আরফাতুল মজিদ, কক্সবাজার

কক্সবাজার শহরে পর্যটকবাহী কোনো গাড়ি থামানোর সাথে সাথেই পর্যটকদের নিয়ে টানা-হেঁচড়া শুরু করে দেয় সিএনজি ট্যাক্সি, টমটম ও রিকশাচালকেরা। এসব চালক দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে পর্যটকদের ওপর।
এরপর পর্যটকদের ব্যাগ ও জিনিসপত্র নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে যায়। যা কক্সবাজারে আগত পর্যটকদের বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দেয়। এতে অনেক পর্যটক মারাত্মক হয়রানির শিকারও হচ্ছেন। কক্সবাজার বাস টার্মিনাল, কলাতলীর মোড়, সুগন্ধা পয়েন্ট ও হলিডে মোড়সহ পুরো কলাতলী জোনে গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথে পর্যটকদের টানা-হেঁচড়ার চিত্র নৈমিত্যিক ব্যাপার। বাস থামানোর আগেই অনেক অটোচালক গাড়িতে উঠেই পর্যটকদের টানতে শুরু করে।
জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বেড়াতে আসা পর্যটকরা গাড়ি থেকে নামেন বাস টার্মিনাল ও কলাতলীর মোড়সহ হোটেল মোটেল জোনে। ওখানে পর্যটকরা নামার সাথে সাথে রীতিমত টানা-হেঁচড়া শুরু করে কিছু সিএনজি, টমটম ও রিকশাচালক। এসব চালক পর্যটকদের কলাতলীর হোটেল-মোটেল জোনে নিয়ে যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। আর গাড়িতে ওঠানোর পরেই শুরু হয় প্রতারণার নকশা। তারা পর্যটকদের নানাভাবে প্রলোভন দেখানো শুরু করে। এছাড়াও পর্যটকের ধরন দেখে মাদক ও যৌনকর্মী সংগ্রহ করে দেয়ার কথা বলেও হাতিয়ে নেয় টাকা। কমিশনের জন্য ওইসব দালাল চালকরা পর্যটকদের যেসব আবাসিক হোটেল বা কটেজে তুলে দেয়, সেগুলো টাকার তুলনায় খুবই নি¤œমানের। একইভাবে দালালরা খাবারের হোটেলেও নিয়ে যায় কমিশনের জন্য।
সরেজমিনে গত কয়েকদিন কলাতলীর মোড়ে গিয়ে দেখা যায় এমন চিত্র। পর্যটকরা বাস থেকে নামার সাথে সাথে বাসের দরজায় দৌড়ে যায় একদল টমটম, সিএনজি ও রিকশাচালক। তারা পর্যটকদের ব্যাগ নিয়ে টানাটানি শুরু করে নিজেদের গাড়িতে তোলার চেষ্টা করে। অনেকেই পর্যটকদের টানতে শুরু করে অটোরিকশায় তোলার জন্য। এতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে অনেক পর্যটক।
ঢাকা থেকে বাসে করে এসে গত রোববার দুপুর ১২টায় কলাতলীর মোড় নামেন পর্যটক দম্পতি মুহিব চৌধুরী ও শারমিন চৌধুরী। বাস থেকে নামার পর কথা হয় তাদের সাথে। তারা বলেন, বাস থেকে নামার শুরুতে একদল লোক বাসের দরজায় এসে ভিড় জমায়। এরপর তারা টানা-হেঁচড়া শুরু করে। প্রথমে মনে করেছিলাম ব্যাগ ছিনতাই করা হচ্ছে। কিন্তু তা নয়; যারা ব্যাগ ও যাত্রীদের নিয়ে টানাটানি করছে তারা অটোরিকশা ও টমটমের চালক। ভালো হোটেল দেখানোর কথা বলে তাদের গাড়িতে উঠতে বলে অনেকেই। কিন্তু আমাদের নির্দিষ্ট হোটেলে রুম বুকিং করা ছিল। কলাতলীর মোড়ে খুবই বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হতে হয়।
জানা গেছে, কলাতলী মোড়ে অবৈধভাবে এসব টমটম ও অটোরিকশার পার্কিং গড়ে তোলে বাহারছড়া এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী মুনিয়া। তার নেতৃত্বে চালকরা গাড়ি নিয়ে মোড়ে অবস্থান করে। এরপর কোনো পর্যটক গাড়ি নিয়ে নামলে তাদের অটোরিকশায় তুলে কমিশনভিত্তিক হোটেলে নিয়ে যায়। এমনকি কলাতলীর মোড়ের আশপাশে অনেক হোটেল ও প্লটের মালিকের এসব অটোরিকশা চালকদের সাথে চুক্তি রয়েছে। হোটেলে পর্যটক দিতে পারলেই রয়েছে কমিশন। যার কারণে অটো চালকরা পর্যটকদের টেনে-হিঁচড়ে হোটেলে নিতে চেষ্টা করে।
স্থানীয়রা জানান, কক্সবাজার বাস টার্মিনাল ও কলাতলীর মোড় কেন্দ্রিক একটি সিন্ডিকেট এক শ্রেণির হোটেল মালিকদের সহযোগিতায় দীর্ঘদিন ধরে এই অপকর্ম চালিয়ে আসছে। কক্সবাজার ভ্রমণে কোনও পর্যটক কলাতলীর মোড় ও বাস টার্মিনালে পৌঁছালেই ওৎ পেতে থাকে তারা। এরপর এসব চক্র কম খরচে ভাল হোটেলে থাকার কথা বলে কৌশলে নিয়ে যায় নির্ধারিত হোটেলে। আবার মাঝপথে নিয়ে গিয়ে পর্যটকদের কাছে থাকা দামি জিনিসপত্র নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে অহরহ।
এ ব্যাপারে হোটেল মোটেল গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম সিকদার বলেন, এখন পর্যটন মৌসুম শুরু হচ্ছে। তবে এখনো জমে উঠেনি পর্যটকদের আনাগোনা। তাই শহরের ভেতর যানজটও নেই বললে চলে। কিন্তু, দিনের বেলায় পর্যটকবাহী বাসগুলোর শহরে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ রয়েছে। কলাতলীর মোড় পর্যন্ত আসতে পারে বাসগুলো। আবার অনেক বাস পর্যটকদের বাস টার্মিনালে নামিয়ে দেয়। এ কারণে রিকশা, টমটম ও সিএনজি চালকধারী এক শ্রেণির দালালচক্র পর্যটকদের নানাভাবে হয়রানির সুযোগ পাচ্ছে।
এমনকি এক শ্রেণির হোটেল ও কটেজ ব্যবসায়ী রিকশা, টমটম ও সিএনজি চালকদের আর্থিকভাবে প্রলোভন দেখিয়ে শহরের বিভিন্ন স্থানে পর্যটকদের পেছনে লেলিয়ে দিয়েছে। এ কারণে পর্যটক হয়রানি বেড়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসাইন বলেন, কলাতলীর মোড় ও বাস টার্মিনাল এলাকায় বাস থেকে নামার পর কিছু সিএনজি ও অটোচালকদের হাতে পর্যটকরা হয়রানি ও টানা-হেঁচড়া’র শিকার হন বলে শুনেছি। তবে দ্রুত সময়ে পর্যটকদের সুবিধার জন্য এসব চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Share
  • 8
    Shares