১৯১৮ সালের ২৭ আগস্ট চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার মোহাম্মদপুর গ্রামের শেখ বংশে জন্মগ্রহণ করেন এই কৃতি সন্তান। তার পিতার নাম হাজী ছাদন আলী মোহাম্মদপুরে প্রাইমারী শিক্ষা শেষে রাউজান হাইস্কুলে ভর্তি হন। কুদ্দুস মাস্টার ছাত্রজীবন থেকেই সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তেমনি এক সংগঠনের নাম রাউজান ‘তরুণ সংঘ’। ঐ সংঘের সভাপতি ছিলেন নুরুল আবছার চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন নুরুল হুদা চৌধুরী এবং কুদ্দুস মাস্টার ছিলেন সাংগঠনিক সম্পাদক। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় সেই সংগঠনের উদ্যোগে ১৯৩২ সালে আমাদের দেশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রাউজান সফরে আসেন। তখন একটি শিক্ষা সম্মেলন হয় যার বাজেট ৭০০০.০০ (সাত হাজার) টাকা।
তখনকার সময় এত টাকা কিভাবে জোগাড় হবে এবং অনেক ভেবেচিন্তে কুদ্দুস মাস্টার ও নুরুল হুদা চৌধুরী বার্মা চলে গেলেন। জাহাজ কোম্পানী ফটিকছড়ির আবদুল বারি চৌধুরী থেকে ৫০০০.০০ টাকা এবং রাউজান বাসী আরও অনেকের কাছ থেকে ২০০০.০০ টাকা আদায় করে চলে আসেন। এরপর তারা দুইজন কলকাতায় গেলেন এবং কবির স্ত্রীর জন্য ৫.০০ টাকা দিয়ে একখানা শাড়ি কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং কবিকে চট্টগ্রাম আসার জন্য গাড়িভাড়া বাবদ ২০০.০০ টাকা প্রদান করেছিলেন।
যোগাযোগের অবস্থা ভাল ছিলনা বিধায় কবিকে মোহাম্মদপুরের পরিবর্তে মরহুম অলি মিয়া উকিল ও বদিউল রহমান সওদাগরের আহ্বানে কবি ঢেউয়া হাজী বাড়িতে অবস্থান করেন এবং হাজী বাড়ির পশ্চিমের মাঠে তিনদিন ধরে শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সম্মেলনে বালক কুদ্দুস প্রধান স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কবির সাথে ২ রাত একত্রে যাপন করেন।
বালক আব্দুল কুদ্দুস তাঁর সেই ভালো লাগার গীতিকার কবি কাজী নজরুল ইসলামকে কাছে পান। কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও আব্দুল কুদ্দুস মাস্টার এর মধ্যে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এবং তাই ওনাকে নজরুল বন্ধু বলে। ঐ সম্মেলনে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, ফরিদ আহম্মদ চৌধুরী ও হাফেজ বজলুর রহমান ও আরও অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে রাউজান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাশের সাথে সাথে মোহাম্মদপুর প্রাইমারী স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং তিনি প্রধান শিক্ষক থাকাকালে ১৯৩৮ সালে মোহাম্মদপুরের নুরুল হক বি.এল বাড়ির আলহাজ¦ মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম ও রহমান মঞ্জিলের আলহাজ¦ আবদুল মোনাফ সরকারি বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে তিনি জি.টি ট্রেনিং সমাপ্ত করেন। তিনি মোহাম্মদপুর, হাজী পাড়া, কেউটিয়া ও চিকদাইর মুন্সিপাড়া, মঙ্গলখালী ও চিঠিয়াপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন এবং রাউজান থানার শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন। সমাজের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে তিনি প্রবেশ করেন নি, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেননি। তিনি ছাত্রাবস্থা থেকে গ্রামের বিভিন্ন জনের থানার জিডি ও অভিযোগ, পেনশান ধারীর দরখাস্ত ও চাকুরীর দরখাস্ত লিখে দিয়ে সাহায্য করতেন। একজন মানুষ ইচ্ছে করলে অনেক মাধ্যমে সফলভাবে কাজ করতে পারেন তিনি তারও দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। শিক্ষকতা, সমাজসেবা, রাজনীতি এমনকি লেখালেখির মতো কঠিন কাজও তিনি সমানভাবে করে গেছেন জীবদ্দশায়। অনেকগুলো গুণের মাঝে একটি বিশেষ গুণ বা ক্ষমতা হচ্ছে নেতৃত্ব দেওয়ার গুণাবলী যা ওনার কাছে ছিল।
দেশ ও জাতি থেকে আমি কি পেলাম সেটা বড় কথা নয়, দেশ ও জাতিকে আমি কি দিতে পারলাম সেটাই বড় কথা। সে নীতিতে বিশ^াসী কুদ্দুস মাস্টার ছিলেন অসম্ভব দেশপ্রেমিকও। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান যখন সামরিক বাহিনীকে নিরস্ত্র বাঙালীদের ওপর আক্রমণ চালানোর নির্দেশ দিয়েছিল। যখন শুরু হয়েছিল ইতিহাসের নির্মম বর্বর গণহত্যা ঠিক তখনি কুদ্দুস মাস্টার জনগণকে পাক হানাদার বাহিনীর হাত থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন। তিনি তার মেজ ছেলে এডভোকেট আবু মোহাম্মদ হাশেমকে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য প্রেরণা যুগিয়েছিলেন। ছেলের মুক্তিযুদ্ধে যোগদানে অনেক প্রতিকূলতা সইতে হয়েছিল তাঁকে।
কুদ্দুস মাস্টারের জন্ম, শৈশব, কৈশোর হাতে খড়ি কর্মজীবন ও চিন্তাচেতনা সব কিছুই ছিল গ্রামকে ঘিরে। গ্রামকে আঁকড়ে ঘরে তিনি সারাজীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। তিনি বিশ^াস করতেন একটি দেশের উন্নতি করতে হলে প্রথমে গ্রামের উন্নতি করতে হবে। প্রকৃত অর্থে তিনি সহজ, সরল ও সাদামনের মানুষ ছিলেন। তিনি পুরুষের পাশাপাশি নারী শিক্ষার প্রতিও জোর দিতেন বেশি। তাঁর সাত ছেলে ও সাত মেয়ে সবাই শিক্ষিত।
আব্দুল কুদ্দুস মাস্টার ছিলেন প্রচারবিমুখ। তাঁর মনে আরেকটি বিষয় সব সময় যেটা কাজ করতো সেটা হলো মানুষকে শিক্ষিত করা ছাড়া মানব জাতির কল্যাণ কামনা করা যায় না। আমাদের সমাজের কিছু নকল সমাজসেবী মানুষের কারণে আসল সমাজসেবী ও সৎ মানুষের ইতিহাস কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। যারা দেশপ্রেমিক তাদের উচিৎ সৎ ও নির্লোভ মানুষদের আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করা। তাহলে হয়তো সমাজে পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। আলহাজ¦ আব্দুল কুদ্দুস মাস্টার ছিলেন তেমনি একজন। তাঁর জীবন আমাদের কাছে হয়ে উঠতে পারে উজ্জ্বল উদাহরণ। ২০০৮-এর ১০ ডিসেম্বর বুধবার এই মহান ব্যক্তি আলহাজ¦ আব্দুল কুদ্দুস মাস্টার মৃত্যুবরণ করেন।

লেখক : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক…শাম্মী শিল্পী তুলতুল, আব্দুল কুদ্দুস মাস্টারের নাতনী।

Share
  • 1
    Share