থিতিশীল ছিল। আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, উত্তরবঙ্গের ময়মনসিংহ, শান্তাহার, নওগাঁ, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, আশুগঞ্জের চাতাল মালিক ও ব্যবসায়ী সি-িকেট দীর্ঘদিন ধরে চালের বাজার জিম্মি করে রেখেছে।
চট্টগ্রাম রাইস মিল মালিক সমিতির সভাপতি শান্ত দাশ গুপ্ত বলেন, গতবছর ছিল নির্বাচনী মৌসুম। এসময়ে চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছিল। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চালের বাজার স্থিতিশীল ছিল। নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্রমান্বয়ে চালের দাম বেড়ে যায়। সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য একটি মহল অপচেষ্টা চালাচ্ছে। সিন্ডিকেট করে চালের দাম বাড়িয়েছে।

Share
  • 5
    Shares