বছর ঘুরে আমাদের সামনে এসেছে মাহে রবিউল আউয়াল-মহানবী হযরত মুহাম্ম্দ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জম্ম ও ওফাতের পূণ্যস্মৃতি বিজড়িত মাস। এ মাস আসলেই বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মহানবীর (স.) জীবন চরিত ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। মানুষের শিক্ষার জন্য, চিন্তার বিকাশের জন্য বছরের এ মাসে তার জীবনী আলোচনা সঙ্গত কারণেই জরুরী। কারণ তিনি কোন ব্যক্তি ছিলেন না, নন একজন সাধারণ মনীষী- দু’চারটি অবদানের কথা বললেই যেন তার জীবন-কথা শেষ হয়ে যাবে।
তিনি একটি দস্তুর মত বিশাল প্রতিষ্ঠান, তাঁর কাছ থেকে নয়া সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে, সামাজিক জীবনের অগণিত অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাঁর রেখে যাওয়া আইনের ধারাগুলো বিশ্বের আইন-আদালত ও চিন্তাশীল মনীষীদের মস্তিষ্ক সমৃদ্ধ করেছে। সর্বোপরি, তিনি ঘটিয়েছেন এক সফল বিপ্লব। যে বিপ্লবের অনুসারী মুসলমানরা আজ তামাম জাহান জুড়ে প্রায় দেড়শ কোটি। এগুলো এমনি হয়নি। তারা বুঝে-সুঝে অত্যন্ত ঈমান ও ভক্তিসহকারে আঁ-হযরতকে মেনে চলে, তাঁর নামে দরুদ পড়ে চোখের জ্বলে বুক ভাসায়, তাঁর নামে জান-মাল কোরবাণী দিতে তারা সদা থাকে প্রস্তুত, উদগ্রীব।
ইহুদী-খ্রিস্টান এন.জি. ও. স্ংস্থাগুলো যেভাবে পয়সা ছিটিয়ে অন্যান্য লোকদের ধর্মান্তরিত করে, মুসলমানদের এ সিষ্টেম নেই। যারা অন্য মতাদর্শ থেকে প্রতিনিয়ত ইসলাম গ্রহণ করছে তারা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা প্রতিদিন পাঁচবার আজানের ডাকে সাড়া দেয়, খোদা লা-শারীকের নামে সিজদা করে, হযরতের নামে চুমু খায়, তাঁকে ভালবাসার নানা নজরানা পেশ করে। সামান্য হুমকি-ধমকি দিলে মুসলমানরা কাবু হয়ে যাবে, আদর্শচ্যুত হবে; এমন ভাবা ঠিক নয়। কোন কোন স্থানে দু’চারজন কুলাঙ্গার মহানবীকে গালি দিলে তার মর্যাদা কমে যাবে- এ কথা ভাবাও বোকামী। আমরা কোন নবী-রাসুলকে আমাদের চোখে ছোট করে দেখি না।
কুরআন আমাদের শিক্ষা দিয়েছে আল্লাহর প্রেরিত পূর্ববর্তী সব নবী-রাসুলদের (আ.) সম্মান করতে। কিন্তু এ উদারতা নেই অন্যান্য নবীদের দাবীদার বলে চিহ্নিত ইহুদী-নাসারাদের। ইউরোপ, আরব, অনারব সর্বত্র আজ তাদের কারসাজিতে মুসলমানরা দ্বিধাবিভক্ত। ঝরছে মুসলমানদের রক্ত। ভাঙছে মুসলিম জনপদ। কোথাও ভাইয়ে ভাইয়ে যুদ্ধ ও মতভেদ লাগিয়ে দিয়ে নিজেরা ফায়দা লুটছে এক্ষেত্রে তাদের সহায়তা করছে নেতৃত্বলোভী দেশে দেশে কতিপয় মুসলমানের উচ্চ বিলাসিতা। বিজাতীয় কালচার মুসলিম দেশসমূহে এত বেশি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সত্যিকারের দ্বীন শিক্ষা, মহানবীর আদর্শ ও সুন্নাহ সে পরিমাণ প্রাধান্য বিস্তার করতে পারেনি।
এখানেই বিঘিœত আজ ইসলামী স্বকীয়তা, মানবতার শান্তি ও অগ্রগতি, সাধারণ মানুষের কর্মস্পৃহা, নীতি নৈতিকতা, নারী ও পুরুষের মধ্যে কর্মের উদারতার বদলে অসম প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও সুফল প্রাপ্তির স্থান দখল করেছে ফেসবুক, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ, ম্যাসেঞ্জার নানা নামে যুবসমাজকে অস্থির কর্মহীন কবিরে সমাজ ম্যাসাকারে সর্বনাশা খেলা। এসবের বিপক্ষে বলতে গিয়ে কখনো কখনো ইসলাম ও মহানবীর আদর্শকে সমালোচিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ ইউরোপে যখন কোন আদর্শ অন্ধকার দূরীভূত করতে পারেনি তখন আলোর মশাল জ্বালিয়েছিল কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা, বিশ্বনবীর জিন্দাদিল অনুসারীদের সরব পদচারণা। আজ সে ইতিহাস বিস্মৃত প্রায়। শুধু মুসলমান কেন, কোন আদর্শকে কুৎসা রটনার মাধ্যমে ধ্বংস করা যায় না, শুধু সাময়িক বাঁধা সৃষ্টি করা যায় মাত্র। সত্য চিরদিনই সত্য।
পূর্বেই বলেছি, রাসুলুল্লাহ (স.) অগ্রসরমান বিশ্ব সভ্যতার যে প্রভাব ও অবদান রেখেছেন তা কখনো ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবেনা। মুছে ফেলতে চাইলে সভ্যতাকে অনিবার্যতঃ থামিয়ে রাখতে হবে। সে আদিমতা, সে অন্ধকার যুগে ফিরে যেতে হবে মানুষকে যা ইতিহাসে ‘জাহেলিয়াত’ নামে চিহ্নিত। মহানবীর আদর্শের প্রতি ঈর্ষাকাতর হয়ে পশ্চিমা দেশগুলো নব্য জাহেলিয়াতকেই বিশ্ববাসীর কাছে ছাপিয়ে দিচ্ছে যেখানে হালাল হারামের বালাই নেই, শালীনতা ও নারীত্বের মূল্য নেই, যেখানে বর্ণবাদের জিন্দানে আবদ্ধ মানবতা! ইসলাম যে কোন ভাবেই প্রগতির পক্ষে কথা বলে, যুগের সাথে খাপ খাইয়ে চলার কলা- কৌশল ইসলামে রয়েছে, এর রয়েছে যে কোন সমস্যার যুগোপযোগী সমাধান। মহান পয়গাম্বরে খোদা হযরত মুহাম্মদের (স.)- এর মিশনের শ্রেষ্টত্ব এখানেই। দুনিয়ার সভ্যতার ইতিহাস তার কাছে ঋণী। আর মুসলমানদেরকে তাঁর প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা তো থাকতেই হবে। এটা মুসলমানিত্বের দাবী, মুসলিম নাম ও পরিচয় বহনের পূর্বশর্ত।
রাসুল (স.) আমাদের ঈমান বা বিশ্বাসের অংশ। আমাদের মনে রাখতে হবে তাঁর পবিত্র সুন্নাহ বা আদর্শ আমাদের পথ চলার পাথেয়। এটি মহানবীর জন্ম ও ওফাতের পুণ্য স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র মাস রবিউল আউয়ালের শিক্ষা। ইসলামের দৃষ্টিতে হুজুর (স.)- এর আদেশ নিষেধ, তাঁর যাবতীয় কাজ-কর্ম,কথাবার্তা এক কথায় তার মুখে নিঃসৃত বাণী ও গোটা কর্মময় জীবনই ইসলামী মিল্লাতের জন্য একান্ত অনুসরণীয় এক মহান আদর্শ। রাসুল প্রেরণের মূলে খোদার উদ্দেশ্্যই এই ছিল যে, উম্মত তাকে পূর্ণমাত্রায় অনুসরণ করে চলবে।
কুরআন মাজীদে স্পষ্ট ভাষায় রসুল প্রেরণের উদ্দেশ্য ঘোষনা করে বলা হয়েছেঃ ওমা আরসালনা মিররাসুলিন ইল্লা-লিয়ুতাআ বিইজনিল্লাহি; আমি রাসুল পাঠিয়েছি একমাত্র এ উদ্দেশ্য যে, খোদার অনুমতি ক্রমে তার অনুসরণ করা হবে-তাঁকে মেনে চলবে।-(নিসা-৬৪)। অপর এক আয়াতে ইরশাদ হয়েছেঃ‘রাসুল তোমাদেরকে যা কিছু দান করেন তা পূর্ণরুপে গ্রহণ কর আর যা হতে নিষেধ করেন তোমরা তা হতে বিরত থাক। খোদাকে ভয় কর; নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।”-(হাসর-৭)।

লেখক : অধ্যাপক, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খতীব

Share