নিজস্ব প্রতিবেদক

মৃত্যুর পর অনেকে চলে যান স্মৃতির অন্তরালে। কিন্তু, কেউ কেউ তার কাজের মধ্য দিয়ে থেকে যান মানুষের মনিকোঠায়। এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী এমনই একজন মানুষ। মুক্তিযুদ্ধ থেকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রামের এমন আন্দোলন-সংগ্রাম ছিল না, যেখানে তিনি ছুটে যান নি। যেখানেই সংকট, সেখানেই তিনি ছুটে গেছেন। এ কারণে চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন তিনি। বাংলার মানুষ যেমন যুগে যুগে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে স্মরণ করবে, তেমনি ভাবে চট্টগ্রামবাসী স্মরণ করবে চট্টগ্রামের উন্নয়নের স্বপ্নের রূপকার এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে নগরীর প্রেসক্লাবে বঙ্গবন্ধু হলে প্রেসক্লাব চট্টগ্রাম আয়োজিত ‘সাংবাদিকবান্ধব এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী’ স্মারকগ্রন্থ প্রকাশনা উৎসবে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, গত বছর এই বিজয়ের মাসেই মহিউদ্দিন চৌধুরী আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন। চট্টগ্রামের প্রেসক্লাব তৈরির সময় তিনি প্রথমবার মেয়র হয়ে আসেন। আমি তার কাছে দাবি নিয়ে গিয়েছিলাম প্রেসক্লাব উন্নয়নের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য। মেয়র হিসেবে তিনি এখানে টাকা বিনিয়োগ করতে পারেন কিনা এসব কিছু চিন্তা না করেই সাংবাদিকদের জন্য তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন।তাই, তার স্মৃতিকে ধরে রাখতে এবং তাকে শ্রদ্ধা জানাতে চট্টগ্রামের সাংবাদিক ভাইরা যে আয়োজন করেছে, তাতে আমি আনন্দিত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে এগিয়ে চলা চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে ইকবাল সোবহান বলেন, যখন দেশের অনেক প্রেস ক্লাবে বঙ্গবন্ধুর কোন ছবি ছিল না, তখন নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙিয়েছে, বঙ্গবন্ধুর ম্যূরাল নির্মাণ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, প্রগতিশীলতার পক্ষে সবসময়ই চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব ও চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজ কাজ করে গেছে। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব ভবন নির্মাণেরক্ষেত্রে সাবেক মেয়র মহিউদ্দিনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, আমরা অনেকের কাছ থেকে সহযোগিতা নিয়ে থাকি, কিন্তু কৃতজ্ঞতা স্বীকারে কার্পণ্য করে থাকি। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব তাঁকে নিয়ে স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করেছে। এ গ্রন্থে মহিউদ্দিন চৌধুরীকে নিয়ে বিভিন্ন সাংবাদিক তাদের দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে লিখেছেন। এতে করে মহিউদ্দিনের বহুমুখী দিকটি উঠে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহিউদ্দিন চৌধুরীকে সম্মান করতেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁর (মহিউদ্দিন) পুত্রকে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক করে সম্মান করেছেন।

নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি করতে দলীয় মনোনয়নও দিয়েছেন মহিউদ্দিন চৌধুরীর স্মৃতি ধরে রাখতে। মহিউদ্দিন পুত্র নওফেল তার কাজের মধ্য দিয়ে পিতার কাজকে ধরে রাখবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।
প্রেস ক্লাবের সভাপতি কলিম সরওয়ারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক ছিলেন প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. অনুপম সেন। স্মারকগ্রন্থ প্রকাশনা উৎসবের উপ কমিটির সদস্য সচিব এবং চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মিন্টু চৌধুরীর পরিচালনায় অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন সিটি কর্পোরেশন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, এ বি এম মহিউদ্দিনের চৌধুরীর স্ত্রী চট্টগ্রাম মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসিনা মহিউদ্দিন, বড় ছেলে এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।
প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. অনুপম সেন বলেন, ‘এ বি এম মহিউদ্দিনের চৌধুরীর উপর এর আগে দুইটি গ্রন্থ লিখা হয়েছে। কিন্তু স্মারকগ্রন্থ এটিই প্রথম। চট্টগ্রামের ৫৬ জন সাংবাদিক এটিতে মহিউদ্দিন চৌধুরীর স্মৃতিচারণ করেছেন।’
চট্টগ্রামের অবদানে মহিউদ্দিন চৌধুরীর নানা অবদান, ত্যাগের কথা আলোচনা করে তিনি বলেন, ‘৭১ এর মার্চ মাসে প্রথম গ্রেপ্তার হওয়া একজনদের মহিউদ্দিন চৌধুরী। পাগলের অভিনয় করে তিনি বন্দী অবস্থা থেকে মুক্ত হন। কিন্তু, পরে আবার মুক্তিযুদ্ধে যান। এ ধরণের সাহসিকতা খুব কম লোকের মধ্যেই দেখা যায়। ৭৫ এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খুব কম লোকই প্রকাশ্যে তার প্রতিবাদ করেছিল। মহিউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। চট্টগ্রামের মানুষের জন্য তাঁর ছিল অকৃত্রিম ভালোবাসা। ১৯৯১ সালে ঘূর্ণিঝড়ের পর মুসলিম হলে অস্থায়ী হাসপাতাল তৈরি করেছেন। সৎকারের ব্যবস্থা করেছিলেন অনেক নিহতের। এছাড়া মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর নগরীতে তিনি ৪০ এর অধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছেন। নির্মাণ করেছেন মেমন হাসপাতাল, থিয়েটার ইনস্টিটিউট। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষাতেও তার অসামান্য অবদান চট্টগ্রামবাসী আজীবন স্মরণ রাখবে।’
সিটি কর্পোরেশন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, ‘মহিউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন একজন আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে তিনি অন্তরে ধারণ করেছিলেন। রাজনীতির যথার্থ অর্থে জনগণের কল্যাণেই তিনি সারা জীবন কাজ করে গেছেন। চট্টগ্রামের স্বার্থের বিপরীতে তিনি কারো সাথেই আপোষ করেন নি। অন্যান্য রাজনীতিকের সাথে এই জায়গাটাতেই তার পার্থক্য। এ জন্যই চট্টগ্রামে তিনি এত বেশি জনপ্রিয়। রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনার মতপার্থক্যের কারণে আমাদের মধ্যে হয়ত কিছুটা মান-অভিমান ছিলো। কিন্তু ,কখনোই তাকে অশ্রদ্ধা বা অবজ্ঞা করিনি আমি।’
মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, ‘পিতার জীবন নিয়ে আলোচনা করাটা পুত্রের জন্য কিছুটা দুরূহের। আমি তার রাজনৈতিক সহকর্মী ছিলাম না। তার দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস দেখি নি আমি। কিন্তু পেয়েছি তার রাজনৈতিক আদর্শের পরশ। সাংবাদিকদের জন্য তার সুনির্দিষ্ট চিন্তা ছিল। তিনি বলতেন, গণমাধ্যমকে মুক্ত থাকতে হলে প্রতিষ্ঠান থেকে মুক্ত হওয়াটা জরুরি। জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পেলে স্বাধীন সাংবাদিকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য কাজ করে যাব, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখবো।’
সমাপনী বক্তব্যে প্রেসক্লাবের সভাপতি কলিম সরওয়ার বলেন, ‘চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবকে স্বনির্ভর, স্বয়ংসম্পূর্ণ, সুন্দর করার স্বপ্ন ছিল এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর। আজকে এই প্রেসক্লাব যতটুকু উঠার সুযোগ ছিলো সেই দশম তলায় বসে আমরা অনুষ্ঠান করছি। এর সাত তলায় তিনি বিনা সুদের ঋণ দিয়েছেন। আমাদের ক্ষুদ্র সামর্থ্য দিয়েই তাকে শ্রদ্ধা জানানোর প্রয়াস চালিয়েছি আমরা।’ চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানে আগতদের কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শুকলাল দাশ। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন স্মারকগ্রন্থ প্রকাশনা কমিটির আহবায়ক মোয়াজ্জেমুল হক। অন্যান্যের মধ্যে যুবলীগ চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি নাজিমুদ্দীন শ্যামল, রাউজান উপজেলা চেয়ারম্যান এহসানুল হায়দার চৌধুরী বাবুল বক্তব্য রাখেন।
উল্লেখ্য, ১৯৬ পৃষ্ঠার স্মারক গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মিন্টু চৌধুরী। বইটিতে ৫৬ জন সাংবাদিকের লেখা সংকলিত হয়েছে। স্মারক গ্রন্থের ভূমিকা রচনা করেছেন সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. অনুপম সেন। এতে মহিউদ্দিন চৌধুরীর জীবনের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে। এছাড়া এতে আছে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বর্ণনা ও ছবি।

Share
  • 81
    Shares