মো. দেলোয়ার হোসেন, চন্দনাইশ

 

 

১৯৩০ সালে ভারতের নদীয়া থেকে চা বাগানের উদ্যোক্তাদের সাথে আসা ১৫০জন শ্রমিক ও পরিবারগুলো বর্তমানে ভালো নেই, স্বপ্নহীন জীবন অতিবাহিত করছে। চন্দনাইশের লট এলাহাবাদ স্বপ্ন নগরের চা বাগানে কাজ করতে এসে অনেকে এ এলাকার প্রেমে পড়ে পুরো জীবন কাটাতে চেয়েছিলেন চায়ের সাথে মিতালী করে।
স্বাধীনতার পরবর্তী ১৯৭৪-৭৫ সালে চা উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে অনেক পরিবার ও শ্রমিক নিজ জন্মভূমি নদীয়াতে ফিরে গেলেও কিছু শ্রমিক ও পরিবার ভালোবাসার জাল ছিন্ন করে নিজ গ্রামে ফিরে যেতে পারেনি। ফিরতে না পারা শ্রমিকদের মধ্যে বর্তমানে ৩০-৩৫টি পরিবার থাকলেও মূলত চা শ্রমিক বেছে আছে ৪-৫ জন। এ চা শ্রমিকেরা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক হওয়ায় চা বাগানের টিলায় পূজো দেয়ার জন্য কালীমন্দির, সমতল ভূমিতে নারায়ণ ও পানীয় জলের জন্য একটি গভীর নলকুপ খনন করেন। কূপের দেয়ালে খোদাই করে লেখা এম. কে দাশ ব্রাহ্মণ-১৯৬৬ অর্থাৎ ১৯৬৬ সালে বনীকৃষ্ণ দাশ চা শ্রমিকদের জন্য এ কূপটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কূপ ব্যতিরেকে উক্ত পাড়ায় এখন পর্যন্ত কোন টিউবওয়েল না থাকায় কূপের পানি দিয়ে চলে চা শ্রমিক পরিবারের সদস্যদের জীবন। চা শ্রমিক পাড়ার ৫ কি.মি. মধ্যে কোন বিদ্যুৎ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। চলাচলের রাস্তাগুলোও আধা কাচা হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে চলাচলে মারাত্মক দুর্ভোগে পড়তে হয় তাদের। ২০০৪ সালে স্থানীয় কয়েকজন যুবক বিনা বেতনে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় চালু করেন তাদের নিজ খরচে। সে বিদ্যালয়ে অসহায় চা শ্রমিকদের ছেলে-মেয়েরা প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করছে। চা শ্রমিকেরা অল্প শিক্ষিত হওয়ায় শ্রমিক পরিবারের শিশুদের সময়মত লেখাপড়া করা সম্ভব হচ্ছে না। মাটি কামড়ে পড়ে থাকা শ্রমিকেরা এ পর্যন্ত তথায় কোন রকমে উন্নয়নমূলক কাজ করতে পারছে না এবং সরকারের কোন বরাদ্দও তারা পাচ্ছে না। একজন চা শ্রমিক মধুসদন দাশ বললেন, তার ছোটবেলায় চা বাগানের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কার্যক্রম বন্ধ হলেও পূর্ব-পুরুষেরা চা বাগানকে ঘিরে স্থায়ী বসত গড়ে তুলেন।
কিন্তু কিছু ভূমিদস্যু চা বাগানের কার্যক্রম বন্ধ করেই ক্ষান্ত হয়নি। তারা প্রতিনিয়ত চা শ্রমিক পরিবারের লোকজনকে উচ্ছেদের চেষ্টা চালাচ্ছে। এমনকি বিনা কারণে হামলা চালিয়ে রক্তপাতের মতো ঘটনাও ঘটায়। শহর ও গ্রাম থেকে দুরে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়া বসতি লোকজনদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে অনেক কষ্ট করে ৬-৭ কি.মি. দূরত্বে বিজিসি ট্রাস্ট হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়, এ সড়কে কোন যাবাহন নেই। আছে শুধু ব্রিক ফিল্ডের ট্রাক আর ধুলোবালি। চা উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ এলাকার লোকজন দিনমজুরী এবং পাহাড় থেকে কাঠ কেটে অতিকষ্টে তাদের জীবনযাপন অতিবাহিত করছে। তারা জন্ম থেকেই টিভি ও রেডিও দেখেনি। তবে রওশনহাট এলাকায় আসলে চায়ের দোকানে টিভি দেখার সৌভাগ্য হয় বলে তারা জানান। তারা দেশের বর্তমান প্রশাসন সম্পর্কে কিছুই জানেন না। জীবনে এখনও সরকারি সাহায্যও পাননি। নগর ও গ্রাম থেকে দূরে একেবারে বিচ্ছিন্ন পাহাড়ি এলাকায় এ বসত পল্লী চা বাগানের উন্নয়নে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ বিশাল জনশক্তিকে কাজে লাগানোার পাশাপাশি অকেজো ভূমি ব্যবহার করে সরকার পেতে পারে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। এলাকার বাসিন্দা শংকর দাশ বলেন, এখানকার মানুষের অন্যতম সমস্যা বন্যহাতির আক্রমন। হাতির আক্রমণে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে প্রায়।
গত কয়েক বছরে ৪ ব্যক্তি নিহত, ৪টি গরু ও ১০টি ছাগল হাতির আক্রমনে মারা গেছে। এলাকার মানুষ বসতঘরের আশেপাশের জমিতে চাষাবাদ করে এক সময় জীবিকা নির্বাহ করত। এখন সে জমি আর তাদের দখলে নেই। পাশের গ্রামের কিছু লোক তা দখল করে নিজেরাই চাষাবাদ করে ভোগদখল করছেন। তাই চা বাগান এলাকার গরীব নারী-পুরুষেরা পাহাড়ি গাছের ডালপালা কেটে বিক্রি করে বা পাশের ইটভাটায় কাজ করে খেয়ে না খেয়ে কোন রকমে টিকে আছে।
তারা বলেন, এক সময় চা বাগানে কাজ করে তারা খুব সুখে ছিলেন। পাঁচ শতাধিক শ্রমিক ছিল এ চা বাগানে। বাগান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে শুরু হয়েছে তাদের দুঃখের জীবন। বর্তমানে তারা স্বাস্থ্যসেবাসহ সরকারি কোন সাহায্য সহযোগিতা না পেয়ে অতিকষ্টে দিন অতিবাহিত করছেন।

Share