বিশুদ্ধ হাদীস সংকলন জা’মি তিরমিজীতে ওয়াসিলা বিন আসকা (রাদি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা হযরত ইব্রাহীম নবীর (আ.) কে শ্রেষ্ঠ হিসেবে বেঁচে নিয়েছেন, হযরত ইসমাঈলের আওলাদ ফরজন্দ থেকে কিনানা গোত্রকে মনোনীত করেছেন, বনী কিনানা হতে কুরাইশ বংশকে বেঁছে নিয়েছেন; (এভাবে) কুরাইশ থেকে বনী হাশিম গোষ্ঠিকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে, আপন শ্রেষ্ঠ বন্ধু গ্রহণ করেছেন। সর্বশ্রেষ্ঠ হাফেজে হাদীস মহানবীর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সাহাবী আবু হুরায়রা (রাদি.) থেকে বর্ণিত আছে, কতিপয় লোকজন একবার আঁ হযরতের কাছে জানতে চাইলেনঃ ওহে আল্ল্হার রাসূল (স.)! কখন আপনার নবুয়াত লাভ হয়েছিল? জবাবে তিনি বললেনঃ যখন আদম (আ.) দেহ এবং রুহের মাঝামাঝিতে। অর্থাৎ যখন আদমকে (আ.) আল্লাহতায়ালা দেহ ও আত্নার সংযোজন মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করেন নি, তখনও আমি নবী ছিলাম। আমার সৃষ্টি এবং পদমর্যদা সর্বাগ্রে প্রদান করা কিন্তু সমস্ত নবী রাসূলগণের (আ.) প্রেরণের পরে আখেরী নবী ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হিসেবে পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান সহকারে আমি দুনিয়ায় আসি।’(তিরমিজী)।
সাহাবা আনাস বিন মালিক (রাদি.) বলেনঃ রাসুলে মাকবুল (স.) ইরশাদ করেনঃ কিয়ামতের সময় যখন মানুষদের কবর থেকে উঠানো হবে তখন সবার আগে আমিই বের হবো, আমিই হবো আল্লাহ তায়ালার সাথে প্রথম সংলাপকারী, যখন তারা (সবাই) আল্লাহর কাছে সমবেত হবে। তারা যখন নিরাশ হয়ে পড়বে, আমি হবো তখন তাদের সুসংবাদদাতা। এ’দিন প্রশংসনীয় ঝান্ডাখানা থাকবে আমার হাতে এবং আমিই সকল আদম সন্তানদের চাইতে আল্লাহর নিকট সম্মানিত হবো। আর এ’টি আমি কোন গর্ভ ভরে বলছি না।’
আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাদি.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেনঃ আমি রাসুলুল্লাহ (স.) কে বলতে শুনেছিঃ ( হে মুসলমানগণ!) যখন তোমরা কোন মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে আযান শুনতে পাও, তখন মুয়াজ্জিন যা উচ্চারণ করে তা তোমরাও বলে যাও। অতপর আমার উপর দরুদ পাঠ কর। কেননা যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরুদ পাঠ করে থাকে আল্লাহ এ জন্য তার উপর দশবার রহমত বর্ষণ করে থাকেন। তারপর আমার উদ্দেশ্যে ‘ওয়াসিলা’ তালাশ কর (প্রার্থনা কর), নিঃসন্দেহে ‘ওয়াসিলা’ বেহেস্তের একটি বড় উত্তম স্থানের (মর্যদার) নাম। এ’টি খোদাতায়ালার মাত্র একজন বান্দা ছাড়া আর কেই পাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করবে না। আমি প্রবল আশা রাখি যে, তা পাওয়ার সৌভাগ্য অর্জনকারী ব্যক্তিটি হবো আমিই। সুতারাং যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে আমার জন্য ওই ওয়াসিলা বা মাধ্যম প্রার্থনা করবে অর্থাৎ আজানের পর দোয়া/মুনাজাত করবে তার উদ্দেশ্যে পরকালে আমার সুপারিশ করা জরুরী হয়ে পড়বে।
আরেকটি দীর্ঘ হাদীসে তিনি বলেছেনঃ আমিই সর্বপ্রথম বেহেস্তের দরোজায় করাঘাত করবো আর তা আমার জন্য আল্লাহ খুলে দেবেন এবং তাতে আমাকে প্রবেশ করাবেন। আর তখন আমার সাথে থাকবে দরিদ্র মু’মিন দল। এ কোন আমার গর্ব নয়……।’
উপরোক্ত বর্ণনা থেকে আমরা বুঝে নিতে পারি, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর মর্যদা অতুলনীয় এবং অনন্য। তিনি আমাদের সৌভাগ্যের পরশমনি। তিনিই আমাদের দুনিয়া-আখিরাতের রাহবার। তাঁর পথ নির্দেশনা এবং সুপারিশের মধ্যেই রয়েছে উম্মার পরিত্রাণ। আল্লাহতায়ালা তাঁকে দুনিয়ার পথ হারা মানুষের দিশা ও অবলম্বন হিসেবে এ মর্ত্যরে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন।
শুধু তিনি আখিরাতে আমাদের কান্ডারী তাই নয়। তিনি তামাম দুনিয়াবাসীর জন্য আর্শীবাদ। খোদ কুরআনুল কারীমে তাকে ‘মহা রহমতের আধার’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেনঃ‘ওয়ামা আরসাল না-কা ইল্লা-রাহমাতুল-লিল আলামীন’-ওহে প্রিয় নবী (স.)! আমি আপনাকে তামাম দুনিয়ার রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।’ মহানবী (স.) দুনিয়াবাসীর জন্য কতটুকু রহমত বয়ে এনেছেন তার প্রমাণ পাওয়ার জন্য আমাদেরকে তৎকালীন আইয়্যামে জাহিলিয়াত ও আরব সমাজের দিকে একটু দৃষ্টি নিবন্ধ করতে হবে। আমরা জানি মানি এবং বিশ্বাস করি মানুষ সৃষ্টির সেরা।
কিন্তু যুগে যুগে মানব জাতির আচরণ হয়ে পড়েছিল বন্য, বর্বর। মানুষ পূর্ববর্তী নবী রাসূলগণের আদর্শ ও শিক্ষা ভুলে গিয়ে হয়ে পড়েছিল বেপরোয়া, লাগামহীন। এমন কোন অন্যায় ও গর্হিত কাজ ছিল না- যা তাঁরা করতে কুণ্ঠিত হতো। আল্লাহতায়ালা এমন বিশ্ব পরিস্থিতিতে মানব জাতির কাছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবকে (স.) প্রেরণ করেছিলেন মানুষের শিক্ষকরূপে। একজন শিক্ষকের কাছে যেমন সারল্য ও কাঠিন্য দু’টো চরিত্রই থাকে আঁ-হযরতের (স.) কাছেও তাই ছিল। তিনি সরল সুন্দর ভাষায় মানুষদের সৎপথে আহব্বান করেছেন। আবার কখনো দাম্ভিক, অহংকারী এবং চরম খোদাদ্রোহী ঘাওড়াদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারী বাণী উচ্চারণ করেছেন।
সব কিছুর বিনিময়ে মহানবী (স.) ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন বিশ্বজুড়ে সে চির কাঙ্খিত শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি। তাঁর এ শান্তি পয়গামের মূলে ছিল ঐশী ইঙ্গিত। তাই তার লক্ষ্য হয়েছিল অব্যর্থ, তার বাণী ও কর্ম ছিল নির্ভুল।
জনৈক কবি তাই সুন্দর মন্তব্য করেছেনঃ
দুনিয়া জুড়ে জ্বলছিল যবে
হাবিয়া জাহান্নাম
স্বর্গ হইতে আসিলেন নবী
ল’য়ে শান্তির পয়গাম।’
আসলে যে কোন যুগে যে কোন কালে আমরা যদি সাম্য ও শান্তির সমাজ চাই তাহলে মহানবীর (স.) আদর্শ অনুসরণে আমরা বাধ্য। সমাজ সংস্কার ও সমাজ সুন্দরে আঁ-হযরত এক অনিবার্য চরিত্র। সূরা হাশরে বর্ণিত হয়েছেঃ রাসুল তোমাদেরকে যা কিছু দান করেন তা পূর্ণরূপে তোমরা গ্রহণ কর ও ধারণ কর। আর যা হতে নিষেধ করেন তোমরা তা থেকে বিরত থাক। খোদাকে ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।’-(আয়াত নং-৭)।
আল্লাহর আখেরী পয়গাম্বরের (স.) নির্দেশ মেনে চলা আল্লাহতায়ালার বাণী থেকে প্রমাণিত। আমরা দেখি, যুগে যুগে যারা মহানবীর (স.) সুন্নাহ অনুকরণের মাধ্যমে জীবন অতিবাহিত করেছে তাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে অবারিত। আর যারা তাকে অনুসরণে ব্যর্থ হয়েছে বা খ-িত অনুসরণ করেছে তারা হয়েছে অপমানিত নিগৃত।
মহানবী (স.) তাঁর আমলে যে সব কথাবার্তা ও কর্মকান্ডকে সমাজের জন্য, সভ্যতার জন্য ক্ষতিকর বলে চিহ্নিত করেছিলেন আজকের বিজ্ঞান এবং সভ্যতাও তা বরাবরই ক্ষতিকর হিসেবে সাব্যস্ত করে চলছে। যেমন মদ, জুয়া, ব্যাভিচার, সুদ, ঘুষ, বেলাল্লাপনা ইত্যাদি। এদিকে খেয়াল করলে মহানবীর শ্রেষ্ঠত্ব, প্রয়োজনীয়তা এবং অনুপম চরিত্র মাধূর্য ক্রমেই স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়।

লেখক : অধ্যাপক, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খতীব

Share
  • 1
    Share