মো. দেলোয়ার হোসেন , চন্দনাইশ

মুক্তিযোদ্ধা মো. সোলাইমান চৌধুরী ১৯৭১ সালে গাছবাড়ীয়া কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হন। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে পিতা-মাতার অনুমতি নিয়ে মে মাসে মোহাম্মদপুরের পিস্তল কাশেমের সাথে ৫নং সেক্টরে যোগদান করেন। এ সময় তিনি প্রথমে বরকল শাহজাহান ইসলামাবাদী গ্রুপের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পরে তাদের গ্রুপের রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে ২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা সংগঠিত হয়ে বিভিন্ন এলাকায় সফল অপারেশন পরিচালনা করেন। তবে জামিজুরি পাহাড়ি এলাকায় রাজাকার বাহিনী তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করার কথা বলে তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় তাদের সাথে থাকা বাঁশখালী উপজেলার সুভাষসহ ২ জন শহীদ হন। আরও বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। তাঁরা পরবর্তীতে পায়ে হেঁটে ধোপাছড়ি চলে যান। সেখান থেকে বিবিরহাটে যান। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণে মো. সোলাইমান চৌধুরী এই তথ্য জানান।
চন্দনাইশ পৌরসভার চৌধুরী পাড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৪৯ সালের ১০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মরহুম ফয়েজ আহমদ চৌধুরীর ৬ সন্তানের মধ্যে ২য়। তার মাতা মরহুমা মাজেদা খাতুন। তিনি ১৯৭০ সালে কানুনগোপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাস করেন। ১৯৭২ সালে গাছবাড়ীয়া কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে তিনি এমএফপিসি ডিগ্রি লাভ করে পল্লী চিকিৎসক হিসেবে সাধারণ মানুষের সেবা দিয়ে গেছেন।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণায় উজ্জীবিত হয়ে দেশ ও মাতৃকার টানে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পিতা-মাতার সম্মতিতে ১৯৭১ সালের মে মাসে তৎকালীন পশ্চিম পটিয়া, চন্দনাইশের জামিজুরি, ধোপাছড়ি, দেওয়ানহাট, দেওয়ানজী পুকুরপাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় রাজাকার, আলবদর, আল শামস গ্রুপের সাথে সম্মুখযুদ্ধে বিভিন্ন অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন। গ্রুপের মধ্যে তার এবং নুরুল আলমের কাছে এলএমজি ছিল বলে জানান। তিনি বলেন, যুদ্ধ চলাকালীন সময় তাকে বাগিচাহাট এলাকা থেকে জামিজুরি এলাকার রাজাকার তাজুর মুল্লুক ও কামরুল আটক করে নিয়ে যাওয়ার পথে দেওয়ানহাট এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা তাকে উদ্ধার করেন। রাজাকারেরা তাদের পার্শ্ববর্তী প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা আবদুল করিম চৌধুরী আবুল হোসেনেরবাড়িসহ বেশ কয়েকটি বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। মুক্তিযোদ্ধা সোলাইমান চৌধুরী স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে খানহাটে একটি হোটেল ব্যবসা করতেন। ১৯৮০ সালে হোটেল ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে তাঁর গ্রামের পাশে নয়াহাটে পল্লী চিকিৎসক হিসেবে চেম্বার করে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রোগীদের সেবা দিয়ে গেছেন। মুক্তিযোদ্ধা সোলাইমান অসুস্থ হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত বাই সাইকেল চালিয়ে পুরো চন্দনাইশ এলাকায় রোগীদের বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা সেবা দিতেন। ২০১৪ সালে জাতীয় নির্বাচনের পর পর তিনি হঠাৎ করে ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সে সময় তিনি ঢাকা এ্যাপেলো হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে প্রায় ২ বছর সুস্থ থাকার পর পুনরায় ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত হন। শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে মুক্তিযোদ্ধা সোলাইমান চৌধুরী সেই থেকে আজ পর্যন্ত বিছানায় শুয়ে শুয়ে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি চন্দনাইশ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সহ-দপ্তর ও পাঠাগার কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে মুক্তিযোদ্ধা সোলাইমান ৩ সন্তানের জনক।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, তার মরহুম পিতা-মাতা তাকে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ায় তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বর্তমানে তিনি ভালভাবে কথা বলতে না পারলেও দেশ স্বাধীন হওয়ার দীর্ঘ সময় পর যুদ্ধা পরাধীদের বিচার এবং অনেকের ফাঁসি হওয়ায় বর্তমান সরকারের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

Share